আঞ্চলিক রাজনীতি-১: চট্টগ্রাম

আ'লীগে কমেছে কোন্দল বেড়েছে স্থবিরতা

প্রকাশ: ২৪ জুন ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ এ বি এম মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যু এবং গত জাতীয় নির্বাচনে দলীয় মনোনয়ন নিয়ে ক্ষোভ বড় ধরনের প্রভাব ফেলেছে চট্টগ্রামে মহানগর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে। এতে সৃষ্টি হয়েছে নতুন মেরুকরণ। দীর্ঘদিন ধরে বিরাজমান দলীয় কোন্দলও পেয়েছে ভিন্নমাত্রা।

মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক ও চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীনের বিরোধ ছিল চরমে। মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর সেই কোন্দল কমেছে অনেকখানি। তবে বেড়েছে সাংগঠনিক স্থবিরতা। গত পাঁচ মাসে নগর ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ জাঁকজমকের সঙ্গে কোনো দলীয় কর্মসূচি পালন করতে পারেনি।

দলের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোতেও বিশৃঙ্খলা চলছে। টানা ১০ বছরের বেশি সময় দল ক্ষমতায় থাকায় এসব সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যেও অনেকটাই গা-ছাড়া ভাব দেখা যাচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতেও নেতাকর্মীদের তৎপরতা চোখে পড়ছে না বললেই চলে।

অন্যদিকে, রাজপথ উত্তপ্ত না থাকায় আওয়ামী লীগের সঙ্গে ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের সখ্যেও ভাটা পড়েছে। মহিউদ্দিন চৌধুরী ১৪ দলের মহানগর সমন্বয়ক হিসেবে শরিকদের ঐক্যবদ্ধ ও সক্রিয় রেখেছিলেন। তার মৃত্যুর পর শরিক দলের সঙ্গে সমন্বয়হীনতা চলছে আওয়ামী লীগের; বেড়েছে দূরত্ব।

বন্ধু হচ্ছে শত্রু, শত্রু মিত্রতে :মহিউদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে বেশ ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই ছিল মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি খোরশেদ আলম সুজনের। তবে বর্তমানে মেয়র নাছির উদ্দীনের সঙ্গে সম্পর্কের উন্নয়ন ঘটিয়েছেন সুজন। সাবেক সিডিএ চেয়ারম্যান ও নগরের কোষাধ্যক্ষ আবদুচ ছালামের সঙ্গেও নাছিরের দূরত্ব কমেছে।

তবে আগে সখ্য থাকলেও নাছিরের সঙ্গে চট্টগ্রাম-১১ (বন্দর-পতেঙ্গা) আসনের এমপি এম এ লতিফের দূরত্ব বেড়েছে। তিনি সম্পর্কের উন্নয়ন করছেন মহিউদ্দিন চৌধুরীর ছেলে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক ও শিক্ষা উপমন্ত্রী ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেলের সঙ্গে। নগরের আরেক এমপি চট্টগ্রাম-১০ আসনের ডা. আফছারুল আমীনের সঙ্গেও মেয়র নাছিরের সম্পর্ক এখন অনেকটাই শীতল। আগে তাদের মধ্যে খুবই ঘনিষ্ঠতা ছিল। এসব মেরুকরণ নগরে দলীয় রাজনীতিতেও প্রভাব ফেলছে। তবে নগরের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব উদ্দিন চৌধুরীর সঙ্গে সাধারণ সম্পাদক নাছিরের দূরত্ব না থাকায় আওয়ামী লীগের কোন্দল সার্বিকভাবে কমেছে।

ব্যারিস্টার নওফেলকে ঘিরে নতুন বলয় : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে চট্টগ্রাম-৯ (কোতোয়ালি) আসন থেকে ব্যারিস্টার মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এমপি নির্বাচিত এবং নতুন সরকারের শিক্ষা উপমন্ত্রীর দায়িত্ব পাওয়ায় এর একটা প্রভাব পড়ছে স্থানীয় রাজনীতিতে। মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর তার কোণঠাসা ও হতাশাগ্রস্ত সমর্থকদের মধ্যে নতুন করে প্রাণ সঞ্চার করছেন ব্যারিস্টার নওফেল।

দলীয় সূত্র জানায়, আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদকের গুরুত্বপূর্ণ পদে থাকলেও স্থানীয় রাজনীতির দিকেও সমান নজর রাখছেন নওফেল। পাশাপাশি দলীয় রাজনীতিতে প্রভাববলয়ও গড়ে তুলেছেন তিনি। বাবার অনুসারীদের সংগঠিত রাখতে স্থানীয় বিভিন্ন কর্মসূচিতেও অংশ নিচ্ছেন তিনি।

নিষ্ফ্ক্রিয় নগর কমিটির গুরুত্বপূর্ণ নেতারা : চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের অধিকাংশ সদস্যই দলীয় কর্মসূচিতে নিষ্ফ্ক্রিয় থাকেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। গত জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন না পেয়ে দল থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছেন বেশ কয়েকজন নেতা। আরেকটি অংশ নিষ্ফ্ক্রিয় দলে কাঙ্ক্ষিত পদ না পেয়ে।

গত জাতীয় নির্বাচনে মনোনয়ন চেয়েছিলেন নগর কমিটির সহসভাপতি খোরশেদ আলম সুজন, অ্যাডভোকেট ইব্রাহিম হোসেন বাবুল, আলতাফ হোসেন বাচ্চু ও কোষাধ্যক্ষ আবদুচ ছালাম। তাদের কেউই শেষ পর্যন্ত মনোনয়ন পাননি। দীর্ঘদিন দলীয় রাজনীতিতে সক্রিয় থাকার পরও মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ায় এসব নেতার মধ্যে বিরাজ করছে হতাশা। আবার সহসভাপতির পদে থাকা সাবেক মন্ত্রী নুরুল ইসলাম বিএসসি ও ডা. আফছারুল আমীন পছন্দের পদ না পাওয়ায় সাংগঠনিক কার্যক্রম থেকে নিজেদের গুটিয়ে রেখেছেন। একান্ত দরকার না হলে তারা যোগ দিচ্ছেন না কমিটির কোনো সভায়।

চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের ৭১ সদস্যের পূর্ণাঙ্গ কমিটি ঘোষণা করা হয় ২০১৩ সালে। তিন বছর মেয়াদি নগর কমিটির মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে অনেক আগেই। দীর্ঘদিন সম্মেলন না হওয়া ও নতুন নেতৃত্ব সৃষ্টি না হওয়ায়ও স্থবিরতা দেখা দিয়েছে সাংগঠনিক কার্যক্রমে।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রাম মহানগর আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি মাহতাব চৌধুরী সমকালকে বলেন, আগে কিছুটা ভুল বোঝাবুঝি থাকলেও এখন সেটিও নেই নগর আওয়ামী লীগে। রাজনীতির মাঠ গরম না থাকায় দলীয় কর্মসূচি কম। তাই সাংগঠনিক চাপও কম। মাঠ গরম থাকলে চাঙ্গা হয়ে যাবে দলও। মেয়র নাছির উদ্দীন বলেন, নগর আওয়ামী লীগে কোনো মতবিরোধ নেই। দলের প্রয়োজনে সবাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে কাজ করছেন। সম্প্রতি দলের মহানগর এবং উত্তর ও দক্ষিণ জেলা কমিটির যৌথ বর্ধিত সভা হয়েছে। তবে নগরের কিছু নেতা নানা কারণে নিষ্ফ্ক্রিয় থাকলেও দলের প্রয়োজনে তারাও সক্রিয় হবেন বলেই তার আশা।

মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর দলের রাজনীতিতে নয়া মেরুকরণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, রাজনীতিতে শেষ কথা বলে কিছু নেই। এখানে চিরস্থায়ী কোনো শত্রু নেই, আবার স্থায়ী কোনো বন্ধুও নেই। আওয়ামী লীগ দেশের সবচেয়ে প্রাচীন রাজনৈতিক দল। তাই এখানে বৈচিত্র্য যেমন বেশি, তেমনি প্রত্যাশাও বেশি।

বিশৃঙ্খলা থানা কমিটিগুলোতে : মহানগরে দলের সব থানা, ওয়ার্ড ও ইউনিট কমিটিগুলো ঢেলে সাজানোর কাজ শুরু করেও শেষ করতে পারেনি নগর আওয়ামী লীগ। তৃণমূলের এসব কমিটিতে দীর্ঘদিন ধরে নিষ্ফ্ক্রিয় নেতাদের বাদ দিয়ে ত্যাগী ও নিবেদিত নেতাদের স্থান দেওয়ার বিষয়ে একাধিকবার ঘোষণা দেওয়া হলেও তা পুরোপুরি বাস্তবায়ন করা হয়নি।

নগর কমিটির কার্যক্রম শক্তিশালী ও চাঙ্গা করতে একাধিক পদধারী নেতাকে শুধু একটি পদ দেওয়া হবে বলে আগে থেকে বলা হচ্ছিল। দলীয় গঠনতন্ত্র অনুসারে নগরীর তিনটি ইউনিট নিয়ে একটি ওয়ার্ড গঠিত হয়। এ ক্ষেত্রে বলা হয়েছিল, তৃণমূল নেতাকর্মীদের সম্মতি নিয়ে প্রথমে প্রতিটি ইউনিটে কমিটি গঠন করা হবে। মহানগর নেতারা বসে আলোচনার মাধ্যমে কমিটিগুলো করবেন। তবে এ সিদ্ধান্তে আপত্তি দেখা দিলে তৃণমূল পর্যায়ে সম্মেলন আয়োজন করে গোপন ব্যালটের মাধ্যমে ইউনিট কমিটিগুলো গঠন করার সিদ্ধান্ত হয়। দু'বছর পার হলেও সেই ঘোষণা বাস্তবায়ন করা হয়নি।

সহযোগী সংগঠনে নেই শৃঙ্খলা : চট্টগ্রামে আওয়ামী লীগের জোরালো কোনো সাংগঠনিক কর্মসূচি না থাকায় দলের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলো অনেকটাই নিষ্ফ্ক্রিয়। নেতাকর্মীরা জড়িয়ে পড়ছেন গৃহবিবাদে। সহযোগী-ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনগুলোর মধ্যে মহিলা আওয়ামী লীগ, যুবলীগ, শ্রমিক লীগ ও ছাত্রলীগসহ অন্য সংগঠনগুলো তুচ্ছ ঘটনা নিয়েও প্রায়ই সহিংসতায় জড়িয়ে পড়ছে।

চট্টগ্রাম মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে রয়েছে চরম অন্তর্দ্বন্দ্ব ও কোন্দল। সম্প্রতি নগর মহিলা আওয়ামী লীগের কমিটি নিয়ে এ বিরোধ আরও তীব্র হয়েছে। পাল্টাপাল্টি কমিটি ঘোষণা করেছে দুটি পক্ষ। এর আগে সম্মেলনের মাধ্যমে হাসিনা মহিউদ্দিনকে সভাপতি ও আনজুমান আরা চৌধুরী আনজীকে সাধারণ সম্পাদক করে মহানগর মহিলা আওয়ামী লীগের কমিটি ঘোষণা করা হয়েছিল। তবে নমিতা আইচকে সভাপতি ও রেখা আলমকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দেখিয়ে ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করছে অন্য পক্ষ।

অভ্যন্তরীণ কোন্দলের জের ধরে কেবল গত এক বছরেই চট্টগ্রামে ছাত্রলীগ ও যুবলীগের অর্ধডজন নেতাকর্মী খুন হয়েছেন। বিশেষ করে ছাত্রলীগ নেতারা একে অপরের সঙ্গে চরম দ্বন্দ্ব ও সংঘাত-সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়ছেন। তিন দশক পর সম্প্রতি চট্টগ্রাম কলেজ ও মহসিন কলেজে ছাত্রশিবিরের আধিপত্য ভেঙে ছাত্রলীগ শক্ত অবস্থান তৈরি করেছিল। তবে ছাত্রলীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে এ দুটি কলেজ ও আশপাশের এলাকায় নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। চট্টগ্রাম কলেজে ছাত্রলীগের কমিটি গঠনকে কেন্দ্র করে বিবদমান দু'পক্ষের সংঘাত, প্রকাশ্যে অস্ত্রের মহড়া, ভাংচুর, ককটেল বিস্ম্ফোরণ ও গোলাগুলির মতো ঘটনায় আতঙ্কিত শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও স্থানীয়রা। কমিটি নিয়ে বিরোধের জের ধরে চট্টগ্রাম কলেজ ছাত্রলীগের দুটি পক্ষ এমন মুখোমুখি অবস্থানে রয়েছে অনেক দিন ধরেই।

দূরত্ব বেড়েছে শরিকদের সঙ্গেও :মহিউদ্দিন চৌধুরীর মৃত্যুর পর ১৪ দলীয় জোটের শরিকদের সঙ্গে নগর আওয়ামী লীগের দূরত্ব বেড়েছে। নির্বাচনের পর এখন পর্যন্ত জোট শরিকদের নিয়ে কোনো বৈঠক হয়নি। কার্যত সমন্বয়হীনতা ও নিষ্ফ্ক্রিয়তা দেখা দিয়েছে ১৪ দলের কার্যক্রমে। আওয়ামী লীগ নেতাদের অবহেলায় ক্ষুব্ধ শরিক দলের নেতারা জোটের কার্যক্রম থেকে নিজেদের সরিয়ে রেখেছেন।

বিষয় : আওয়ামী লীগ রাজনীতি চট্টগ্রাম