ঈদের আগেই পণ্যের জট চট্টগ্রাম বন্দরে

অতিবৃষ্টির কারণে বহির্নোঙরে ২৬ জাহাজ * কনটেইনারে জমেছে ৪ লাখ ৮০ হাজার টন পণ্য

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০১৯     আপডেট: ১৩ জুলাই ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়ায় ঈদুল আজহার আগেই পণ্যজটে টালমাটাল চট্টগ্রাম বন্দর। আমদানি পণ্যবাহী কনটেইনারের ধারণক্ষমতা ৩৭ হাজার হলেও বন্দরে এখন কনটেইনার আছে ৪০ হাজারেরও বেশি। ২০ ফুট দীর্ঘ এসব কনটেইনারে পণ্য আছে প্রায় ৪ লাখ ৮০ হাজার টন। বহির্নোঙরে থাকা ২৬টি জাহাজে আটকে আছে আরও প্রায় ৪০ হাজার টন পণ্য।

প্রতিদিন প্রায় দুই কোটি টাকা লোকসান দিয়ে এসব জাহাজ ঠায় দাঁড়িয়ে আছে ছয় দিন ধরে। বিরূপ আবহাওয়ার কারণে পণ্য পরিবহন করতে পারছে না চার শতাধিক লাইটারেজ জাহাজও। প্রতিদিন বুকিং নিলেও বড় জাহাজ থেকে পণ্য নামাতে তারা যেতে পারছে না বন্দরের বহির্নোঙরে। বাজেট ও ঈদ সামনে রেখে দেশে বিপুল পরিমাণের পণ্য এলেও বন্দর জেটিতে পণ্য খালাসের হার ক্রমে কমতে থাকায় তৈরি হয়েছে এই পণ্যজট। এদিকে আমদানি পণ্য ধারণক্ষমতার বাইরে চলে যাওয়ায় তা খালাস করতে ব্যবসায়ীদের বারবার তাগাদা দিচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে বর্ধিত হারে জরিমানা করা হবে বলে নোটিশও ইস্যু করেছেন তারা।

জানতে চাইলে চট্টগ্রাম বন্দরের সচিব মোহাম্মদ ওমর ফারুক বলেন, 'ঈদ ও বাজেট সামনে রেখে চট্টগ্রাম বন্দরে পণ্য আমদানির পরিমাণ বেড়েছে। কিন্তু যে হারে পণ্য আসছে সেই হারে খালাস হচ্ছে না ইয়ার্ড থেকে। এ জন্য আমদানি পণ্যের কনটেইনার ধারণক্ষমতার বাইরে চলে গেছে। তবে সার্বিকভাবে পরিস্থিতি এখনও আমাদের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। পণ্য খালাসের পরিমাণ বাড়াতে ব্যবসায়ীদের বারবার তাগাদা দেওয়া হচ্ছে।

অন্যথায় পণ্যের ভাড়া বাবদ বর্ধিত হারে জরিমানা (পেনাল রেন্ট) আরোপ করা হবে।' কখন থেকে পেনাল রেন্ট আরোপ হবে- এমন প্রশ্নের জবাবে বন্দরের পরিচালক (পরিবহন) এনামুল করিম বলেন, 'জাহাজ থেকে পণ্য নামার চার দিন পর্যন্ত ফ্রি অব টাইম পান আমদানিকারকরা। এ সময়ের মধ্যে পণ্য খালাস করলে কোনো ভাড়া দিতে হয় না বন্দর কর্তৃপক্ষকে। ইয়ার্ডে থাকা ২০ ফুট দীর্ঘ কনটেইনারে পঞ্চম দিন থেকে পরবর্তী সাত দিন প্রতিদিন ৬ ডলার, অষ্টম দিন থেকে ২০তম দিন পর্যন্ত ১২ ডলার ও ২১তম দিন থেকে পরবর্তী প্রতিদিন ২৮ ডলার করে পণ্য রাখার ভাড়া নেয় বন্দর। পেনাল রেন্ট আরোপ করা হলে এই ভাড়ার বাইরে অতিরিক্ত অর্থ দিতে হবে আমদানিকারককে। এটির পরিমাণ সর্বোচ্চ চার গুণ পর্যন্ত হতে পারে।'

চট্টগ্রামে থাকা দেশের প্রধান সমুদ্রবন্দরে ২০ ফুট দীর্ঘ আমদানি কনটেইনার থাকতে পারে ৩৭ হাজার। কিন্তু এখন পণ্যভর্তি কনটেইনার আছে প্রায় ৪০ হাজার। ২০ ফুট দীর্ঘ একটি কনটেইনারে সাধারণত ১২ টন পণ্য রাখা যায়। এ হিসাবে বন্দরে থাকা আমদানি পণ্যভর্তি কনটেইনারগুলোতে আছে প্রায় ৪ লাখ ২০ হাজার টন পণ্য। সব মিলিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে এখন কনটেইনারের ধারণক্ষমতা ৪৯ হাজার ১৮টি। কিন্তু বৃহস্পতিবার এই বন্দরে কনটেইনার ছিল ৪৪ হাজার ৪৪৭টি। বুধবার এটি ছিল ৪৪ হাজার ২৬১। সার্বিকভাবে কনটেইনারের ধারণক্ষমতা সীমা না ছাড়ালেও পরিচালন কার্যক্রম সম্পন্ন করতে গিয়ে এখন হিমশিম খাচ্ছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। কারণ পণ্য ডেলিভারির কার্যক্রম মসৃণভাবে করতে ধারণক্ষমতার চেয়ে অন্তত ৩০ শতাংশ জায়গা খালি রাখতে হয়। কনটেইনারের সংখ্যা ক্রমেই বাড়তে থাকায় ব্যবসায়ীদের উদ্দেশ্যে দেওয়া নোটিশে পেনাল রেন্ট আরোপের হুমকিও দিয়েছে বন্দর কর্তৃপক্ষ। দিনক্ষণ উল্লেখ না করলেও শিগগির এটি করা হবে বলে জানিয়েছেন তারা।

এদিকে বিরূপ আবহাওয়ার কারণে চট্টগ্রাম বন্দরের বহির্নোঙরেও তৈরি হয়েছে পণ্যজট। এখানে থাকা ২৬টি জাহাজে এখানে আটকা পড়েছে প্রায় ৪০ হাজার টন পণ্য। ছয় দিন ধরে টানা বৃষ্টি হওয়ায় এসব জাহাজ থেকে এক টন পণ্যও নামানো যায়নি। কর্ণফুলী নদীতে অপেক্ষমাণ সাড়ে চার শতাধিক লাইটারেজ প্রতিদিন বুকিং নিলেও পণ্য নামাতে যেতে পারছে না সাগরে দাঁড়িয়ে থাকা বড় জাহাজে।

বিষয়টি স্বীকার করে বাংলাদেশ শিপ হ্যান্ডলিং অ্যান্ড বার্থ অপারেটর অ্যাসোসিয়েশনের চেয়ারম্যান একেএম শামসুজ্জামান রাসেল বলেন, 'স্বাভাবিকভাবে বহির্নোঙরে থাকা বড় জাহাজ থেকে প্রতিদিন গড়ে ১৫ হাজার টন পণ্য বিভিন্ন লাইটারেজ জাহাজে খালাস করি আমরা। কিন্তু টানা বৃষ্টির কারণে ছয় দিন ধরে কর্ণফুলী নদীতে অলস বসে আছে সাড়ে চার শতাধিক লাইটারেজ জাহাজ। তবে পরিস্থিতি কিছুটা উন্নতি হওয়ায় শুক্রবার ৩৭টি জাহাজ বুকিং দেওয়া হয়েছে। বিকেল ৫টার পর এসব জাহাজ বহির্নোঙরে যাওয়ার কথা রয়েছে।'

এক প্রশ্নের জবাবে একেএম শামসুজ্জামান রাসেল বলেন, 'জাহাজগুলো অলস পড়ে থাকায় এসব জাহাজ মালিককে সহস্রাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর প্রতিদিনকার খরচ বহন করতে হচ্ছে। আবার কাজ বন্ধ থাকলেও পরিচালন বাবদ দৈনিক ৮ লাখ টাকা গড়ে খরচ হচ্ছে ২৬টি বড় জাহাজের প্রতিটির। দৈনিক দুই কোটি টাকা হিসাবে ২৬টি জাহাজের পেছনে ব্যবসায়ীদের শুধু ছয় দিনেই বাড়তি খরচ হয়েছে ১২ কোটি টাকারও বেশি। বৃষ্টি দীর্ঘায়িত হলে এ খরচের পরিমাণ বাড়বে আরও।'

বিষয় : চট্রগ্রাম বন্দর ঈদুল আযহা পণ্যবাহী কনটেইনার