সিঁড়িতে এখনও নুসরাতের জামার পোড়া অংশ

প্রকাশ: ১৪ এপ্রিল ২০১৯     আপডেট: ১৪ এপ্রিল ২০১৯      

জাহিদুর রহমান ও আবুল হোসেন রিপন, সোনাগাজী (ফেনী) থেকে

সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ক্যাম্পাসের ভেতরে যে সাইক্লোন সেন্টারে নুসরাতকে পোড়ানো হয়, সেখানে এখনও নুসরাতের জামার পোড়া অংশ পড়ে আছে-সমকাল

ফেনী শহর থেকে ১৮ কিলোমিটার দূরের সোনাগাজী উপজেলা এখন দেশ-বিদেশে আলোচিত। যে মাদ্রাসায় নুসরাত জাহান রাফিকে আগুনে পোড়ানো হয়েছে সেই মাদ্রাসা ঘিরে এখন অনেকের কৌতূহল। প্রতিদিন অনেকেই ছুটে আসছেন সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসায়। ক্যাম্পাসের মাঝখানে কলঙ্কের স্বাক্ষী হয়ে আছে তিনতলা সাইক্লোন সেন্টারটি। এই ভবনের ছাদেই নুসরাতকে পুড়িয়ে হত্যার চেষ্টা করা হয়েছিল। মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলার যৌন হয়রানির প্রতিবাদ করায় নুসরাতের ওপর বর্বর হামলা চালানো হয়। 

এ ভবনের সিঁড়িতে এখনও রয়েছে নৃশংসতার দাগ। দুর্বৃত্তরা আগুন দেয়ার পরপরই সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে বাঁচাও বাঁচাও বলে চিৎকার করেছিলেন নুসরাত।

রোববার মাদ্রাসায় গিয়ে দেখা যায়, তিন তলা সাইক্লোন সেন্টারের পুরো সিঁড়িতেই নুসরাতের জামার পোড়া অংশ লেগে আছে। নিচতলায় নামাজের বিছানায়ও পোড়া দাগ লেগে রয়েছে। দাগগুলো এখনও নির্মমতার সাক্ষী হয়ে রয়েছে।

১৯১৭ সালে প্রতিষ্ঠিত সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রসায় ২টি টিনশেড, তিনটি পাকা ভবন ও তিন তলা একটি সাইক্লোন সেন্টার রয়েছে। সাইক্লোন সেন্টারের দ্বিতীয় তলায় অধ্যক্ষের কক্ষ। ওই বিল্ডিংয়ে কোনো পরীক্ষা কেন্দ্র ছিল না। সেন্টারের নিচে টিনশেড ঘরের ৮ নম্বর কক্ষে বসে নুসরাত পরীক্ষা দিয়েছিলেন। 

সাইক্লোন সেন্টারের ছাদে গিয়ে দেখা যায় এখনও নুসরাতের জামা-কাপড়ের আগুনে পোড়া অংশ ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। ছাদ থেকে সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে একেবারে নিচেও পাওয়া যায় ক্ষত চিহ্ন। পুরো ক্যাম্পাসের চারপাশ দেয়ালে ঘেরা। সামনে কলাবসিবল গেইট। মূল গেইট ব্যতিত অন্য কোনো জায়াগা দিয়ে প্রবেশ কিংবা বের হওয়ার সুযোগ নেই। 

সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার ক্যাম্পাসের ভেতরে এই সাইক্লোন সেন্টারে পোড়ানো হয় নুসরাতকে-সমকাল

শনিবার পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, নুসরাত জাহান রাফিকে কারাগারে বসেই হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন অধ্যক্ষ সিরাজ-উদ-দৌলা। তার নির্দেশেই নুসরাতের শরীরে আগুন দেওয়ার পরিকল্পনা করেছিল পাঁচজন। কোথায়, কীভাবে তাকে পুড়িয়ে মারা হবে, সেই পরিকল্পনাও করেন তারা। 

সংবাদ সম্মেলনে জানানো হয়, ৪ এপ্রিল অধ্যক্ষ সিরাজের সঙ্গে কারাগারে দেখা করতে যায় নুর উদ্দিনসহ কয়েকজন। তিনি নুসরাতকে হত্যার নির্দেশ দেন তাদের। এরপর ৫ এপ্রিল মাদ্রাসার পশ্চিম হোস্টেলে বসে নুর উদ্দিন, শাহাদাত, জাবেদ হোসেন, হাফেজ আব্দুল কাদেরসহ পাঁচজন হত্যার পরিকল্পনা করেন। 

নুসরাতকে পুড়িয়ে মারার প্রস্তাব দেয় শাহাদাত। পরে পরিকল্পনার বিষয়টি নিয়ে আরও পাঁচজনের সঙ্গে আলোচনা করেন তারা। এই পাঁচজনের মধ্যে দু'জন ওই মাদ্রাসার ছাত্রী এবং তিনজন ছাত্র। এর মধ্যে এক তরুণীকে বোরকা ও কেরোসিন সরবরাহের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনিও ওই মাদ্রাসার ছাত্রী। ৬ এপ্রিল ৭টা থেকে ৯টার মধ্যে ওই তরুণী তিনটি বোরকা ও পলিথিনে করে কেরোসিন এনে শাহাদাতের কাছে দেয়। আগুন দেওয়ার দিন ওই তরুণী, শাহাদাতসহ চারজন মাদ্রাসা ভবনের ছাদে দুটি টয়লেটে লুকিয়ে ছিলেন।

গুরুতর দগ্ধ অবস্থায় ৬ এপ্রিল রাতে নুসরাতকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে ভর্তি করা হয়। ১০ এপ্রিল রাত সাড়ে নয়টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটে নুসরাত মারা যান।

এর আগে গত ২৭ মার্চ সোনাগাজী ইসলামিয়া ফাজিল মাদ্রাসার অধ্যক্ষ সিরাজ উদদৌলার বিরুদ্ধে শ্লীলতাহানির অভিযোগে মামলা করেন নুসরাতের মা। নুসরাত চিকিৎসকদের কাছে দেওয়া শেষ জবানবন্দিতে বলেছিলেন, ‘নেকাব, বোরকা ও হাতমোজা পরা চারজন তাঁর গায়ে আগুন ধরিয়ে দেন।’

বিষয় : সোনাগাজী ফেনী নুসরাত জাহান রাফি