দিনে পাঁচ টন বর্জ্যে বিপন্ন কাপ্তাই লেক

রক্ষা করতে প্রতিবেদন গেছে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে

প্রকাশ: ১৪ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

নামের সঙ্গে শোল থাকলেও মহাশোল মাছটা দেখতে অনেকটা রুই মাছের মতো। তবে মহাশোলের আঁশ অনেক বড়। রঙেও আছে সোনালি আভা। ভোজনরসিকদের কাছে সুস্বাদু এ মাছের কদর ব্যাপক। মাছের রাজ্যে এমন কদর আছে বাঘাইড়, পিপলা শোল এবং নান্দিনারও। রাঙামাটির কাপ্তাই লেকে এক সময় প্রচুর পাওয়া গেলেও এখন কালেভদ্রেও মিলছে না এসব মাছ। সাম্প্রতিক এক গবেষণা বলছে, ৭৫ প্রজাতির মাছ থাকা কাপ্তাই লেক থেকে বিলুপ্ত হয়ে গেছে অন্তত ৯ প্রজাতি। বিপন্নের পথে আরও ১৮ প্রজাতির মাছ। এটির ৫টি কারণ খুঁজে পেয়েছে বাংলাদেশ মৎস্য ইনস্টিটিউট। তাদের মতে পলি জমে লেকের তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়া, নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার, প্রজনন মৌসুমে নির্বিচারে মাছ নিধন, চাষের জন্য লেকের পাশে ব্যাপকহারে সার-কীটনাশক ব্যবহার ও প্রধান চারটি প্রজননস্থল (কাসালং চ্যানেল, বরকল চ্যানেল, চেঙ্গী চ্যানেল ও রিংকং চ্যানেল) নষ্ট হয়ে যাওয়ায় কাপ্তাই লেকে বিপন্ন হচ্ছে মাছ। আবার চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও অ্যানিম্যাল সায়েন্স বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিভাসু) মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদ বলছে, নান্দনিক এই লেকে প্রতিদিন বর্জ্য পড়ছে ৫ টন। লেকের চারপাশে মানুষের ব্যবহার করা ১০ হাজার খোলা টয়লেটই এই বর্জ্যের প্রধান উৎস!

স্বাভাবিকভাবে ৬৮ হাজার ৮০০ হেক্টরের এই লেকে প্রতি বছর ৬০ থেকে ৭০ হাজার টন মাছ পাওয়ার কথা। এখন সেখানে গড়ে মিলছে মাত্র ১০ হাজার টন মাছ। দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম বৃহৎ এই কৃত্রিম লেকের দৈর্ঘ্য প্রায় ৭৮ কিলোমিটার। বিদ্যুৎ উৎপাদনকে কেন্দ্র করে ১৯৬১ সালে এই লেক তৈরি হলেও এটি দেশের মাছ উৎপাদনেও গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে আসছিল।

কাপ্তাই লেকে মাছ বিপন্ন হওয়ার সার্বিক চিত্র তুলে ধরে গত মাসে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে একটি প্রতিবেদন পাঠিয়েছেন চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য গৌতম বুদ্ধ দাশ। এই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, 'কাপ্তাই লেকে একসময় দেশি-বিদেশি ৭৫ প্রজাতির মাছ পাওয়া গেলেও এখন আর সেই চিত্র নেই। নীল-সবুজ শৈবাল ও ডায়াটম নামের এক ধরনের উদ্ভিদকণা প্রচুর পরিমাণে থাকায় কাপ্তাই লেকে প্রচুর পরিমাণে উৎপাদন হতো কার্প জাতীয় মাছ। কালের পরিক্রমায় এখন এ জাতীয় মাছ হারিয়ে যাচ্ছে ক্রমশ। মহাশোল, বাঘাইড়, পিপলা শোল, নান্দিনা, সিলন, দেশি সরপুঁটি, ঘাউরা, মোহিনী বাটা ও দেশি পাঙাশ প্রজাতির মাছ এরই মধ্যে বিলুপ্ত হয়ে গেছে। বিপন্নপ্রায় মাছের মধ্যে রয়েছে বাচুয়া বাচা, ভাঙন বাটা, সরপুঁটি, দেশি মহাশোল, মধু পাবদা, পোয়া, ফাইস্যা, গুলশা, সাদা ঘনিয়া, বাচা, কালিবাউশ ও ঘনিয়া। উৎপাদন ক্রমশ কমছে রুই, কাতলা, মৃগেল ও বড় চিতল জাতীয় মাছের।' প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে পাঠানো এই প্রতিবেদন তৈরি করেন সিভাসুর মাৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের ডিন অধ্যাপক ড. এম. নুরুল আবছার খান।

জানতে চাইলে অধ্যাপক ড. এম. নুরুল আবছার খান বলেন, 'বাংলাদেশ মৎস্য উন্নয়ন করপোরেশন, ফ্রেশ ওয়াটার রিসার্চ সাব স্টেশন ও অ্যাকুয়াটিক রিসার্চ গ্রুপের তথ্য-উপাত্ত পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, প্রতিদিন এই লেকটিতে ৫ টনেরও বেশি বর্জ্য পড়ে। লেকের আশপাশে থাকা ৮৫ শতাংশ মানুষের যাবতীয় বর্জ্য যাচ্ছে এই লেকে। এছাড়া পলি জমে লেকের তলদেশ ভরাট হয়ে যাওয়া, নিষিদ্ধ জাল ব্যবহার, প্রজনন মৌসুমে নির্বিচারে মাছ নিধন, চাষের জন্য লেকের পাশে ব্যাপকহারে সার-কীটনাশক ব্যবহারের কারণেও নষ্ট হচ্ছে মাছের স্বাভাবিক আবাসস্থল ও প্রজনন পরিবেশ।' তিনি জানান, ১৯৬৫-৬৬ সালেও এই লেকে উৎপাদিত মাছের ৮১ শতাংশ ছিল কার্প জাতীয়। এখন যে মাছ পাওয়া যাচ্ছে তার ৯২ শতাংশই হচ্ছে চাপিলা, কাঁচকি, তেলাপিয়া জাতীয় ছোট মাছ। অথচ ১৯৬৬ সালে লেকে উৎপাদিত মাছের মধ্যে ছোট মাছের হার ছিল মাত্র ৮ শতাংশ।

মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের গবেষণা বলছে, ছোট আকারের মাছ বাড়লেও কাপ্তাই লেকে রুই, কাতলা ও মৃগেল জাতীয় মাছ কমছে ক্রমশ। ২০০৩ সালে এই লেকে মাছ উৎপাদন হয়েছিল ৪ হাজার ৫৬৬ টন। এর মধ্যে রুই জাতীয় ওই তিনটি মাছের উৎপাদন ছিল ১১৯ টন। কিন্তু ২০১৬ সালে মোট ৯ হাজার ৩৬৪ টন মাছ উৎপাদিত হলেও রুইজাতীয় এই তিনটি মাছের উৎপাদন ছিল মাত্র ৫ টন। এই গবেষণা কার্যক্রমে নেতৃত্ব দেন বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের ঊর্ধ্বতন বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা আবুল বাশার। কাপ্তাই লেক নিয়ে সিভাসু আয়োজিত এক কর্মশালায় অতিথি হয়ে এসে তিনি বলেন, 'পানিপ্রবাহ না থাকলে রুই জাতীয় মাছ ডিম ছাড়ে না। তাই কাপ্তাই লেকে আগের মতো মাছের প্রজনন হচ্ছে না। রুই জাতীয় মাছের হার বাড়াতে লেকের তলদেশ খনন করতে হবে। প্রজননস্থলগুলো পুনরায় খননের মাধ্যমে সংরক্ষণও করতে হবে। লেককে অভয়াশ্রম ঘোষণা করে কমাতে হবে দূষণের মাত্রাও।'

এদিকে চট্টগ্রামের বিভাগীয় কমিশনার মো. আবদুল মান্নান বলেন, 'কচুরিপানা, শিল্পকারখানা, হোটেল-রেস্টুরেন্ট ও বাড়িঘরের বর্জ্য ফেলার কারণে কাপ্তাই লেক দূষিত হচ্ছে প্রতিদিন। এই লেক হারাতে বসেছে নাব্য ও সৌন্দর্য। কচুরিপানা পরিস্কারের জন্য প্রায় আড়াই কোটি টাকা মূল্যের একটি হারভেস্টার মেশিন থাকলেও কাপ্তাই বিদ্যুৎ বিভাগ সেটি নিয়মিত ব্যবহার করে না। কাপ্তাই বাঁধের দায়িত্বে রয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। এখানকার বিদ্যুৎ বিভাগে ৪৩২ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী থাকা সত্ত্বেও লেকের নাব্য রক্ষায় তারাও আন্তরিকভাবে কাজ করছেন না। এজন্য বাড়ছে দূষণ। কমছে কার্প জাতীয় মাছের উৎপাদন।' কর্ণফুলী হ্রদ পরিচালনা বিষয়ক উপদেষ্টা কমিটির সর্বশেষ সভায় এটি নিয়ে তীব্র ক্ষোভও প্রকাশ করেন তিনি।