বাঁধ ভেঙে সর্বনাশ

নওগাঁ, জামালপুর সিরাজগঞ্জের ৪০ গ্রাম প্লাবিত

প্রকাশ: ১৭ জুলাই ২০১৯      

নওগাঁ, সিরাজগঞ্জ ও জামালপুর প্রতিনিধি

নওগাঁর মান্দায় পানির তোড়ে ভেঙে গেছে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ। প্লাবিত হয়েছে আশপাশের ২০ গ্রাম— সমকাল

রাতের আঁধারে হঠাৎ করেই বিভীষিকা নেমে এসেছে নওগাঁর মান্দা, জামালপুরের মাদারগঞ্জ ও সিরাজগঞ্জের কাজীপুর উপজেলার ৪০ গ্রামের মানুষের মধ্যে। রাতে পাহারা দিয়ে অনেক চেষ্টার পরও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ এবং স্থানীয় রিং বাঁধ রক্ষা করা যায়নি। বাঁধগুলো ভেঙে এসব এলাকায় হুহু করে বন্যার পানি ঢুকে পড়েছে। এতে এসব গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। তলিয়ে গেছে ক্ষেতের ফসল। বসতবাড়িতে পানি প্রবেশ করায় ঘরের আসবাব ও মালপত্র নিয়ে চরম বিপাকে পড়েছেন বন্যার্তরা।

মঙ্গলবার গভীর রাতে নওগাঁর মান্দায় বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ভেঙে ২০ গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। আত্রাই নদীর ডান তীরে উপজেলার কশব ইউনিয়নের চকবালু নামক স্থানে বাঁধটি ভেঙে যায়। এতে অন্তত অর্ধ লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। বাঁধটি ভেঙে যাওয়ায় উপজেলা সদরের সঙ্গে পূর্ব মান্দার সব ধরনের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে।

গত কয়েক দিনের টানা বর্ষণ ও উজান থেকে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলে আত্রাই নদীর পানি জোতবাজার পয়েন্টে বিপদসীমার ১০০ সেন্টিমিটার ওপর দিয়ে প্রবাহিত হচ্ছে। এতে আত্রাই ও ফকির্ণী নদীর উভয় তীরে বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের অন্তত ৩০টি পয়েন্ট ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে। এর মধ্যে মঙ্গলবার সন্ধ্যায় আত্রাই নদীর ডান তীরে সুজনসখী খেয়াঘাট সংলগ্ন এলাকায় বাঁধের ভেতর দিয়ে পানি পার হতে থাকে। এ সময় স্থানীয় প্রশাসন এলাকাবাসীর সহায়তায় বাঁধটি মেরামত করে টিকিয়ে রাখা হয়। এ অবস্থায় স্থানীয়রা রাতে পাহারা বসিয়ে বাঁধের ঝুঁকিপূর্ণ স্থান টিকিয়ে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছিল। মঙ্গলবার রাত ২টার দিকে জোতবাজার-আত্রাই রাস্তার চকবালু নামক স্থানে ইঁদুরের গর্ত দিয়ে পানি আসতে থাকে। পানির প্রবল চাপে এক পর্যায়ে বাঁধটি টিকিয়ে রাখা সম্ভব হয়নি।

ইতিমধ্যে পানির তোড়ে মান্দা উপজেলার বিষুষ্ণপুর ইউনিয়নের ভরট্ট শিবনগর, দাসপাড়া, চকরামপুর, শহরবাড়ী, কর্ণভাগ, পারসিমলা, নহলা কালুপাড়া, আবিদ্যপাড়া, যশোপাড়া, পশ্চিম দুর্গাপুর, শিবপুর, খোর্দ্দ বান্দাইখাড়া ও চককামদেব, নুরুল্লাবাদ ইউনিয়নের পার নুরুল্লাবাদ, চকহরি নারায়ণ ও বাকসাবাড়ি কশব ইউনিয়নের বনকুড়া ও দক্ষিণ চকবালু এবং কালিকাপুর ইউনিয়নের বেড়েরটেক গ্রামের বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়েছে।

বিষ্ণুপুর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান জাহাঙ্গীর আলম জানান, ইতিমধ্যে দুর্গত মানুষের তালিকা তৈরির কাজ শুরু হয়েছে। তবে এ মুহূর্তে ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ জানা সম্ভব নয়। বাঁধ ভেঙে গেলেও গত ২৪ ঘণ্টায় পাউবোর কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ঘটনাস্থলে দেখা যায়নি বলেও স্থানীয়দের অভিযোগ।

নওগাঁ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী সুধাংশু কুমার সরকার বলেন, পানির চাপ বেশি থাকায় ভাঙা অংশ এখনই মেরামত করা সম্ভব হচ্ছে না। চাপ কমলে মেরামত করা হবে। আমাদের টিম সার্বক্ষণিক কাজ করছে।

জামালপুরের মাদারগঞ্জে মঙ্গলবার রাতে পানির প্রবল তোড়ে বালিজুড়ি ইউনিয়নের চর নাদাগাড়ি বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের ৬০ মিটার ভেঙে সুখনগরী, পূর্ব সুখনগরী, নাদাগাড়ি, খিলকাটি, তারতাপাড়া, জোড়খালীসহ ১৫টি প্রাম বন্যাকবলিত হয়ে পড়েছে। স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ হতে বালির বস্তা ফেলে বাঁধের প্রবল স্রোত ঠেকানোর চেষ্টা করেও লাভ হচ্ছে না।

ইউএনও আমিনুল ইসলাম বলেন, বাঁধ ধসের কারণে আশপাশের নিম্নাঞ্চলের গ্রামগুলো প্লাবিত হয়েছে। অন্তত ১৫টি গ্রামের বসতবাড়ি, ফসলের ক্ষেত ও এলাকার রাস্তাঘাট ডুবে গেছে। প্রয়োজন অনুযায়ী সব ধরনের ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

এদিকে উপজেলা পরিষদ নির্মিত মাটির বিকল্প রিং বাঁধটি ভেঙে যমুনার পানিতে মুহূর্তে সয়লাব হয়ে গেছে সিরাজগঞ্জের কাজীপুরের নতুন মেঘাই গ্রাম। মঙ্গলবার রাত ১০টার পর হঠাৎ করেই বাঁধটি ভেঙে গ্রামের বসতভিটা ও ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে পড়ে। অসহায় হয়ে পড়েন কয়েকশ' গ্রামবাসী।

স্থানীরা জানান, যমুনার পানি বিপদসীমার ওপরে থাকায় নদী-তীরবর্তী মেঘাই গ্রামের রিং বাঁধের ৫০ মিটার অংশ পানির তোড়ে ভেসে যায়। পানি হুহু করে ঢুকে আশপাশের ৫টি গ্রাম প্লাবিত হয়। পানিবন্দি হয়ে পড়ে হাজারো মানুষ। দমকল বাহিনীর লোকজন পানিবন্দি মানুষজনকে উদ্ধারে নেমে পড়েন। এরই মধ্যে কাজীপুর থানার উল্টোদিকে মেঘাই-ধুনুট সড়কটি ডুবে গেছে। বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে যোগাযোগ ব্যবস্থা। দুপুরে পাউবোর লোকজনও বাঁধটি পরিদর্শনে আসেন। এই বাঁধ ভাঙার কারণে পেছনে পাউবোর অপর একটি বাঁধ হুমকির মুখে রয়েছে। বাঁধটি ভেঙে গেলে কাজীপুর খাদ্যগুদাম ও থানায় পানি প্রবেশ করবে।