হোয়াইট হাউসে অনুষ্ঠান

রোহিঙ্গা নেতা শোনালেন দুর্বিষহ জীবনের গল্প

প্রকাশ: ০৪ আগস্ট ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

আবদুর রহমান, টেকনাফ (কক্সবাজার)

মুহিব উল্লাহ

ঠাঁই হয়নি নিজভূমে। যতদিন সেখানে ছিলেন সেই অভিজ্ঞতাও দুর্বিষহ। নির্যাতন-নিপীড়ন সহ্য করতে হয়েছে বিভিন্ন সময়। তারপরও আঁকড়ে থাকতে চেয়েছেন স্বদেশের মাটি। কিন্তু পারেননি, এখন তিনি বাংলাদেশে শরণার্থী। বাস্তুচ্যুত হওয়ার বেদনা এবং শরণার্থী জীবনের দুঃসহ অভিজ্ঞতা শুনিয়ে এলেন বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্রের প্রধানকে। সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন রোহিঙ্গা নেতা মুহিব উল্লাহ। এ সময় রোহিঙ্গাদের নিজভূমে ফিরতে যুক্তরাষ্ট্রের সহযোগিতা চান তিনি।

ধর্মীয় কারণে নির্যাতনের শিকার চীন, তুরস্ক, উত্তর কোরিয়া, মিয়ানমারসহ ১৭টি দেশের ২৭ জন প্রতিনিধি সম্প্রতি হোয়াইট হাউসের ওভাল অফিসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। তাদের মধ্যে একজন ছিলেন আরাকান রোহিঙ্গা সোসাইটি ফর পিস অ্যান্ড হিউম্যান রাইটসের চেয়ারম্যান মুহিব উল্লাহ।

নির্যাতনের মুখে ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট মিয়ানমারের মংডু টাউনশিপের সিকদারপাড়া গ্রাম থেকে পালিয়ে কক্সবাজারের উখিয়া কুতুপালং চাকমারকুল ক্যাম্পে আশ্রয় নেন মুহিব। গত বুধবার বিকেলে ক্যাম্পের পাশে ছোট্ট ঝুপড়িতে এআরএসপিএইচ অফিসে সমকালের সঙ্গে কথা বলেন তিনি।

মুহিব জানালেন, গেল মাসের ১৩ তারিখ বাংলাদেশ সরকারের এক উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তার মাধ্যমে জানতে পারেন, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে দেখা করার সুযোগ পাচ্ছেন তিনি। সেখানে তিনি 'ধর্মীয় স্বাধীনতা' শিরোনামে একটি অনুষ্ঠানে কথা বলারও সুযোগ পাবেন। তিনি বলেন, শুনে প্রথমে হতবাক হয়েছি, এও কি সম্ভব! অবশেষে ১৭ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টে ওই অনুষ্ঠানে যোগ দেন তিনি। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন দেশটির ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্স। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আব্দুল মোমেনও ছিলেন সেখানে।

এই রোহিঙ্গা জানান, চার ঘণ্টার বৈঠক শেষে হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় তাদের। সেখানে বাংলাদেশ থেকে যাওয়া হিন্দু নারী প্রিয়া সাহাও ছিলেন। মুহিব উল্লাহ ট্রাম্পকে বলেছেন, রোহিঙ্গারা মিয়ানমারে ফিরে যেতে চায়, রোহিঙ্গাদের পুনর্বাসনে তার পরিকল্পনা কী? জবাবে প্রেসিডেন্ট বলেন, কোথাকার রোহিঙ্গা? এ সময় ট্রাম্পের পাশে এক কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থী, বার্মা থেকে আসা।

এর আগে ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইক পেন্সের উপস্থিতিতে এক বক্তৃতায় রোহিঙ্গা নেতা মুহিব বলেন, বাংলাদেশকে ধন্যবাদ জানাই যে, তারা রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে আশ্রয় দিয়েছে, থাকার ও খাবারের সুন্দর ব্যবস্থা করেছে। আমরা গণহত্যার মুখোমুখি হয়েছিলাম। মিয়ানমার সরকার এবং কিছু বৌদ্ধ চরমপন্থিদের কারণে স্বদেশ থেকে পালাতে বাধ্য হয়েছিল।

তিনি বলেন, ৫০ বছর ধরে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী মিয়ানমারে নির্যাতনের শিকার হয়ে আসছে। ২০১৬-১৭ সালে দুই বছরে সাড়ে ১০ হাজারের বেশি মানুষ হত্যা করেছে, ধর্ষণ-গণধর্ষণের শিকার হয়েছে ১৮ হাজার ৩৪৪ জন। ৮৮টি গণকবরের সন্ধান মিলেছে, বেআইনিভাবে গ্রেফতার করা হয়েছে আড়াই হাজারের বেশি মানুষকে। অনেক ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করা হয়েছে। পাশাপাশি ৭৫ হাজার ঘরবাড়ি আগুনে পুড়িয়ে দিয়ে লুটপাট করা হয়েছে। সেখানে রোহিঙ্গাদের ধর্মীয় স্বাধীনতা নেই। এমনকি উচ্চশিক্ষা-চাকরির সুযোগও নেই।

বক্তৃতায় মুহিব জানান, এখনও মিয়ানমারে ২ লাখ রোহিঙ্গা শরণার্থী হিসেবে শিবিরে বসবাস করছে। এর বাইরে যারা রয়েছে, তারাও সহিংসতার আতঙ্কের মধ্যে আছে। এখনও তাদের নাগরিক অধিকার দেওয়া হয়নি। কিন্তু সে দেশের নাগরিক হিসেবে তাদের কাছে যথেষ্ট পরিমাণ দলিলাদি রয়েছে। এমনকি ২০১৪ সালে নির্বাচিত ছয়জন রোহিঙ্গা সংসদ সদস্যের নাম তুলে ধরেন তিনি। এ সময় রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠী যেন খুব তাড়াতাড়ি নাগরিকত্ব নিয়ে মিয়ানমারে ফিরতে পারে, সে ব্যাপারে সহযোগিতা চান মুহিব। অনুষ্ঠানে ভারত, শ্রীলংকা, ভিয়েতনাম, নিউজিল্যান্ডসহ অনেক দেশ থেকে আসা শরণার্থীরা বক্তব্য দেন।

যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়ার ব্যাপারে মুহিব বলেন, ১৫ জুলাই বাংলাদেশ থেকে যাত্রা শুরু করে প্রথমে তারা দুবাই পৌঁছান। সেখান থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছান ১৬ জুলাই বিকেলে। এরপর সেখানে স্টেট প্লাজা নামে একটি হোটেলে ওঠেন তারা। সফর শেষে গত ২১ জুলাই বাংলাদেশে ফেরেন।

রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে হোয়াইট হাউসের প্রতিক্রিয়ার ব্যাপারে মুহিব বলেন, এ সফর রোহিঙ্গাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আগের চেয়ে মিয়ানমার সরকারের প্রতি চাপ বাড়ছে। যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মিয়ানমারের ওপর নিষেধাজ্ঞা বাড়ছে। সবাই চাপ অব্যাহত রাখলে আগামী এক বছরের মধ্যে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়া শুরু হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন। যুক্তরাষ্ট্রে তার সফরসঙ্গী হিসেবে মুহাম্মদ নওখিম নামে আরও এক রোহিঙ্গা যুবক গিয়েছিলেন।

বিষয় : হোয়াইট হাউস রোহিঙ্গা