সরেজমিন টেকনাফ

মৃত্যুর চেয়ে ক্যাম্পের জীবনই সুখের

প্রকাশ: ২৫ আগস্ট ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

জাহিদুর রহমান, কক্সবাজার থেকে

বাঁশের বেড়ায় ঘেরা ঘরের সামনে বসে আছেন আয়েশা বেগম। লাল টুকটুকে মেহেদির রঙ হাতে। নাকে নোলক, কানে দুল। বসে বসে গান শুনছেন স্মার্টফোনে। দুই বছর আগেও এমন জীবন ছিল না তার। প্রাণ বাঁচাতে নিজ দেশ মিয়ানমার থেকে সাগর-পাহাড়-জঙ্গল ডিঙিয়ে পাঁচ দিনে বাংলাদেশে এসেছিলেন, টেকনাফের শালবাগান রোহিঙ্গা ক্যাম্পে আশ্রয় নিয়েছেন। মৃত্যুর পথ থেকে ফিরে আসা এই নারী এখন তিন ছেলেমেয়ে ও স্বামীকে নিয়ে স্বস্তিতে আছেন কিছুটা। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে স্বামীর চা দোকান থেকে যা আয় হয়, তা দিয়েই চলছে সংসার। আর বিভিন্ন সংস্থা থেকে ত্রাণ-সহায়তা তো আছেই। তাই তো এমন জীবন ছেড়ে আর অনিশ্চিত জীবনে ফিরতে চান না তিনি। মৃত্যুর চেয়ে ক্যাম্পের জীবনকেই মনে করেন সুখের। ছোট ঘরে গাদাগাদি করে থাকলেও অতীতের দুঃসহ স্মৃতিতে ফিরে যেতে চান না আর। ক্যাম্পের জীবন বিবর্ণ এবং একঘেয়ে হলেও এখানে অন্তত স্বাধীনতা তো আছে। আর এতেই খুশি রোহিঙ্গারা।

শুধু আয়েশা নন, টেকনাফ ও উখিয়ার ৩২টি রোহিঙ্গা শিবিরে নতুন করে জীবন ফিরে পেয়েছেন রোহিঙ্গারা, প্রাণের সঞ্চার হয়েছে সেখানে। বিয়ের অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হচ্ছে, নতুন শিশু জন্ম  নিচ্ছে, রোহিঙ্গাসমাজ গড়ে উঠছে।

কিন্তু রোহিঙ্গারা অনেক দিন ধরে যে জীবনযাপন করছেন, তাকে নির্বাসন বললেও অত্যুক্তি হবে না। গত বছর এবং গত ২২ আগস্ট রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা ব্যর্থ হয়। রোহিঙ্গারা জানান, সে দেশ এখনও তাদের জন্য নিরাপদ নয়। ফলে ক্যাম্পগুলো তারা নিজের মতো সাজিয়ে নিয়েছেন। রোহিঙ্গা  ক্যাম্পগুলোর দুই বছর আগের চেহারার সঙ্গে এখনকার চেহারার বিস্তর ফারাক। খাঁ খাঁ পাহাড়ে জানান দিচ্ছে প্রাণের স্পন্দন, নতুন এক উজ্জীবনী শক্তি, নতুন এক জীবন। একসময়ের সবুজ পাহাড়গুলোতে এখন যেন নতুন এক 'নগরী' গড়ে উঠেছে।

পাহাড়ের ঢালে গায়ে গা লেগে সারি সারি ঘর। বাঁশের বেড়া, ওপরে প্লাস্টিক। এত অল্প জায়গায় এত মানুষের থাকার বাসা। দূর থেকে মৌচাকের মতো দেখায়। তবে সবকিছুই পরিকল্পনামাফিক হয়েছে। প্রতি ২০ জন মানুষের জন্য একটা টয়লেট। সরকারি অফিস আছে। চিকিৎসার ব্যবস্থা আছে। বাচ্চাদের জন্য স্কুল আছে। মসজিদ আছে। দোকানপাট, বিদ্যুৎ, ইন্টারনেট, মোবাইল, ডস, পাকা রাস্তা, উন্নত স্যানিটেশন ব্যবস্থাসহ সবই আছে এখানে। গড়ে উঠেছে নিজস্ব সমাজব্যবস্থা।

প্রাণহীন পাহাড়ের বুক চিরে এঁকেবেঁকে চলে গেছে পাকা রাস্তাঘাট। চলছে মালবাহী বিশাল ট্রাক, যাত্রীবাহী বাস, জিপ, অটোরিকশা, ভ্যানসহ অন্যান্য যানবাহন। পাহাড়ি নালায় গড়ে উঠেছে কংক্রিটের ব্রিজও। আছে তথ্যকেন্দ্র ও নিরাপত্তার ব্যবস্থাও।

রোহিঙ্গা ক্যাম্পের রাতের চিত্র একরকম, দিনের চিত্র অন্যরকম। রাতে একসময়ের অন্ধকার পাহাড় আলোকিত হয়ে জেগে ওঠে। নতুন এই জনপদে রাতে বিচিত্র অনেক মানুষের দেখা মেলে। এখানে নতুন জীবন একেকজন একেক রকম উপভোগ করেন। ভিন্ন ভিন্ন অনেক গল্প লুকিয়ে আছে পাহাড়ের বুকে। যেখানে গল্পের শেষ নেই। আবদুল করিম জীবনসায়াহ্নে এসে ঠাঁই নিয়েছেন উখিয়ার কুতুপালং ক্যাম্পে। ভালো গানের কণ্ঠ তার। মিয়ানমারে থাকতে তার কণ্ঠ স্তব্ধ ছিল। গান গাওয়ায়ও ছিল নিষেধাজ্ঞা। এখন মুক্ত কণ্ঠে গান গাওয়ার সুযোগ পেয়েই আনন্দিত তিনি, এতেই খুশি। কুতুপালং রোহিঙ্গা ক্যাম্পে রাতে গানের আসর বসে কয়েকটি স্থানে। রাখাইন ভাষায় গান শুনে কিছুটা দুঃখ ভোলার চেষ্টা করেন রোহিঙ্গারা।

রাত পৌনে ১২টায় টেকনাফের লেদা ক্যাম্পে গিয়ে দেখা যায়, এত রাতেও জেগে আছেন রোহিঙ্গারা। ক্যাম্পের ভেতরে একটি চা দোকান তখনও খোলা। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আড্ডায় মেতেছেন তারা। ক্যাম্পে প্রবেশমুখে লাঠি হাতে দাঁড়িয়ে আছেন একদল রোহিঙ্গা তরুণ। তারা ক্যাম্পের নিরাপত্তায় পালা করে ডিউটি করেন রাতে।

ভোরের আলো ফুটতে না ফুটতেই ক্যাম্পের চিত্র পাল্টে যায় আবার। রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে জেগে ওঠে পাহাড়। বাচ্চারা দলবেঁধে স্কুল কিংবা মাদ্রাসায় যায়। পুরুষরা মোড়ে মোড়ে কিংবা চা দোকানে বসে আড্ডা দেন, টিভি দেখেন। আর গৃহিণীরা ব্যস্ত হয়ে পড়েন তাদের গৃহস্থালিতে। কাজ শেষে প্রতিবেশীদের সঙ্গে গল্প করেন সুখ-দুঃখের।

ক্যাম্পের মোড়ে মোড়ে বাজার বসেছে। টাটকা শাকসবজি, মাছ কিনে ঘরে ফিরছেন রোহিঙ্গারা। ইউএনএইচসিআর বা আইওএমের তৈরি করে দেওয়া ঘরের একপাশ ব্যবহূত হচ্ছে থাকা-খাওয়ার কাজে, অন্যপাশ দোকানদারিতে। এসব ছোটখাটো দোকান ছাড়াও ক্যাম্পের মধ্যে বেশ কিছু বড় বাজার গড়ে উঠেছে। রোহিঙ্গা ক্যাম্পে খাবার হোটেল থেকে শুরু করে জুয়েলারির দোকান- সবই আছে। ইলেকট্রনিকস পণ্য, জামা-কাপড়, জুতা, ওষুধ, জ্বালানি কাঠ, গ্যাসের সিলিন্ডার, দা-বঁটি-কুড়াল, রড-সিমেন্ট, ফার্মেসিসহ দৈনন্দিন জীবনের সবকিছুই পাওয়া যায়। বাজারের ৪০ ভাগ পণ্যই আসছে মিয়ানমার থেকে, চোরাপথে। বাকি পণ্যের অর্ধেকই বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে পাওয়া ত্রাণসামগ্রী। পাড়াগাঁয়ের মতোই ক্যাম্পে গড়ে ওঠা ওই সব হাটবাজারের চা দোকানে সিনেমার আসরও বসে। তবে এখানে হিন্দি সিনেমার প্রতি ঝোঁক একটু বেশি। রোহিঙ্গারা চা দোকানে টিভি দেখে বেশি সময় পার করেন।

এত এত গল্পের মধ্যেও রোহিঙ্গাদের মনে সব সময় উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা। ক্যাম্পে নতুন কোনো আগন্তুক এলেই তারা বেশ কৌতূহলী হয়ে ওঠেন। মাঝেমধ্যে ক্যাম্পে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু ঘটনাও ঘটে। তাই একটু বেশিই সতর্ক তারা। নিজ ভিটেমাটি ফেলে আসা এই মানুষগুলো সব সময়ই অতীতের দুর্বিষহ যন্ত্রণা ভোলার চেষ্টা করেন। ভাগ্যহত এই মানুষগুলোর মনে সব সময় তাড়া করে অবিশ্বাস আর ভয়। পাহাড়ে গড়ে ওঠা সন্ত্রাসী গ্রুপের ভয় যেমন আছে, আবার নিজ দেশে ফেরত পাঠানোর কথা মনে করে আঁতকেও ওঠেন।

লেদা ক্যাম্পে দেখা হয় ক্যাম্পের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আলমের সঙ্গে। তিনি বলেন, এখানে ৩২ হাজার মানুষের বসতি। ক্যাম্পকে নিরাপদ ও সুন্দর রাখতে কমিটি করে দেওয়া হয়েছে। এখানে ৯টি মসজিদ, দুটি ফোরকানিয়া মাদ্রাসা, একটি নূরানি মাদ্রাসা ও দুটি স্কুল রয়েছে। সাহায্য সংস্থা থেকে দেওয়া ত্রাণেই খাওয়া-দাওয়া চলে তাদের। আর পড়াশোনার সব সুযোগ তো আছেই। তিনি বলেন, আমি চাই না, বাচ্চারা ছুরি-বন্দুক হাতে নিয়ে বড় হোক। তাদের হাতে বরং কলমই শোভা পায়। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের বিষয়ে তিনি বলেন, 'সবাই এখন আমাদের দোষ দিচ্ছে। কিন্তু আমরা যাব কোথায়? আমাদের নিরাপত্তার নিশ্চয়তা কেউই দিতে পারেনি। নিজের ভিটেমাটিতে ফিরতে চায় সবাই। কিন্তু সে মাটিতে যদি মৃত্যু তাড়া করে, তাহলে ক্যাম্পের বন্দিজীবনই তো ভালো।'