আঞ্চলিক রাজনীতি-১: চট্টগ্রাম

'ঘাঁটি'তে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খুঁজছে বিএনপি

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

তৌফিকুল ইসলাম বাবর, চট্টগ্রাম

'ঘাঁটি'তেই করুণ অবস্থা বিএনপির। একসময় দলটির অন্যতম 'ঘাঁটি' হিসেবে পরিচিত ছিল বন্দরনগরী চট্টগ্রাম। বিভিন্ন নির্বাচনে বেশির ভাগ আসনে জয় ধরে রাখার পাশাপাশি আন্দোলন-সংগ্রামেও 'মাঠ গরম' করে রাখতেন এখানকার স্থানীয় নেতাকর্মীরা। তবে একাদশ সংসদ নির্বাচনে সারাদেশে ছয়টি আসনে বিজয়ী হলেও 'ঘাঁটি'র ১৬টি আসনের একটিতেও জয় পায়নি দেশের অন্যতম এই রাজনৈতিক দল।

নির্বাচনে এমন 'করুণ পরাজয়ে'র পর এখন ঘাঁটিতেই 'দিশেহারা' বিএনপি। নির্বাচনের পর গত সাড়ে পাঁচ মাসে 'মুখরক্ষা'র কিছু কর্মসূচি ছাড়া চট্টগ্রামে তেমন কোনো কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারেনি দলটি। মহানগর বিএনপির নেতাকর্মীদের কিছুটা সক্রিয় দেখা গেলেও চট্টগ্রাম উত্তর ও দক্ষিণ জেলার নেতাকর্মীরা মাঠ থেকে এক প্রকার 'উধাও' হয়ে গেছেন।

শুধু বিএনপি নয়, দলটির নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোর অবস্থাও খুব একটা ভালো নয়। অভিন্ন অবস্থা জাতীয় ঐক্যফ্রন্টেরও। জোটের শরিক দলগুলোর মধ্যে 'ঐক্য' থাকার কথা বলা হলেও বাস্তবে তেমন কোনো যোগাযোগ নেই বললেই চলে নিজেদের মধ্যে। শরিক দলগুলোর মধ্যে চরম সংকটে রয়েছে জামায়াতে ইসলামী। কোনোভাবে টিকে আছে এলডিপি, কল্যাণ পার্টিসহ কয়েকটি দল। অবশিষ্ট দলগুলো এক প্রকার অস্তিত্ব সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বীরবিক্রম ও কল্যাণ পার্টি সভাপতি মেজর জেনারেল (অব.) সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিমের বাড়ি চট্টগ্রামে হওয়ায় দল দুটি নিয়ে এখানকার মানুষের 'বিশেষ আগ্রহ' রয়েছে। তবে তাদের উল্লেখযোগ্য কোনো কার্যক্রম নেই।

বিএনপির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, দুঃসময় কাটিয়ে উঠে চট্টগ্রামে ঘুরে দাঁড়ানোর পথ খুঁজছে তারা। এই পথের একটি ছিল রমজান মাস। পবিত্র এই মাসে ইফতার মাহফিলের ব্যানারে সহজে দলীয় কর্মসূচি পালন করা যায়। তাই এবার পুরো রমজান মাস বিএনপি এবং অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর ব্যানারে ইফতার মাহফিল করা হয়। এভাবে নেতাকর্মীদের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ বাড়িয়ে দলকে সংগঠিত করার চেষ্টা করেছেন তারা।

নগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন দলের সিনিয়র সহসভাপতি আবু সুফিয়ান ও সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্করসহ সিনিয়র নেতাদের নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর এই প্রস্তুতিমূলক কাজগুলো করছেন। ঈদের পর ঐক্যফ্রন্ট ও ২০ দলীয় জোটের শরিক দলগুলোকে নিয়েও সমন্বিত কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে কঠিন সময় মোকাবেলার পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। এ ক্ষেত্রে কেন্দ্রঘোষিত কর্মসূচির পাশাপাশি স্থানীয় বিভিন্ন ইস্যুতে সরব হবেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। এরই মধ্যে ধানের ন্যায্যমূল্যের দাবিতে জেলা প্রশাসককে স্মারকলিপি দিয়েছে বিএনপি।

এ ব্যাপারে চট্টগ্রাম মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন সমকালকে বলেন, 'নির্বাচনের পরও সরকার বিএনপিকে কোণঠাসা করে রাখার চেষ্টা করছে। কিন্তু সরকারের এই চেষ্টা রুখে দিয়ে বিএনপি ঘুরে দাঁড়াবে। এখন দলের সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের ঐক্যবদ্ধ করার কাজ চলছে।' এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, 'সরকার নতুন করে মামলা না দিলেও পুরনো মামলাগুলো তুলে নেওয়ার পরিবর্তে মিথ্যা অভিযোগে চার্জশিট দিচ্ছে। কয়েক দিন আগে আমার বিরুদ্ধেও একটি চার্জশিট দিয়েছে কোতোয়ালি থানা।'

৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনে বিএনপি এবং এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর বিপুলসংখ্যক নেতাকর্মী মামলার জালে আটকা পড়েন। তাদের বেশির ভাগই এরই মধ্যে জামিন নিয়ে জেল থেকে বেরিয়ে এসেছেন। তবে এখনও তাদের ভয় পুরোপুরি কাটেনি। ফলে জেল থেকে বের হওয়ার পরও অনেক নেতাকর্মী মাঠে সক্রিয় হচ্ছেন না। মূলত এসব নেতাকর্মীকে ঘর থেকে বের করে মাঠে নামানোর চেষ্টা করছেন বিএনপি নেতারা।

নির্বাচনের পর থেকে নতুন করে কোনো মামলা-মোকদ্দমা হয়নি। তারপরও আতঙ্ক কাটছে না বিএনপির নেতাকর্মীদের। নগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আবু সুফিয়ানের বক্তব্যেও এটা স্পষ্ট। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি সমকালকে বলেন, 'নির্বাচনের পর থেকে জামিন ও মামলা নিয়ে আদালতে ব্যস্ত বিএনপির নেতাকর্মীরা। এখনও অনেক নেতাকর্মী জেলে রয়েছেন। উল্লেখযোগ্য নেতাকর্মীদের গোয়েন্দা নজরদারিতে রাখা হয়েছে। মোবাইল ফোন ট্র্যাকিং করা হচ্ছে। এসব বিষয় স্বাভাবিক রাজনৈতিক ও ব্যক্তিগত জীবনকে ব্যাহত করছে। সরকার কূটকৌশলের অংশ হিসেবে এসব কাজ করছে।'

একই প্রসঙ্গে নগর বিএনপির সহদপ্তর সম্পাদক মো. ইদ্রিস আলী বলেন, 'এত নির্যাতন-নিপীড়নের পরও কোনো বিএনপি নেতাকর্মী দল ছাড়েননি। এমন দুঃসময়ে যারা দলে রয়েছেন, তারা সাহসী। তাদের এই সাহস ধরে রাখতে, উজ্জীবিত রাখতে কাজ করছেন দলের সিনিয়র নেতারা।'

অন্তর্কোন্দলও রয়েছে : এদিকে, দলের কঠিন সময়েও চট্টগ্রামে বিএনপির নেতাদের মধ্যে এখনও কমবেশি অন্তর্কোন্দল রয়েই গেছে। এখানে দলের স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী, ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান ও মহানগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেনের তিনটি গ্রুপ আগের মতো না হলেও এখনও সক্রিয়।

আমীর খসরুর পাশাপাশি বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য হতে চেয়েছিলেন আবদুল্লাহ আল নোমানও। কিন্তু কাঙ্ক্ষিত পদ না পেয়ে দলে 'দাপট' ও 'আধিপত্য' বিস্তারের রাজনীতিতে তিনি কিছুটা পিছিয়ে পড়েন। একসময় দলের ভাইস চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনের বড় একটি গ্রুপ থাকলেও তিনি অবশ্য আগের মতো সক্রিয় নন। নগর বিএনপির সিনিয়র সহসভাপতি আবু সুফিয়ান ও সাধারণ সম্পাদক আবুল হাশেম বক্করসহ কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ বিএনপি নেতা শাহাদাতের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে এবং সমর্থন নিয়ে কাজ করেন।

অঙ্গ সংগঠনেরও বেহাল অবস্থা :  চট্টগ্রাম মহানগরে বিএনপির চেয়ে অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনগুলোর অবস্থা আরও খারাপ। ২০১৩ সালের ২২ জুলাই নগর ছাত্রদলের ১১ জনের একটি অপূর্ণাঙ্গ কমিটি গঠন করা হয়। ছাত্রদল নেতা গাজী সিরাজউল্লাহকে সভাপতি ও বেলায়েত হোসেন বুলুকে সাধারণ সম্পাদক করে গঠন করা এ কমিটির মেয়াদ শেষ হয়েছে ২০১৫ সালের ২১ জুলাই। চার বছর আগে মেয়াদ শেষ হলেও নতুন কমিটি করা হয়নি। এরই মধ্যে নগর বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক হয়ে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড চালাচ্ছেন গাজী সিরাজউল্লাহ। বেলায়েত হোসেন বুলু সাধারণ সম্পাদকের পদ নিয়ে নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের রাজনীতিতে ঢুকে পড়েছেন। আর নগর ছাত্রদলের সহসভাপতি এইচ এম রাশেদকে করা হয়েছে নগর স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি। এভাবে ছাত্রদলের অনেক নেতাই মূল দলসহ বিভিন্ন অঙ্গ সংগঠনে ঢুকে পড়েছেন। ফলে ছাত্রদলের কোনো কার্যক্রম নেই বললেই চলে। মাঠে নেই যুবদল, স্বেচ্ছাসেবকসহ অন্যান্য সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরাও।

অস্তিত্ব সংকটে জামায়াত : চট্টগ্রামে অনেক এলাকা একসময় জামায়াতের শক্ত ঘাঁটি ছিল। এর মধ্যে সাতকানিয়া, বাঁশখালী ও সীতাকুণ্ডে দলটির ভালো অবস্থান ছিল। সাতকানিয়া আসনে কয়েক দফায় দলটির প্রার্থী সংসদ সদস্যও নির্বাচিত হন। কিন্তু এখন সাতকানিয়াসহ অন্য এলাকাগুলোতেও অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে জামায়াত। একসময় 'হরিহর আত্মা' ছিল বিএনপি-জামায়াত। নানা ইস্যুতে তাদের মধ্যে এখন দূরত্ব এত বেশি যে দল দুটির মধ্যে তেমন কোনো সম্পর্ক নেই বললেই চলে। এ ছাড়া জোটের অন্য দলগুলোর বেশির ভাগই কমিটিসর্বস্ব। তাদের কোনো কার্যক্রম নেই। জোটের বৈঠক ডাকা হলে হাজির হওয়ার মধ্যেই বেশির ভাগ দলের কার্যক্রম সীমাবদ্ধ।

জামায়াতের চট্টগ্রাম মহানগর আমির মো. শাহজাহান ও সাধারণ সম্পাদক নজরুল ইসলামসহ দলটির আরও কয়েকজন নেতার সঙ্গে বেশ কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করেও এসব ব্যাপারে তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। তাদের সবার মুঠোফোন নম্বর বন্ধ। কিছুদিন পরপর মুঠোফোনের নম্বর পরিবর্তন করেন তারা। নিজেদের মধ্যে যোগাযোগের জন্য দলের হাতেগোনা কয়েকজনকে ছাড়া মুঠোফোনের নম্বর দেন না। গণমাধ্যমকর্মীদেরও এড়িয়ে চলেন।

কার্যক্রম নেই ২০ দল ও ঐক্যফ্রন্টের শরিকদের : কাগজে-কলমে ২০ দলীয় জোট থাকলেও বিএনপির বাইরে দু-তিনটি দল ছাড়া জোটভুক্ত দল বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি-বিজেপি, ইসলামী ঐক্যজোট (একাংশ), খেলাফত মজলিস, জাতীয় গণতান্ত্রিক পার্টি-জাগপা, বাংলাদেশ লেবার পার্টি, ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি-ন্যাপ ভাসানীসহ অন্য দলগুলোর তেমন কোনো কার্যক্রম খুব বেশি চোখে পড়ে না। জোটের কোনো সমন্বয় সভা হলেই বেশির ভাগ দলের দু-একজন করে প্রতিনিধি দেখা যায়। এলডিপি সভাপতি কর্নেল (অব.) অলি আহমদের বাড়ি চট্টগ্রামে হওয়ায় মাঝেমধ্যে তার তদারকিতে দলটির কিছু কর্মসূচি পালন করা হয়। তাকে ঘিরেই চলে দলটির এখানকার রাজনীতি। এলডিপি মহানগরের সভাপতি মো. সলিমউল্লাহ ও সাংগঠনিক সম্পাদক দোস্ত মোহাম্মদসহ কয়েকজন জোটের কার্যক্রমে কিছুটা সক্রিয় ভূমিকা রাখতেন। অসুস্থ হয়ে পড়ায় এখন মাঠে নেই সলিমউল্লাহ। কল্যাণ পার্টির সভাপতির বাড়িও চট্টগ্রামে। তাকে ঘিরে এখানকার মানুষের কৌতূহল রয়েছে। কিন্তু দলটির কার্যক্রম তেমন নেই।


এলডিপির সাংগঠনিক সম্পাদক দোস্ত মোহাম্মদ সমকালকে বলেন, 'জোটের রাজনীতি আগের মতো নেই। তেমন কোনো কর্মসূচিও নেই। ফলে চট্টগ্রামেও কার্যক্রম চোখে পড়ছে না। তবে দলীয়ভাবে কর্মসূচি থাকলে পালন করা হয়।'

একই অবস্থা এখানকার জাতীয় ঐক্যফ্রন্টেও। ফ্রন্টের অন্যতম শরিক গণফোরাম, জেএসডি, নাগরিক ঐক্যেরও তেমন তৎপরতা নেই বললেই চলে। ৩০ ডিসেম্বরের নির্বাচনকে ঘিরে ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন দলটি চট্টগ্রামে কিছুটা চাঙ্গা হয়েছিল। দলটির প্রেসিডিয়াম সদস্য অ্যাডভোকেট জানে আলম ফ্রন্টে দলের পক্ষে জোরালো ভূমিকা রাখতেন। ধীরে ধীরে দলটির কার্যক্রমেও ভাটা পড়েছে।

বিষয় : বিএনপি চট্টগ্রাম রাজনীতি