'ক্যাংকা করি ঈদ কোরমো'

গাইবান্ধায় ভেসে গেছে ঘরবাড়ি

প্রকাশ: ১০ আগস্ট ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

উজ্জল চক্রবর্ত্তী, গাইবান্ধা

গাইবান্ধা-ফুলছড়ি-সাঘাটা উপজেলা সড়কে অস্থায়ী ঘর নির্মাণ করে বসবাস করছে বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষ- সমকাল

'ক্যাংকা করি ঈদ কোরমো, বুজবার পারি না। এক রাতোত বানের পানিত ঘরবাড়ি-আসবাবপত্র সোগ ভাসি গেচে। নিমিষের মদ্দে সোগ নিচ্চিন্ন হয়া গেলো। নিজের জান আর কোন রকমে ছোলপোল নিয়া ঘাটাত (সড়কে) আসি উটছি। ঘাটার ধারোত পলিতিন দিয়া বানান ঘরোত ছোলপোল নিয়া মাতা গুঁজি আচি। বানের পানিত বাড়ির ভিটাখান একোন দরিয়া। হামরা একন পতের (পথের) ফকির।' কথাগুলো বলতে বলতে কেঁদে ফেলেন হতদরিদ্র রিকশাচালক আশরাফ আলী (৫২)।

সরেজমিন গাইবান্ধা-সাঘাটা ও ফুলছড়ি উপজেলা সড়কে সাঘাটার ভরতখালী ইউনিয়নের কুকড়াহাট সাধুর আশ্রম গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, প্রায় ২০টি পরিবারের ঠাঁই হয়েছে সড়কে। বন্যার কোনো প্রস্তুতিই ছিল না তাদের। কেননা কোনো বছর এ গ্রাম বন্যা কবলিত হয়নি। কিন্তু এবার ব্রহ্মপুত্র বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধের রতনপুর-শিংড়িয়া অংশ ভেঙে লোকালয়ে পানি প্রবেশ করে। পানির তোড়ে অনেক সড়ক ভেঙে গেলেও ক্ষতিগ্রস্ত হন কুকড়াহাট সাধুর আশ্রম গ্রামের বাসিন্দারা। গ্রামটির ২০টি পরিবার ভিটেমাটি হারিয়ে এখন পথে বসেছে। প্রকৃত অর্থেই ঠাঁই নিয়েছে পথে। অর্থাভাবে অন্যখানেও যেতে পারছেন না তারা।

একই অবস্থা ওই গ্রামের আব্দুল জলিল, স্বামী পরিত্যক্তাফিরোজা বেগম, কছিরন বেওয়া, জমিলা খাতুন, বুলবুলি খাতুনসহ বৃদ্ধ আবু তালেব, মখলেছ আলী, আব্দুস সালাম, হামিদুল হক, খাজা মিয়া, শাহাদুল ইসলাম, জহুরুল ইসলাম, আবুল হোসেন, মজনু মিয়া, মমিনুল ইসলাম, মোনা মিয়ার। সন্তানসন্ততি নিয়ে বিপাকে পড়েছেন সবাই। এলাকার বাসিন্দা মাদ্রাসা শিক্ষক রুহুল আমিন জানান, খুব একটা অভাবী ছিলেন না তারা। গ্রামের কেউ রিকশা-ভ্যান চালিয়ে, কেউবা অন্যের জমিতে কাজকর্ম করে সংসার চালাতেন। সঞ্চয় না থাকলেও প্রতিদিনের উপার্জনে তাদের দিন চলত বেশ ভালোই। কিন্তু ব্রহ্মপুত্রের বাঁধভাঙা বন্যার পানির তোড়ে গাইবান্ধা-ফুলছড়ি-সাঘাটা সড়কের ৩৫০ ফুট এলাকা ভেসে যায়। এতেই মুহূর্তে ২০টি পরিবার পথে বসে।

সরেজমিন ফুলছড়ি-সাঘাটা ও সদর উপজেলার বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা গেছে, দিনমজুর মানুষের মাঝে ঈদ আনন্দ নেই। বন্যার কারণে নিম্ন আয়ের মানুষ কর্মহীন। বন্যায় এলাকার সমস্ত জমির ফসল নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কৃষকের কোনো কাজ নেই, গৃহস্থের বাসাবাড়িতেও কাজ নেই। অনাহারে-অর্ধাহারে জীবনযাপন করছে অসহায় পরিবারের লোকজন।

ভরতখালী ইউপি চেয়ারম্যান শামসুল আজাদ শীতল জানান, অনাকাঙ্ক্ষিত বন্যায় তার ইউনিয়নের অনেক লোক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এদের মধ্যে ৫০ পরিবার পুরোপুরি ভিটেমাটি ও গৃহহারা হয়েছে। ফলে তারা এখন পথের ফকির। অর্থাভাবে ঈদে ওই পরিবারগুলোর ঘরে আনন্দ বলতে কিছু থাকল না।

সাঘাটার ইউএনও উজ্জ্বল কুমার ঘোষ জানান, ইতিমধ্যে ইউপি চেয়ারম্যানদের মাধ্যমে ক্ষতিগ্রস্তদের ভিজিএফের চাল দেওয়া হয়েছে। আগামীতে তালিকা অনুযায়ী গৃহহীন বাসিন্দাদের গৃহ নির্মাণসামগ্রী  বিতরণ করা হবে।