পর্যটন সম্ভাবনা

অপরূপ গুলিয়াখালী

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

শৈবাল আচার্য্য, চট্টগ্রাম ও এম সেকান্দর হোসাইন, সীতাকুণ্ড

একদিকে দিগন্তজোড়া জলরাশি আর অন্যদিকে কেওড়া বন। আছে সবুজগালিচার বিস্তৃত ঘাস। তার মাঝে বয়ে চলেছে আঁকাবাঁকা নালা। জোয়ারের পানিতে সবুজ ঘাসের ফাঁকে নালাগুলো কানায় কানায় ভরে ওঠে। জোয়ার চলে গেলে ফিরে যায় আগের অবস্থায়। মৃদু বাতাস আর গাছের পাতার ফিসফিসানিতে তপ্ত দুপুর, স্নিগ্ধ বিকেল কিংবা বিষণ্ণ সন্ধ্যাটি যে কাউকে রাঙিয়ে তুলবে বর্ণিল আলোকছটায়। খাল ধরে এগিয়ে গেলে মিলবে সমুদ্রের অপার সৌন্দর্য উপভোগের এক অভাবনীয় মুহূর্ত। চোখের সামনে অনন্যসুন্দরের এক সৈকত। নাম তার গুলিয়াখালী সি-বিচ। গুলিয়াখালী বিচকে সাজাতে কোনো কার্পণ্য করেনি প্রকৃতি। সবকিছু মিলে এ যেন প্রকৃতির অন্যরকম 'আশীর্বাদ'। এই সৈকতের একপাশে রয়েছে সাগরের জলরাশি, অন্যপাশে কেওড়া বন। দেখা মিলবে সোয়াম্প ফরেস্ট আর ম্যানগ্রোভ বনের অন্যরকম মিলিত রূপ। এরই মধ্যে এ সৈকতে ছুটে আসছেন পর্যটকরা।

স্থানীয়দের কাছে সৈকতটি মুরাদপুর সি-বিচ নামে পরিচিত। চট্টগ্রামের সীতাকুণ্ড বাজার থেকে দূরত্ব মাত্র পাঁচ কিলোমিটার। আধুনিকতার কোনো ছোঁয়া না লাগলেও এরই মধ্যে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে দলবেঁধে অনেক দর্শনার্থী ছুটে আসছেন প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের এই সৈকতে। সংশ্নিষ্টদের মতে, সরকারি উদ্যোগ ও পৃষ্ঠপোষকতা পেলে গুলিয়াখালী বিচ হতে পারে দেশের পর্যটনের অন্যতম একটি স্থান। আর তা সম্ভব হলে দেশের পর্যটন খাতে অনেক বড় অবদান রাখতে পারবে এটি। মানুষের আনাগোনা কম বলে সৈকতটিতে মিলবে নিরিবিলি পরিবেশও। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা এই সৈকতে যে কেউ চাইলেই বোটে করে সমুদ্র ঘুরে আসতে পারেন। সাগরে ঘোরার জন্য রয়েছে অসংখ্য বোট যা দিয়ে একেবারে সন্দ্বীপ চ্যানেল পর্যন্ত যাওয়া যায়। সন্ধ্যা হলে সোনালি আভায় নীরব নিস্তব্ধ সমুদ্র, সাগরজলে সূর্যের রক্তিম আভা, হরিণ, শিয়ালসহ দেখা মিলবে হরেক রকমের পশু-পাখিও।

মুরাদপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. জাহেদ হোসেন নিজামী বলেন, 'বিচটিতে এখনও লাগেনি কোনো কৃত্রিমতার ছোঁয়া। নেওয়া হয়নি কোনো সরকারি কিংবা বেসরকারি উদ্যোগও। তারপরও নানা মাধ্যমে খবর পেয়ে এরই মধ্যে দেশের প্রত্যন্ত এলাকা থেকে অনেকে ছুটে আসছেন। দিন দিন পর্যটকের সংখ্যা বাড়ছে এই বিনোদন স্পটটিতে। সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা পেলে গুলিয়াখালী বিচ হতে পারে দেশের পর্যটনের অন্যতম একটি স্থান।

গুলিয়াখালী গ্রামের বাসিন্দা মো. আনিস বলেন, 'কোনো প্রকার প্রচারণা ছাড়াই এখানে অনেক পর্যটক ছুটে আসছেন। গুলিয়াখালী বিচের অপরূপ সৌন্দর্যের দৃশ্য নিজ চোখে দেখে হতবাক হয়ে যান অনেকে।' আরেক বাসিন্দা জানে আলম বলেন, 'সৈকতটিকে ঘিরে সরকারি কিংবা বেসরকারিভাবে উন্নয়ন কর্মযজ্ঞের উদ্যোগ নেওয়া হলে এটি হবে দেশের অন্যতম দর্শনীয় ও বিনোদনের ব্যতিক্রমী মাধ্যম।'

পাঁচ বন্ধুসহ নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থেকে বেড়াতে আসা ঢাকা কলেজের ছাত্র মো. আহমেদ উল্লাহ বলেন, 'আমি যতটা ভেবেছিলাম তার চেয়েও অনেক বেশি সুন্দর গুলিয়াখালী সমুদ্রসৈকত। সাগরের ঢেউগুলো ঠিক যেখানে এসে শেষ হয় সেখানেই সবুজ বন। অপর বন্ধু স্বর্ণা বলেন, 'এত সুন্দর নিরিবিলি একটি পরিবেশ ভাবা যায় না। বহুদিন পরে যেন অনেক পাখির কিচিরমিচির শুনলাম।' চট্টগ্রাম নগরের দেওয়ান বাজার এলাকা থেকে পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা সৌমেন চৌধুরী বলেন, 'এখানে বালুচর নেই। সাগরের শেষ প্রান্ত এসে ছুঁয়েছে সবুজ কেওড়া বন। এই বন এতই সবুজ ও সজীব যে প্রকৃতির এমন রূপ দেখে মুগ্ধ হবেন যে কেউ। সব মিলিয়ে পরিবেশটি অসাধারণ।'

কুমিল্লা মিয়াবাজার এলাকার বাসিন্দা ক্যাডেট কলেজের ছাত্র মো. ইসলাম বলেন, 'অনেকদিন ধরে আসার ইচ্ছে ছিল এখানে। অবশেষে দুই বন্ধুকে নিয়ে আসা হলো। উত্তাল সাগরের ঢেউ আর সবুজ প্রকৃতিসহ এখানকার নানারূপে মুগ্ধ না হয়ে উপায় নেই।'

কয়েকজন পর্যটক বলেন, 'এখানে যে হারে পর্যটকের আগমন হচ্ছে সেভাবে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও ভালোমানের খাবারের হোটেল গড়ে ওঠেনি। প্রশাসন ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিরা যদি এদিকটায় একটু নজর দেন তাহলে যারা দূর থেকে আসবেন তারা স্বস্তি নিয়ে ভ্রমণ শেষ করতে পারবেন। আধুনিকতার ছোঁয়া পড়লে এই বিচটি ঘিরে স্থানীয় কয়েক হাজার মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।'