নার্স তানিয়া ধর্ষণ ও হত্যা

মিনতিতেও মন গলেনি ওদের

চালকের জবানবন্দি

প্রকাশ: ১৩ মে ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সাহাদাত হোসেন পরশ, ঢাকা সাইফুল হক মোল্লা দুলু কিশোরগঞ্জ

স্বর্ণলতা পরিবহনের ভেতরে নার্স শাহিনুর আক্তার তানিয়াকে গণধর্ষণের পর হত্যার নির্মম বর্ণনা দিয়েছে ওই বাসের চালক নুরুজ্জামান নুরু। গতকাল রোববার সে তার দোষ স্বীকার করে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছে আদালতে। তিন কুলাঙ্গারের কাছ থেকে বাঁচতে বারবার আকুতি ও কান্নাকাটি করলেও মন গলেনি তাদের।

পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদ ও জবানবন্দিতে উঠে আসে- বাসের ভেতরে তানিয়াকে একা পেয়ে যখন ধর্ষণ করার ফন্দি আঁটতে থাকে চালক নুরু, হেলপার লালন মিয়া ও তাদের সহযোগী বোরহান, তখন পেছনের একটি আসনে বসা ছিলেন তানিয়া। চালক নুরু কৌশল করে তার আসন ছেড়ে হেলপার লালনকে বাস চালাতে দেয়। আর তখন নুরু ও বোরহান বাসের পেছনের আসনে বসে সিগারেট খাচ্ছিল। এ সময় তারা তানিয়াকে বলতে থাকে, 'আপা, সিগারেট খাচ্ছি। সমস্যা হলে আরেকটু সামনে গিয়া বসেন।' তবে তাদের কথা বলার ভাবভঙ্গি দেখে সন্দেহ হচ্ছিল তানিয়ার। তিনি পেছনের আসন থেকে উঠে জিনিসপত্র গোছগাছ করে সামনে গিয়ে বসেন। এমনকি ওদের আচরণ সন্দেহজনক হওয়ায় গন্তব্যের আগেই নেমে পড়ার চেষ্টা করেন। এমন সময় বোরহান প্রথমে পেছনের আসন থেকে উঠে গিয়ে তানিয়াকে পায়ের মধ্যে তার পা দিয়ে আঘাত করে। এতে ক্ষিপ্ত হয়ে তানিয়া বলতে থাকেন, 'কী ধরনের অসভ্যতা করা হচ্ছে!' এ নিয়ে বোরহানের সঙ্গে তার বাগ্‌বিতণ্ডা তৈরি হয়। একপর্যায়ে বোরহান তাকে জাপটে বাসের ফ্লোরে ফেলে দেওয়ার চেষ্টা করে। তখন দ্রুত পেছন থেকে নুরু উঠে এসে বলতে থাকে, 'আপার সঙ্গে এসব কী হচ্ছে! আপাকে বুঝিয়ে সবকিছু বলতে থাক।' নুরুর এমন বক্তব্য শোনার পর আরও ক্ষিপ্ত হয় ওঠেন তানিয়া। এরপরই নুরু ও বোরহান তানিয়াকে ধস্তাধস্তি করে সিট থেকে তুলে আনার চেষ্টা চালায়। কোনোভাবে তাকে সিট থেকে তোলা সম্ভব না হওয়ায় বাসের চালকের আসনে বসে থাকা লালন মিয়া কৌশল করে জোরে জোরে বাস ব্রেক করতে থাকে। দু-তিনবার জোরে ব্রেক করার পর বাসের মধ্যে ছিটকে পড়েন তানিয়া। এতে বাসের বনেটের সঙ্গে মাথার পেছনে গুরুতর আঘাত পান তিনি। এরপর কিছুটা নিস্তেজ হয়ে পড়লে বোরহান, নুরু ও লালন মিয়া একে একে ধর্ষণ করে তাকে। তখনও তানিয়া ক্ষীণ কণ্ঠে বলতে থাকেন, 'আপনারা আমার এই সর্বনাশ করবেন না।' তানিয়া একপর্যায়ে লালনকে লাথি মেরে ফেলে দেন। পরে উঠে এসে লালন তার দু'হাত জোর করে ধরে রাখে।

নুরুজ্জামান নুরু


তবে ধর্ষণের পর তানিয়াকে হত্যার ব্যাপারে গতকাল পর্যন্ত দুই ধরনের বক্তব্য পাওয়া গেছে। একটি পক্ষ বলছে- দুর্ঘটনার নাটক সাজাতে তানিয়াকে বাস থেকে ছুড়ে ফেলা হয়েছে। আরেকটি পক্ষ বলছে- নির্মম ওই ঘটনার পর তানিয়া নিস্তেজ হয়ে পড়লে আবারও বাসটি দ্রুত ব্রেক করতে থাকে চালক। এতে বাস থেকে ছিটকে পড়ে তিনি। ধর্ষকদের মধ্যে কেউ চেয়েছিল, তাকে রাস্তায় ফেলে যেতে। আবার কেউ চেয়েছিল, আহতাবস্থায় তাকে তুলে নিয়ে চিকিৎসা করাতে। শেষ পর্যন্ত আহতাবস্থায় তাকে তুলে নিয়ে চিকিৎসার নাটক করে তিন ধর্ষক।

জবানবন্দিতে নুরু জানায়- ৬ মে রাত ৮টার পরে স্বর্ণলতা পরিবহনের বাসটি (ঢাকা মেট্রো ব-১৫-৪২৭৪) কটিয়াদী পার হওয়ার পর একজন মধ্যবয়সী বাস থেকে নেমে পড়লে তানিয়া একা হয়ে পড়েন। বাসটি বাজিতপুর উপজেলার বিলপাড় জামতলা নির্জন স্থানে একটি কলাবাগানের কাছে এলে বাসের সব জানালা লাগিয়ে দিয়ে বোরহান প্রথমে তানিয়াকে ধর্ষণ করে। পরে নুরু ও লালন মেয়েটির ওপর পাশবিক নির্যাতন চালায়। এরপর তানিয়াকে রাস্তায় ছুড়ে ফেলার পর রিকশাচালক জাকির মিয়া ও একজন মোটরসাইকেল আরোহী এগিয়ে আসেন। তখন নুরু ও তার সহযোগীরা 'মেয়েটি বাস থেকে নামতে গিয়ে দুর্ঘটনার শিকার হয়েছে' বলে তাদের জানায়। তাই তাদের সাহায্যের প্রয়োজন নেই। তারাই মেয়েটির চিকিৎসার জন্য হাসপাতালে নিয়ে যাচ্ছেন বলে জানায়। পরে রিকশাচালক ও মোটরসাইকেল আরোহী চলে যান। পরে তিন ধর্ষক স্বর্ণলতা পরিবহনের কাউন্টারে খবর দিলে কাউন্টারের লোকজন চলে আসে। প্রথমে তানিয়াকে পিরিজপুর বাজারের সততা ফার্মেসিতে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে রাত পৌনে ১১টার দিকে স্বর্ণলতা পরিবহনের কটিয়াদীর কাউন্টার মাস্টার মো. রফিকুল ইসলাম রফিক ও সুপারভাইজার আল আমিন তানিয়ার নিথর দেহ কটিয়াদী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন তাকে।

এ ছাড়া গতকাল কিশোরগঞ্জ পুলিশ সুপার কার্যালয়ের সভাকক্ষে এক সংবাদ সম্মেলনে ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, 'ধর্ষক নুরু ও লালন মিয়াকে পুলিশ গ্রেফতার করেছে। কিন্তু অপর ধর্ষক বোরহান পলাতক। তাকে গ্রেফতারে পুলিশ ঝটিকা অভিযান শুরু করেছে। তদন্তের বেশ অগ্রগতি হয়েছে। সবকিছু খতিয়ে দেখে দ্রুত অভিযোগপত্র দেওয়া হবে।' এর আগে তানিয়া ধর্ষণ ও হত্যা মামলার পরিস্থিতি জানতে পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বাজিতপুরের বিলপাড় গজারিয়া এলাকা পরিদর্শন করেন। এ সময় তার সঙ্গে কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদসহ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

এদিকে, গতকাল রোববার সকালে কিশোরগঞ্জ জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভা জেলা প্রশাসক মো. সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত হয় জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে। সভায় তানিয়া হত্যা ও গণধর্ষণ নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হয়। এই বর্বর ও নারকীয় নির্যাতনের জন্য একটি লিখিত শোক প্রস্তাব আনার সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় সেখানে। এ ছাড়া তানিয়ার মামলার বিচার দ্রুত বিচার ট্রাইব্যুনালে করার জন্য আইন-শৃঙ্খলা কমিটির সভায় ঐকমত্য প্রকাশ করা হয়। মামলার তদন্ত তদারক কর্মকর্তা কিশোরগঞ্জের পুলিশ সুপার মাশরুকুর রহমান খালেদ বলেন, 'এ ঘটনার আদ্যোপান্ত এরই মধ্যে তদন্তে উঠে এসেছে। বর্বরোচিত এই ঘটনায় কার কী ভূমিকা ছিল, তাও জানা গেছে। এক ধর্ষকসহ পলাতক দুইজনকে গ্রেফতারে সর্বশক্তি নিয়োগ করা হয়েছে।'

বিষয় : শাহিনুর আক্তার তানিয়া তানিয়া ধর্ষণ হত্যা

সেহরি ও ইফতারের সময়সূচি
তারিখ সেহরি ইফতার
২৫ মে '১৯ ৩:৪২ ৬:৪২
২৬ মে '১৯ ৩:৪১ ৬:৪৩
*ঢাকা ও আশেপাশের এলাকার জন্য প্রযোজ্য
সূত্র: ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ