জটিলতা বাড়াচ্ছে সুবিধাভোগীরা

রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন

প্রকাশ: ২১ আগস্ট ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

জাহিদুর রহমান ও আবদুর রহমান টেকনাফ (কক্সবাজার) থেকে

টেকনাফের জাদিমোরা শালবাগান রোহিঙ্গা শিবিরের কর্মকর্তার (সিআইসি) কার্যালয়ের পাশে কিছু ঘর সাজিয়ে রাখা হয়েছে। সোমবারই ঘরগুলো নির্মাণ করা হয়েছে। এখানে রয়েছে আটটি বুথ। কড়া নিরাপত্তা। দায়িত্বরত লোক ছাড়া সাংবাদিকদেরও সেখানে প্রবেশের অনুমতি নেই। ক্যাম্প ইনচার্জ, প্রশাসনের লোকজন, পুলিশ ও জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের প্রতিনিধিরা অপেক্ষা করছেন। গতকাল মঙ্গলবার সকাল গড়িয়ে বেলা ১১টা। তখনও মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর তালিকায় স্থান পাওয়া রোহিঙ্গারা সাক্ষাৎকার দিতে আসেননি। গত দু'দিন তালিকা ধরে ধরে সবাইকে অনুরোধ করা হয়েছিল, নিজ দেশে ফেরত যাবে কি-না, সে মতামত এখানে এসে দিতে। কিন্তু কেউ আসেননি। দুপুরের দিকে কিছু রোহিঙ্গা ক্যাম্পের কাছাকাছি এলেও একটি গ্রুপের হুমকি ও বাধার মুখে ফিরে যান। খবর পেয়ে ক্যাম্প ইনচার্জ পুলিশ নিয়ে সেখানে যান এবং নিরাপত্তা জোরদার করেন। দুপুর ২টা পর্যন্ত উত্তেজনা, ক্ষোভ ও উৎকণ্ঠা ছিল শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পে। দুপুর আড়াইটার দিকে ২১ রোহিঙ্গা সাক্ষাৎকার দিতে আসেন। কিন্তু কেউই নিজ ভূমিতে ফেরত যেতে রাজি হননি। তারা বলেছেন, তাদের নাগরিকত্ব, নিরাপত্তা, গণহত্যার বিচার ও নিজ ভিটেমাটি ফেরত পাওয়ার নিশ্চয়তা না পেলে সেখানে যাবেন না। রোহিঙ্গারা বলেন, লাখ লাখ রোহিঙ্গা মৃত্যুর মুখে বাংলাদেশে এসে আশ্রয় নিয়েছেন। তাদের সবার দেশ মিয়ানমার। ফেরত গেলে সবাই একসঙ্গে যাবেন। অল্প কিছু মানুষকে ফেরত নেওয়াকে তারা ষড়যন্ত্র হিসেবেই দেখছেন। আয়েশা বেগম নামের এক রোহিঙ্গা নারী বলেন, 'আমরা আর ফিরতে চাই না। ওরা যতই চুক্তি করুক, ওরা আমাদের নির্যাতন করবেই। মরলে আমরা বাংলাদেশেই মরতে চাই। এখানে তো অন্তত দুইবেলা খাবার খেয়ে শান্তিতে থাকতে পারছি।'

সাক্ষাৎকারের বিষয়টি স্বীকার করে বাংলাদেশ শরণার্থী ত্রাণ, প্রত্যাবাসন কমিশনারের প্রতিনিধি ও টেকনাফের জাদিমোরা শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পের ইনচার্জ মোহাম্মদ খালেদ হোসেন বলেন, '২১ পরিবার এসে তাদের মতামত দিয়েছে। তারা কী বলছেন, আমার জানা নেই। এ প্রক্রিয়াটি চলমান থাকবে। প্রত্যাবাসন নিয়ে আমরা আশাবাদী।'

বাংলাদেশে এখন যে ১১ লাখের বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী আছে, তার বড় অংশই আসে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্টের পর। এরপর জাতিসংঘসহ নানা সংস্থার নানা উদ্যোগের পর বাংলাদেশ ও মিয়ানমার সরকারের আলোচনায় রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে সিদ্ধান্ত হয়। এরপর ২০১৮ সালের ২৩ জানুয়ারি প্রত্যাবাসন শুরুর কথা থাকলেও শেষ পর্যন্ত তা আর হয়নি। সে সময় রোহিঙ্গারা আট দফা দাবি তুলেছিল। এবারও ২২ আগস্ট (গতকাল) প্রত্যাবাসনের একটি সম্ভাব্য তারিখ মিয়ানমারের তরফ থেকে প্রকাশের পর রোহিঙ্গা ক্যাম্পে উত্তেজনা দেখা দেয়। আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মুহিব উল্লাহ বলেন, আমরা চাই রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরু হোক। তবে 'বলন্টিয়ার' প্রত্যাবাসন হলে আমরা সহযোগিতা করতে রাজি আছি। তিনি বলেন, 'মিয়ানমারের পররাষ্ট্র সচিব মিন্ট থোয়ের নেতৃত্বে পরিদর্শনে আসা প্রতিনিধি দলের আমাদের সঙ্গে বৈঠকে বসার কথা রয়েছে। তাদের সঙ্গে কথা হবে। তারপর প্রত্যাবাসনের বিষয় আসবে। তা ছাড়া এ মুহূর্তে মিয়ানমারে ফিরে যাওয়ার কোনো পরিবেশ সৃষ্টি হয়নি। এখন পর্যন্ত সেখানে যেসব রোহিঙ্গা রয়েছেন, তারাও বন্দি জীবনযাপন করছেন।'

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক রোহিঙ্গা নেতা বলেন, মিয়ানমারের মংডু শহরে এখনও আমার আত্মীয়স্বজন রয়েছে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রয়েছে। সেখানে পরিস্থিতি ভালো হয়নি, রোহিঙ্গাদের বন্দি করে রাখা হয়েছে। কোথাও ঠিকমতো চলাফেরা করতে দিচ্ছে না। যেসব রোহিঙ্গা সে দেশে রয়েছে, তারা নিরাপদে নেই। কীভাবে বিশ্বাস করি, এখান থেকে যারা যাবে, তারা ভালো থাকবে। বিশ্নেষকরা বলছেন, এভাবে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া হাস্যকর। মূল উৎসে হাত না দিয়ে অল্প কিছু লোককে মিয়ানমারে পাঠানোর প্রস্তাব অযৌক্তিক।

তুষার কণা খোন্দকার ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশ সরকারের রোহিঙ্গা অ্যাফেয়ার্স সেলে সমন্বয়কের দায়িত্ব পালন করেছেন। তখন তিনি ছিলেন সহকারী সচিব। পরে স্বেচ্ছায় অবসরে গেলেও রোহিঙ্গাদের নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করছেন। তার মতে, প্রথম থেকেই রোহিঙ্গা সমস্যার মূল উৎস নাগরিকত্ব ফিরিয়ে দেওয়া নিয়ে কেউই আন্তরিক ছিল না। মিয়ানমারের ওপর যাদের প্রভাব আছে, তারা কখনোই স্থায়ী কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

তিনি বলেন, ১৯৭৮ সালে যে তিন লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছিল, তাদের আড়াই লাখকে ফিরিয়ে নিয়েছিল মিয়ানমার। পরে আবার ১৯৯২ সালে আসা দুই লাখ ৫৫ হাজার ৫৫৭ জনের মধ্যে দুই লাখ ৩০ হাজার ফিরিয়ে নেয়। রয়ে গেল ১৯ হাজারের মতো। তাদের জন্য নয়াপড়া ও কুতপালংয়ে দুটি ক্যাম্প রেখে দেওয়া হলো। এটাই ছিল একটা গুরুতর ভুল। এই কাজটি বাংলাদেশ করেছে ইউএনএইচসিআরের প্ররোচনায়। ইউএনএইচসিআর রোহিঙ্গাদের দেখিয়ে টাকা নেয়। কত টাকা তারা নিয়েছে, কত টাকা তারা রোহিঙ্গাদের জন্য খরচ করেছে- তার কোনো হিসাব নেই। বাংলাদেশে রোহিঙ্গাদের জন্য টাকা নেওয়া তারা নিরাপদ মনে করে। আফ্রিকায় রোহিঙ্গাদের জন্য টাকা নিয়ে সেখানে কাজ করতে গেলে তারা প্রচণ্ড ঝুঁকিতে থাকে। বাংলাদেশে কোনো ঝুঁকি নেই। এখানে খাবার, পানি ও বাসস্থানের কষ্ট থাকলেও তারা খুব আরামেই আছেন। এসব শুনতে খারাপ শোনালেও এটিই এখন বাস্তবতা।

তুষার কণা খোন্দকার বলেন, সবচেয়ে বড় সমস্যা রোহিঙ্গাদের মধ্যে প্রচার করা হচ্ছে, তারা স্টেটলেস হয়ে গেছে। এটা প্রচার করে তাদের তৃতীয় কোনো দেশে যাওয়ার অপশন দেওয়া হচ্ছে। এই অপশনে ৭৫০টি পরিবার যেতে পেরেছে। কিন্তু বারুদের মতো মেসেজটি চলে গেছে, এখানে ক্যাম্পে থাকলে কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড চলে যাওয়া যাবে। আয়ারল্যান্ডে রোহিঙ্গা শিশুরা ক্রিকেট খেলছে এমন ছবি ইউএনএইচসিআরের বিভিন্ন বইতে পাবেন। রোহিঙ্গাদের নিয়ে বিশাল সুবিধাভোগী এই গোষ্ঠীর কারণেই এখন রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে।

তিনি বলেন, সরকার একটি কাজই এখন করতে পারে, রোহিঙ্গাদের একদম আলাদা একটি ক্যাম্পে নিয়ে যাওয়া। ইউএনএইচসিআর সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে। তাদের কার্যক্রম মনিটর হবে। এতে খুব দ্রুতই সমস্যার সমাধান হবে। তিনি বলেন, ইউএনএইচসিআর ও এনজিওগুলো রোহিঙ্গাদের চাল-ডাল দিয়েই তাদের দায়িত্ব শেষ করছে। তাদের মূল যে সমস্যা নাগরিকত্ব, ইচ্ছাকৃতভাবেই তা আড়ালে রেখে দেওয়া হয়েছে।

এদিকে, টেকনাফ ও উখিয়ায় রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপের ভয়েও অনেকে নিজ দেশে ফিরতে রাজি হচ্ছে না। এর আগে যারাই মিয়ানমার ফেরত যেতে চেয়েছেন, তাদের নির্যাতন সইতে হয়েছে।

মিয়ানমারের বিচ্ছিন্নতাবাদী জঙ্গি সংগঠন আল-ইয়াকিনের অন্তত ৩১ প্রশিক্ষিত রোহিঙ্গা কিলার বিভিন্ন আশ্রয় ক্যাম্পে অবস্থান করছে বলে জানা গেছে। আশ্রিত রোহিঙ্গারা জানান, কেউ প্রত্যাবাসনে রাজি হয়েছে শুনে এর আগে অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে তাকে হত্যা করা হয়েছে। সোমবার রাতেও প্রত্যাবাসনের খবর দিতে গিয়ে শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পের এক স্বেচ্ছাসেবক অপহৃত হয়েছেন। এ জন্য ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও প্রাণের ভয়ে অনেকে স্বদেশে ফিরে যাবে বলে মুখ খোলার সাহস পাচ্ছেন না।

জাতিসংঘের শরণার্থীবিষয়ক সংস্থা ইউএনএইচসিআরের মুখপাত্র জোসেফ ত্রিপুরা সমকালকে বলেন, "আমাদের কাজ শুরু হয়ে গেছে। যেটিকে আমরা 'ইনটেনশন সার্ভে' বলছি। প্রত্যাবাসনের জন্য আরও অপেক্ষা করতে হতে পারে।"