বাড্ডায় গণপিটুনির ঘটনায় প্রত্যক্ষদর্শীর বর্ণনা

৭-৮ মিনিটেই রেনুর প্রাণ কেড়ে নেয় ওরা

প্রকাশ: ২৪ জুলাই ২০১৯      

সমকাল প্রতিবেদক

নিহত তাসলিমা বেগম রেনু। ফাইল ছবি

রাজধানীর উত্তর-পূর্ব বাড্ডা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গত শনিবার সকাল ৮টায় যখন ক্লাস শুরু হয়, তখন ১৫-২০ জন নারী অভিভাবক অবস্থান করছিলেন স্কুল প্রাঙ্গণে। এ সময় তাসলিমা বেগম রেনু প্রবেশ করেন প্রধান গেট দিয়ে। ঢোকামাত্র অভিভাবকদের প্রশ্নের মুখে পড়েন তিনি। তাদের প্রশ্নের জবাবে বাসার ঠিকানা দুই স্থানে উল্লেখ করা এবং জুলাই মাসে সন্তানকে স্কুলে ভর্তির খোঁজ-খবর নেওয়ার কথা জানানোয় অভিভাবকদের মধ্যে 'ছেলেধরা' বলে সন্দেহ হয়।

এর পরই তিন অভিভাবক তাকে ধরে নিয়ে যান স্কুলের দোতলায় প্রধান শিক্ষিকার কাছে। সেখানে নেওয়ার ৮-১০ মিনিটের মধ্যে লোকজন রেনুকে টেনেহিঁচড়ে নিচে নামায়। সাত থেকে আট মিনিটের মধ্যে তাকে গণপিটুনি ও দেয়ালে মাথা থেঁতলিয়ে হত্যা করা হয়। নির্মম ঘটনাটি গতকাল মঙ্গলবার সমকালের কাছে বর্ণনা করেছেন প্রত্যক্ষদর্শী এক নারী অভিভাবক আকলিমা বেগম ও স্কুলের শিক্ষক-শিক্ষিকারা। এদিকে রেনু হত্যায় প্রধান অভিযুক্ত হৃদয়কে গতকাল রাতে গ্রেফতার করেছে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

যে তিন নারী অভিভাবক রেনুকে প্রধান শিক্ষিকার কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন, তাদের একজন আকলিমা বেগম। আকলিমার মেয়ে আফিফা ওই স্কুলের দ্বিতীয় শ্রেণির ছাত্রী। ঘটনার দিন সকালে মেয়েকে স্কুলে নিয়ে গিয়েছিলেন তিনি। মঙ্গলবার দুপুরে উত্তর বাড্ডার আলীর মোড়ের খানকা শরিফের গলির বাসায় আকলিমার সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের।

তিনি বলেন, "সেদিন আমিসহ তিনজন স্কুল প্রাঙ্গণের এক কোনায় দাঁড়িয়ে গল্প করছিলাম। এরই মধ্যে এক নারীর (রেনুর) সঙ্গে অন্য কয়েকজন অভিভাবকের তর্ক দেখে এগিয়ে যাই তাদের কাছে। রেনুকে বাড়ির কথা জিজ্ঞাসা করলে প্রথমে বলেন, আলীর মোড়ে। পরে জানান, মহাখালী। এ ছাড়া জুলাই মাসে স্কুলে সন্তান ভর্তির জন্য আসাতেও সন্দেহ হয়। ভর্তির বিষয়ে প্রধান শিক্ষিকার সঙ্গে আগে কথা হয়েছে বলেও জানিয়েছিলেন রেনু। এসব কারণেই 'ছেলেধরা' বলে সন্দেহ বাড়ে সবার মধ্যে।"

আকলিমা জানান, আনুমানিক পাঁচ মিনিট জিজ্ঞাসার পর রেনুকে প্রধান শিক্ষিকা শাহানাজ বেগমের কাছে নিয়ে যান তিনিসহ তিনজন অভিভাবক। সে সময় শিক্ষক জিয়াউর রহমান ও আরেকজন শিক্ষকও উপস্থিত হন প্রধান শিক্ষিকার কক্ষে। রেনুকে তার স্থায়ী এবং অস্থায়ী ঠিকানা লিখতে বলেন শাহানাজ। স্থায়ী ঠিকানা লেখা শেষ হয়েছে- ওই মুহূর্তে একাধিক লোক 'ছেলেধরা' বলে চিৎকার করে টেনেহিঁচড়ে রেনুকে বের করে নিয়ে যায়।

আকলিমার দাবি, এ সময় তিনিসহ অপর দুই অভিভাবক, প্রধান শিক্ষিকা এবং দুই শিক্ষক লোকজনকে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাদের ধাক্কা দিয়ে রেনুকে দোতলা থেকে নামিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে দোতলার বারান্দায় দাঁড়িয়ে তিনি মারধর করতে দেখেন।

তিনি জানান, স্কুল ভবনের দেয়ালে রেনুর মাথা ঠুকিয়ে আঘাত করা হয়। এর পর রড, লাঠি দিয়ে বেধড়ক মারধর করে লোকজন। পরে পুলিশ রেনুকে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে নিয়ে যায়। ঘটনাস্থলেই রেনু মারা যান বলে ধারণা আকলিমার।

স্কুলটির শিক্ষক জিয়াউর রহমান বলেন, রেনুকে প্রধান শিক্ষিকার কক্ষে নেওয়ার পরপরই স্কুল চত্বরে কয়েকশ' লোক জড়ো হয়ে যায়। নিচের কলাপসিবল গেটের তালা ভেঙে লোকজন দোতলা থেকে রেনুকে জোরপূর্বক নামিয়ে নিচে নিয়ে আসে।

হৃদয় গ্রেফতার, আরও দু'জন রিমান্ডে: গণপিটুনিতে রেনু হত্যায় প্রধান অভিযুক্ত হৃদয়কে মঙ্গলবার রাত ৮টার দিকে নারায়ণগঞ্জের ভুলতা থেকে গ্রেফতার করা হয়। ডিবি পূর্ব বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার আসাদুজ্জামান এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন। এর আগে হৃদয় সন্দেহে এক যুবককে আটক করে শাহবাগ থানা পুলিশ। তবে বাড্ডা থানার তদন্ত-সংশ্নিষ্টরা জানান, ওই যুবকের নাম আলামিন। সম্পৃক্ততা না পাওয়ায় তাকে ছেড়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। এ ছাড়া মঙ্গলবার আরও দু'জনকে চার দিনের রিমান্ডে নিয়েছে বাড্ডা থানা পুলিশ। তারা হলো উত্তর বাড্ডার স্বাধীনতা সরণির আবুল কালাম আজাদ ও কামাল হোসেন। গত সোমবার গ্রেফতার করা হয় তাদের।

রেনু হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা ও বাড্ডা থানার পরিদর্শক (তদন্ত) আব্দুর রাজ্জাক সমকালকে বলেন, আজাদ ও কামালকে ১০ দিনের রিমান্ড চেয়ে ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে আবেদন করা হয়। শুনানি শেষে আদালত চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেছেন।

তিনি জানান, গতকাল সকালে ওয়াসিম নামে এক কিশোরকেও গ্রেফতার করা হয়। তাকে আদালতে হাজির করা হয়েছে। আদালত তাকে গাজীপুরের কিশোর সংশোধনাগারে পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। ওয়াসিম স্কুলের পাশের কাঁচাবাজারে মুরগির দোকানের কর্মচারী। তার গ্রামের বাড়ি সিলেটের জালালাবাদের ইনাতাবাদে। তবে সে থাকে উত্তর বাড্ডায়। রেনু হত্যায় গতকাল পর্যন্ত মোট সাতজনকে গ্রেফতার করা হয়েছে।

এদিকে গুজব প্রতিরোধে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে মুঠোফোন গ্রাহক অ্যাসোসিয়েশন গতকাল রাজধানীর পল্টন, সেগুনবাগিচা, গুলিস্তানসহ বিভিন্ন এলাকায় লিফলেট বিতরণ করেছে। লিফলেট বিতরণে অংশ নেন সংগঠনটির সভাপতি মহিউদ্দীন আহমেদসহ নেতৃবৃন্দ।

মানববন্ধনে ছোট্ট তুবাও: লক্ষ্মীপুর প্রতিনিধি জানান, রাজধানীর উত্তর বাড্ডায় ছেলেধরা সন্দেহে গণপিটুনিতে প্রাণ হারানো তাসলিমা বেগম রেনুর (৪০) হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গতকাল মঙ্গলবার সকাল ১১টায় লক্ষ্মীপুর-রায়পুর সড়কে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ সমাবেশ করেছেন স্থানীয়রা। মানববন্ধনে শত শত মানুষের সঙ্গে রেনুর শিশুকন্যা তুবাও ছিল। তিন বছর বয়সী তুবা জানে না মা কোথায়। এটাও জানে না কেন সে রাস্তায় দাঁড়িয়েছে। তবে তার কৌতূহলী চোখ মাকে খুঁজেছে কেবল।

মানববন্ধনে বক্তব্য দেন রায়পুর উপজেলা ভাইস চেয়ারম্যান মারুফ বিন জাকারিয়া, পৌর যুবলীগ নেতা হোসেন সরদার, তানভীর কামাল, স্বেচ্ছাসেবক লীগ নেতা জাকির হোসেন প্রমুখ। এ কর্মসূচিতে অংশ নেন বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষক-শিক্ষার্থীসহ সর্বস্তরের মানুষ।

বক্তারা বলেন, ছেলেধরা গুজবেই রেনুকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এটা কোনো সভ্য সমাজের কাজ হতে পারে না। রেনু বেগমের হত্যাকারীদের দ্রুত চিহ্নিত করে তাদের গ্রেফতার ও বিচারের দাবি জানান তারা।

নিহত রেনুর বোন সেলিনা আক্তার বলেন, তুবা তার মায়ের কথা মনে করেই বারবার কান্না করে। ক্ষণে ক্ষণে সবাইকে জিজ্ঞেস করে, মা কখন আসবে। ছোট্ট মেয়েটিকে সান্ত্বনা দেওয়ার ভাষা নেই আমাদের। এ হত্যার বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি হোক। দায়ীদের বিচারে আমরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ কামনা করছি।