রিফাত হত্যা: অভিযোগপত্রে নতুন বয়ান পুলিশের

প্রকাশ: ২০ সেপ্টেম্বর ২০১৯      

বরগুনা প্রতিনিধি

বরগুনায় আলোচিত রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় অভিযোগপত্র দাখিলের ১৮ দিন পর এর কপি প্রকাশ করা হলো। আইনজীবীরা বলেছেন, অভিযোগপত্র দাখিলের পর তা প্রকাশে সাধারণত এত দেরি করা হয় না।

বৃহস্পতিবার প্রকাশ করা এই অভিযোগপত্রে নতুন বয়ান হাজির করেছে পুলিশ। দাবি করা হয়েছে, আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক থাকাকালেই রিফাত অন্য মেয়েদের সঙ্গেও সম্পর্কে জড়ান।

হত্যাকাণ্ডের ৬৬ দিন পর গত ১ সেপ্টেম্বর আদালতে অভিযোগপত্র দাখিল করেন মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ও বরগুনা থানার পুলিশ পরিদর্শক (তদন্ত) হুমায়ুন কবির। তবে আদালতে চার্জশিট দাখিল করলেও মামলার আসামিপক্ষ অথবা গণমাধ্যম কর্মীরা চার্জশিটের কপি এতদিন হাতে পাননি। বুধবার অভিযোগপত্র আদালত গ্রহণ করার পর বৃহস্পতিবার কপি বাইরে প্রকাশ করা হয়েছে। ৬১৪ পৃষ্ঠার এই অভিযোগপত্রের সারসংক্ষেপ ৩৪ পৃষ্ঠার।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, নিহত রিফাত ও মামলার ১ নম্বর আসামি বন্দুকযুদ্ধে নিহত নয়ন বন্ড আগে বরগুনা জিলা স্কুলে একত্রে লেখাপড়া করেছে। সে সুবাদে তাদের উভয়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠ বন্ধুত্ব ছিল। রিফাতের সঙ্গে আনুমানিক দুই বছর আগে থেকে মিন্নির প্রেমের সম্পর্ক ছিল। সে সময় সরল বিশ্বাসে রিফাত নয়ন বন্ডের সঙ্গে মিন্নির পরিচয় করিয়ে দেয়। এদিকে মিন্নির সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক থাকাকালেই রিফাত অন্য মেয়েদের সঙ্গেও প্রেমের সম্পর্ক চালিয়ে যায়। এটা মিন্নি জানতে পারেন।

অভিযোগপত্রে বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের রমজান মাসে রিফাত শরীফ মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় আহত হয়ে দেড় মাস চিকিৎসাধীন ছিলেন। এসব কারণে রিফাতের সঙ্গে মিন্নির সম্পর্কের কিছুটা দূরত্ব সৃষ্টি হয়। এ সুযোগে আসামি নয়ন বন্ড মিন্নির প্রতি আকৃষ্ট হয়ে প্রেম নিবেদন করে এবং মিন্নিও তাতে সাড়া দিয়ে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক তৈরি করেন। একপর্যায়ে মিন্নি রিফাত শরীফ ও নয়ন বন্ড দু'জনের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক বজায় রাখেন।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়েছে, ২০১৮ সালের ১৫ অক্টোবর মিন্নি ও নয়ন বন্ড বিয়ে বন্ধনে আবদ্ধ হয়। ওই বিয়েতে নয়ন বন্ডের পক্ষে সাক্ষী ছিল মামলার ২ নম্বর আসামি রাকিবুল হাসান রিফাত ফরাজী এবং মিন্নির পক্ষে সাক্ষী হিসেবে ছিলেন নয়ন বন্ডের প্রতিবেশী ও বন্ধু সাইফুল ইসলাম মুন্না এবং তার স্ত্রী জান্নাতুল ফেরদৌস। বিয়ের পর মিন্নি ও নয়ন বন্ড স্বামী-স্ত্রী হিসেবে প্রকাশ্যেই সম্পর্ক বজায় রাখেন। কিন্তু বিয়ের পর মিন্নি ধীরে ধীরে জানতে পারেন, নয়ন বন্ড মাদকসেবনসহ বিভিন্ন অপরাধে জড়িত এবং থানায় তার বিরুদ্ধে একাধিক মামলা রয়েছে। এ কারণে নয়ন বন্ডের সঙ্গে মিন্নির সম্পর্কের কিছুটা অবনতি হতে থাকে এবং রিফাত শরীফের সঙ্গে পুনরায় সম্পর্ক শুরু হয়।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, নয়ন বন্ডের সঙ্গে বিয়ের তথ্য গোপন রেখে কোনো বিচ্ছেদ ছাড়াই গত ২৬ এপ্রিল মিন্নিকে রিফাতের সঙ্গে পারিবারিকভাবে বিয়ে দেওয়া হয়। কিন্তু রিফাত শরীফের সঙ্গে বিয়ের পরও কলেজে যাওয়া-আসার অজুহাতে মিন্নি নয়ন বন্ডের সঙ্গে শারীরিক সম্পর্কসহ সব ধরনের যোগাযোগ রক্ষা করেন। বিষয়টি জানতে পেরে মিন্নিকে নয়ন বন্ডের সঙ্গে যোগাযোগ রাখতে নিষেধ করেন রিফাত। এ ঘটনায় মিন্নি এবং রিফাত শরীফের মধ্যে বিভিন্ন সময় ঝগড়াঝাটি হয়। একপর্যায়ে মিন্নি রিফাতের কাছে ডিভোর্স চান এবং আগের স্বামী নয়ন বন্ডের কাছে ফিরে যেতে চান। অন্যদিকে রিফাতের সঙ্গে মিন্নির বিয়ের আগে গত মার্চ মাসে নয়ন বন্ড স্থানীয় ইউটিডিসি সরকারি মাধ্যমিক বিদ্যালয় মাঠে জন্মদিন পালন করে এবং ওই অনুষ্ঠানে প্রধান মেহমান ছিল মিন্নি। অনুষ্ঠানটি নয়ন বন্ডের বন্ধু হেলাল শিকদার তার মোবাইলে ভিডিও করে এবং তার ফেসবুক আইডিতে পোস্ট করে। পরে রিফাত শরীফ ওই ভিডিওটি দেখতে পান এবং গত ২৪ জুন হেলাল শিকদারকে ডেকে তার ব্যবহূত মোবাইল ফোনসেট নিয়ে যান। বিষয়টি হেলাল শিকদার নয়ন বন্ডকে জানালে নয়ন বন্ড তা আসামি রিফাত ফরাজীকে জানায়। পরে রিফাত ফরাজী মোবাইল ফোনে রিফাতকে হেলালের মোবাইল ফোনসেট ফেরত দেওয়ার কথা বলে। এ সময় রিফাত শরীফ আসামি রিফাত ফরাজীকে মা-বাবা তুলে গালাগাল করেন। পরে রিফাত ফরাজী মিন্নিকে ফোন করে রিফাত শরীফের কাছ থেকে মোবাইলটি ফোনটি উদ্ধার করে ফেরত দিতে বলেন। হেলালের মোবাইল নেওয়ার কারণে রিফাত শরীফকে মিন্নি ভর্ৎসনা করেন। এ কারণে রিফাত শরীফ ক্ষুব্ধ হয়ে মিন্নিকে চড়থাপ্পড়সহ তলপেটে লাথি মারেন।

অভিযোগপত্রে বলা হয়, মিন্নিকে নয়ন বন্ডের সঙ্গে প্রেমে বাধা দেওয়া, নিজের ইচ্ছামতো চলাচলে বাধা দেওয়া, কলেজে গিয়ে মিন্নির ওপর নজরদারি করা এবং সর্বশেষ হেলালের মোবাইল ফোন নেওয়াকে কেন্দ্র করে মিন্নিকে মারধর করায় রিফাত শরীফের ওপর ক্ষুব্ধ হন মিন্নি। এর জেরে গত ২৫ জুন মিন্নি কলেজে যাওয়ার কথা বলে নয়ন বন্ডের বাসায় যান এবং দীর্ঘ সময় ধরে রিফাত শরীফকে হত্যার পরিকল্পনা করেন।

অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, নয়ন বন্ড মিন্নির কাছ থেকে রিফাত শরীফকে হত্যার প্রস্তাব পেয়ে পথের কাঁটা দূর করতে তাকে হত্যার পরিকল্পনা চূড়ান্ত করে এবং হত্যা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে 'বন্ড ০০৭' গ্রুপের সদস্য এবং তার অনুসারী আসামি রিফাত ফরাজী, রিশান ফরাজী, রায়হান, অলিউল্লাহ অলি, টিকটক হৃদয়, রাব্বি আকন, মোহাইমিনুল ইসলাম সিফাত, রাকিবুল হাসান রিফাত হাওলাদার, রাকিবুল হাসান নিয়ামত, তানভীর, নাজমুল হাসানকে নিয়ে ২৫ জুন বিকেলে বরগুনা সরকারি কলেজের শহীদ মিনারে মিটিং করা হয়। তারা রিফাত শরীফকে হত্যার পরিকল্পনা বাস্তবায়ন ছক করে এবং হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণের জন্য ২৬ জুন সকাল ৯টায় বরগুনা সরকারি কলেজের সামনে সবাইকে উপস্থিত থাকতে নির্দেশ প্রদান করে। এরই ধারাবাহিকতায় ২৬ জুন সকালে রিফাত শরীফকে কুপিয়ে হত্যা করা হয়।

জানতে চাইলে মিন্নির আইনজীবী মাহবুবুল বারী আসলাম সমকালকে বলেন, অভিযোগপত্র প্রকাশে এত বিলম্ব অন্য কোনো মামলায় তিনি দেখেননি। বিলম্বের কারণ তার বোধগম্য নয়। মিন্নির বিরুদ্ধে কী অভিযোগ দেওয়া হয়েছে তিনি নিজে এখনও তা জানেন না।