মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছে নাহিদ

প্রকাশ: ১৮ আগস্ট ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সমকাল প্রতিবেদক ও ঈশ্বরগঞ্জ (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি

ছোট্ট নাহিদের এখন কেউ নেই। মা-বাবা, ভাই-বোন সবাইকে হারিয়ে জীবন-মৃত্যুর দোলাচলে দুলছে ৩ বছরের এই শিশু। রাজধানীর অ্যাপোলো হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন নাহিদের জ্ঞানও ফেরেনি। খুব শিগগিরই তার সেরে ওঠার সম্ভাবনা দেখছেন না চিকিৎসকরা। কিন্তু আশা ছাড়েননি স্বজনরা। শুক্রবার ময়মনসিংহের গৌরীপুরে মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় স্বজনহারা এই শিশুটির সুস্থ হয়ে ওঠার আশায় ক্ষণ গুনছেন তারা।

নেত্রকোনার দূর্গাপুর উপজেলার চণ্ডীগর গ্রামের রফিকুজ্জামান নরসিংদীর মাধবদী এলাকায় 'বাংলাটেক্স' নামে একটি টেক্সটাইল মিলের মালিক। গত বৃহস্পতিবার ঈশ্বরগঞ্জের মধুপুর এলাকায় শ্বশুরবাড়িতে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে বেড়াতে যান। সেখান থেকে শুক্রবার সকালে এক আত্মীয়ের বিয়েতে যাচ্ছিলেন। পথে ময়মনসিংহ-কিশোরগঞ্জ সড়কে গৌরীপুরের গাওরামগোপালপুর এলাকায় এমকে সুপার নামে একটি বাসের সঙ্গে তাদের ব্যক্তিগত গাড়িটির সংঘর্ষ হয়। দুমড়েমুচড়ে যায় গাড়িটি। এতে প্রাণ হারান রফিকুজ্জামান, তার স্ত্রী শাহীন আক্তার, ছেলে নাদিমুজ্জামান, মেয়ে রওনক জাহান ও শ্যালক জিসান কবীর আশরাফ। অলৌকিকভাবে বেঁচে যায় ৩ বছরের শিশু নাহিদুজ্জামান ও গাড়িটির চালক স্বপন মিয়া। তাদের দু'জনের কারও অবস্থ্থাই ভালো নয়। নাহিদ রাজধানীর অ্যাপোলো  হাসপাতালের আইসিইউতে চিকিৎসাধীন। চালক স্বপন  মিয়াকে ধানমণ্ডি এলাকার পপুলার হাসপাতালে আইসিইউতে চিকিৎসা চলার পর গতকাল শনিবার বিকেলে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিতে সুপারিশ (রেফার) করা হয়।

গতকাল সরেজমিন অ্যাপোলো হাসপাতালে দেখা যায়, নাহিদ নিউরো আইসিইউ বিভাগে ডা. অমিত চন্দ্রের তত্ত্বাবধানে রয়েছে। ভেতরে কাউকে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। হাসপাতালে উপস্থিত নাহিদের দূরসম্পর্কের এক আত্মীয় বাবলি সমকালকে বলেন, বিকেল ৫টায় চিকিৎসক নাহিদকে দেখে জানিয়েছেন, সে এখন কোমায় আছে। জ্ঞান ফেরেনি। অবস্থা অনেকটাই অপরিবর্তিত। তার সুস্থ হতে সময় লাগবে। এখনই কিছু বলা যাচ্ছে না।

নাহিদের একমাত্র চাচা নুরুজ্জামান জুয়েল বলেন, আশা করছি, নাহিদ দ্রুত সুস্থ হবে। আমার মা-বাবা এখনও বেঁচে আছেন। তারা সিদ্ধান্ত নেবেন, নাহিদ কার সঙ্গে থাকবে। তাদের নির্দেশে আমি দায়িত্ব পালন করছি। গতকাল নেত্রকোনার দুর্গাপুরে তার ভাইসহ পরিবারের চারজনকে দাফন করা হয় বলে তিনি জানান।

পরিবারটির সঙ্গে পাঁচ বছর ছিলেন স্বপন :দুর্ঘটনায় আহত রফিকুজ্জামানের ব্যক্তিগত গাড়িচালক স্বপন মিয়া নরসিংদীর মাধবদী পৌরসভার টাটাপাড়া এলাকার বাসিন্দা। পৌর মেয়রের বাসার কাছাকাছি তাদের বাড়ি। চার বছর আগে বাবা মারা যাওয়ার পর থেকে স্বপনের আয়ে মা তারা বানু বেগমের জীবন চলত। পাঁচ বছর ধরে স্বপন ব্যবসায়ী রফিকুজ্জামানের গাড়িচালক হিসেবে কাজ করছিলেন। পরিবারটির সঙ্গে ভালো হৃদয়তা ছিল স্বপনের। তার হাতে গাড়ি দিয়ে নিরাপদেই ছিলেন রফিকুজ্জামান। কিন্তু মর্মান্তিক দুর্ঘটনায় মালিক পরিবারটির শিশুপুত্র ছাড়া কেউ বেঁচে নেই। জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে রয়েছেন স্বপন। তার বড় ভাই নয়ন মিয়া গতকাল বিকেলে মোবাইল ফোনে জানান, তার ভাইয়ের অবস্থা ভালো নয়। শুক্রবার রাতে ময়মনসিংহ থেকে রাজধানীর পপুলার হাসপাতালের আইসিইউতে ভর্তি করা হয়। গতকাল বিকেলে অবস্থা খারাপ হওয়ায় সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে রেফার করা হয় স্বপনকে।

থানায় মামলা : মর্মান্তিক এ সড়ক দুর্ঘটনা বিষয়ে ময়মনসিংহের গৌরীপুর থানায় একটি মামলা হয়েছে। শুক্রবার রাতে মামলাটি নথিভুক্ত হয়। নিহত রফিকুজ্জামানের ভাই জুয়েল বাদী হয়ে মামলাটি করেছেন বলে জানিয়েছেন গৌরীপুর থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) গোলাম মাওলা। তিনি বলেন, গতকাল বিকেল পর্যন্ত এমকে সুপার পরিবহনের চালক বা সহকারী কাউকে গ্রেফতার করা যায়নি।

সংশোধনী : গতকাল সমকালের প্রথম পাতায় প্রকাশিত 'নিমেষেই শেষ এক পরিবারের পাঁচজন, রইল শুধু নাদিম' শীর্ষক প্রতিবেদনে বেঁচে থাকা শিশুটির নাম লেখা হয়েছে নাদিম। আসলে দুর্ঘটনায় নিহত তার বড় ভাইয়ের নাম নাদিম। বেঁচে যাওয়া শিশুটির নাম নাহিদ। অনাকাঙ্ক্ষিত এ ভুলের জন্য আমরা দুঃখিত।