সরেজমিন : বন্যাদুর্গত এলাকা

'বান আইসে, বান যায়, মুই মরোঁ না ক্যানে বাবা'

চিলমারী

প্রকাশ: ২৫ জুলাই ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ

নাজমুল হুদা পারভেজ চিলমারী (কুড়িগ্রাম)

'এই দুই হাত দিয়া মুই মোর মা-বাবা, ভাই, তিন বেডা (পুত্র) আর মোর বৌঅক কবর দিছোঁ। এই দুনিয়াত আল্লা ছাড়া মোর আর কাঁইও নাই বাজান। এই দুনিয়াডা আর মোক দেইকপ্যার মোনায় না। প্রেত্যেক বছর বান আইসে, বান যায়, মুই মরোঁ না ক্যানে বাবা? সারাদিন না খায়্যা থাকোঁ। কাঁইও (কেউ) মোক ত্রাণ পর্যন্ত দেয় না।' কথাগুলো বলতে গিয়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারছিলেন না সত্তরোর্ধ্ব কেরামত আলী। তার সব অশ্রু যেন ব্রহ্মপুত্রে মেশে।

গতকাল বুধবার সকালে কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার নন্দীর মোড় এলাকায় বাঁধের রাস্তায় একটি আধাভাঙা হোটেলের টংয়ের ওপর বসে কথা হয় কেরামত আলীর সঙ্গে। বন্যার পানিতে ঘরবাড়ি ভেসে যাওয়া কেরামত আলীর আশ্রয় এখন এই বাঁধের ওপর। কেরামত আলী শুধু একজন ব্যক্তিই নন; তিনি চিলমারী তথা পুরো কুড়িগ্রামের নদীভাঙা ও বানভাসি মানুষের প্রতিচ্ছবি। আরেক সংগ্রামী নূরলদীনও ছিলেন এই উত্তরের জনপদের বাসিন্দা। সৈয়দ শামসুল হকের কাব্যনাটকের নূরলদীনের সংগ্রাম ছিল খুনি, লুটেরা, স্বাধীনতা হরণকারীদের বিরুদ্ধে। কেরামত আলীর সংগ্রাম নিজের সঙ্গে। নূরলদীন দিয়েছেন প্রতিরোধের ডাক। কেরামত আলী পড়ন্ত বয়সে মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেই কষ্ট থেকে পরিত্রাণ চান।

গত ১০-১২ দিন থেকে উপজেলার প্রায় দেড় লাখ মানুষ পানিবন্দি হয়ে রয়েছে। অধিকাংশ মানুষের আশ্রয় এখন সড়ক, উঁচু বাঁধ, রেললাইন, হেলিপ্যাড এলাকায়। খোলা আকাশের নিচে অর্ধাহারে-অনাহারে দিনাতিপাত করছে বানভাসি মানুষ। কোনো ট্র্যাক বা মাইক্রোবাস দেখলেই একটু ত্রাণের আশায় ছুটছে তারা। সাংবাদিক দেখলেও দৌড়ে এসে নিজের নামটি লিখে নিতে অনুরোধ করছে। তাদের ধারণা, নাম লেখাতে না পারলে ত্রাণের তালিকা থেকে তাদের নাম বাদ পড়বে। চারদিকে শুধু ত্রাণের জন্য হাহাকার।

এসবের কোনো কিছুতেই আগ্রহ নেই কেরামত আলীর। তার নিবিষ্ট দৃষ্টি ব্রহ্মপুত্র নদের দিকে। এখানেই যেন কী খুঁজে ফিরছেন তিনি। সম্বিৎ ফিরতেই কথা বলছেন এ প্রতিবেদকের সঙ্গে। বললেন, ব্রহ্মপুত্র নদের সঙ্গে তার নাড়ির সম্পর্ক। সেই ছোটবেলা জেলে বাবার হাত ধরে এই নদে মাছ ধরতে যান। পুরো জীবন কাটিয়ে দিয়েছেন এই নদে। সর্বনাশা এই ব্রহ্মপুত্র আবার তার ভিটেমাটি কেড়ে নিয়েছে। পুরাতন চিলমারী বন্দর নদে ভেঙে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদের আদি নিবাস বৈলমন্দিয়ারখাতা বেপারীপাড়াও এ নদে বিলীন হয়ে যায়। মা-বাবার সঙ্গে চলে আসেন শাখাহাতি নামক স্থানে। সেখানে নতুন করে বসবাস শুরু করলেও বেশিদিন থাকা হয়ে ওঠেনি। শাখাহাতিতেই পরপর দু'বার তার বাড়িঘর ভাঙে। এর পর পরিবারসহ আসেন রমনা রেললাইনের মাথায়। সেখানে নতুন বাড়ি করেন।

১৯৭৬ সালে কেরামত আলী ফুফাতো বোন রোজেনা বেগমকে বিয়ে করেন। শুরু হয় তার সংসার জীবন। তিনি তিন ছেলে ও এক মেয়ের বাবা হন। নদে মাছ ধরে বাজারে বিক্রি করে ভালোই চলছিল। হঠাৎ একদিন বাবা মারা যান। বাবার মৃত্যুর পর আবারও ভাঙনের শিকার হন। এবার বৃদ্ধ মা ও স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে আশ্রয় নেন রমনা বেপারীপাড়া গ্রামে। বড় ছেলে রহিম মিঞা ঢাকায় পোশাক কারখানায় চাকরি নেন। সবেমাত্র সচ্ছলতার মুখ দেখতে শুরু করেন কেরামত আলী। এর মধ্যে ছেলেটা হার্ট অ্যাটাকে মরে যান। এর ৪-৫ বছর পর একদিনের জ্বরে মেজো ছেলে তুহিনের (১২) মৃত্যু হয়। এর কয়েক বছর না পেরুতেই কোলের ছোট ছেলে সুহিন (২) অজ্ঞাত রোগে মারা যায়। কিছুদিন পরই বৃদ্ধ মাকে কবরস্থ করেন কেরামত আলী। মা-বাবা, ভাই, তিন ছেলেকে হারানোর পরও কেরামত আলী স্ত্রী রোজেনাকে নিয়ে ঘুরে দাঁড়ানোর শেষ চেষ্টা করেন। স্বামী-স্ত্রী মিলে বেপারীপাড়ায় নিজ বাড়িতে একটি মুদির দোকান দিয়েছিলেন। ছোট ব্যবসা করে তাদের ভালোই চলছিল। হঠাৎ স্ত্রী ক্যান্সারে আক্রান্ত হন। কেরামত আলী তার সর্বস্ব দিয়ে চেষ্টা করেও প্রিয়তমা স্ত্রীকে বাঁচাতে পরেননি। এখন অবশিষ্ট আছে তার একমাত্র মেয়ে কোহিনুর বেগম (৩৫)। বর্তমানে অন্তঃসত্ত্বা কোহিনুরও নানা রোগে আক্রান্ত হয়ে বেঁচে থাকার যুদ্ধ করে যাচ্ছেন। কেরামত আলী জানেন না, তার এই শেষ সন্তানকেও নিজ হাতে কবর দিতে হবে কি-না!

রমনা ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার হবিবর বেপারী জানান, তিনি মেম্বার থাকাকালে কেরামত আলীর নামে একটি বয়স্ক ভাতার কার্ড করে দিয়েছিলেন। বর্তমানে মাসে ৫শ' টাকা যে ভাতা পান, তা দিয়ে অসহায় এ মানুষটি চলতে পারেন না। কিছুদিন আগে বেপারীপাড়ায় নদে ভাঙন দেখা দিলে কেরামত আলীর ঘরটিও বিলীন হয়ে যায়। বর্তমানে রমনা ইউনিয়নের হরিণের বনে গিয়ে ছোট ভাই নুরুজ্জামানের বাড়িতে একটি খড়ের ঘর তুলে থাকছেন।

গ্রামবাসী জানান, বর্তমানে কেরামত আলী কখনও মসজিদের বারান্দায় অথবা কোনো স্কুলের বারান্দায় অর্ধাহারে-অনাহারে রাত কাটান। গতকাল দুপুরে কেরামত আলীর সঙ্গে কথা বলার সময় তিনি জানান, সকাল থেকে তিনি না খেয়ে আছেন। এ পর্যন্ত কোনো ত্রাণও পাননি। এ পৃথিবীতে তাকে দেখার কেউ নেই। ছন্নছাড়া মানুষ এখন কেরামত আলী। সারাদিন বন্যার পানির পাশে একটি উঁচু জায়গাতে বসে আনমনে বন্যার ঘোলা পানির দিকে তাকিয়ে থাকেন অবিরল।