নামজারি মামলার তারিখ দিতেও ঘুষ বগুড়ায়

প্রকাশ: ১৬ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

মোহন আখন্দ, বগুড়া

বগুড়ার নন্দীগ্রামে সহকারী কমিশনার (ভূমি) কার্যালয়ে ঢুকতেই কানে ভেসে এলো এক নারীর আক্ষেপ। তিনি বলছিলেন, 'গরিবেরা কি বিচার পাবে না?' দেখা গেল, তিনি গাছতলায় বসে কতগুলো কাগজ ব্যাগে ভরছেন আর বিলাপের সুরে কথা বলে যাচ্ছেন। পিয়ারা খাতুন নামে ওই নারী এবং তার ছোট বোন খারিজ বাতিলের (নামজারি) মামলা শুনানির জন্য এই কার্যালয়ে এসেছেন, যা এসিল্যান্ড অফিস নামেই বেশি পরিচিত।

এসিল্যান্ড অফিসে প্রতিটি মামলার শুনানি শেষে আদেশ কিংবা পরবর্তী শুনানির তারিখ তৎক্ষণাৎ বাদী-বিবাদী পক্ষকে জানিয়ে দেওয়ার নিয়ম রয়েছে। তবে তাদের ক্ষেত্রে সেটি করা হয়নি। প্রায় দুই ঘণ্টা আগে শুনানি শেষ হলেও তাকে আদেশ বা পরবর্তী শুনানির তারিখ জানাননি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা।

ক্ষুব্ধ পিয়ারা খাতুন এ প্রতিবেদককে বলেন, 'হামার মায়ের ভাগের জমি ওরা (ভূমি অফিসের কর্মকর্তা-কর্মচারী) অন্যায়ভাবে অন্যের নামে খারিজ করিছে। সেই খারিজ বাতিলের জন্যি ছয় মাস আগে মামলা করবার আসি। তখন মদন বাবু (মদন কুমার, বদলি হয়ে এখন বগুড়া ডিসি অফিসে কর্মরত) দুই হাজার ট্যাকা ঘুষ লিছে। আর এখন প্রত্যেক তারিখে শামীমকে (নন্দীগ্রাম এসিল্যান্ড অফিসের নাজির শামীম আহমেদ) ১০০ টাকা করে দেওয়া লাগে। তারপরেও তারিখ লিয়া তালবাহানা করিচ্চে ক্যা.. হামরা গরিব দেকেই ইঙ্কা (এ রকম) করিচ্চে?'

এ ঘটনা জুলাইয়ের শেষ দিনের। এদিনই অফিসের ভেতরে গিয়ে দেখা হয় একই উপজেলার বীরপলী গ্রামের আব্দুল জলিলের সঙ্গে। তিনি জানান, খারিজের জন্য সরকারি খরচ মাত্র ১ হাজার ১৫০ টাকা। তবে ২০১৮ সালের নভেম্বরে তার পৌনে ২ একর জমি খারিজের সময় অফিসের লোকজনকে ১০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে।

জানা গেছে, নন্দীগ্রাম এসিল্যান্ড অফিসের অনিয়ম ও দুর্নীতির এই চিত্র প্রতি দিনকার। ২০১৬ সালের সেপ্টেম্বরে এই অফিসে বসেই ঘুষ গ্রহণের সময় মিজানুর রহমান নামে এক সার্ভেয়ারকে (তখন ভারপ্রাপ্ত কানুনগো ছিলেন) দুদক কর্মকর্তারা হাতেনাতে গ্রেফতার করেছিলেন। নন্দীগ্রাম থানায় দায়ের করা মামলার এজাহারের বর্ণনা অনুযায়ী, ৩ শতক জমি খারিজ (নামজারি) করিয়ে দেওয়ার কথা বলে মিজানুর জনৈক পিয়াল খন্দকারের কাছ থেকে ৪ হাজার টাকা ঘুষ নিয়েছিলেন। কিছুদিন জেল খাটার পর তিনি বেরিয়ে আসেন। এখন আপিল বিভাগে মামলাটি চূড়ান্ত নিষ্পত্তির অপেক্ষায়।

দুদকের পিপি আবুল কালাম আজাদ জানান, নন্দীগ্রামের মতোই জেলার শিবগঞ্জেও ঘুষ গ্রহণকালে হাতেনাতে এক কর্মচারীকে গ্রেফতার করা হয়েছিল। ওই মামলায় বর্তমানে সাক্ষ্যগ্রহণ চলছে। খুব দ্রুতই রায় ঘোষণা করা হবে।

স্থানীয়রা বলছেন, দুদক কর্মকর্তারা এসিল্যান্ড অফিসে হানা দেওয়ার পরও অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধ হয়নি। সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, বিচারের দীর্ঘসূত্রতা এবং জবাবদিহি গড়ে না ওঠায় ভূমি প্রশাসনে দুর্নীতি কমছে না।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, নন্দীগ্রামের মতোই জেলার অন্যান্য ভূমি অফিসেও জমি খারিজ করতে বা খারিজ সংক্রান্ত মামলা করতে গিয়ে জনগণকে নানা অনিয়ম ও হয়রানির মুখে পড়তে হচ্ছে। এমনকি বগুড়া সদরে জাল খারিজের রেকর্ডও রয়েছে। এ ছাড়া খাজনা জমা দেওয়ার পরও ভলিউমে তুলতে দীর্ঘসূত্রতা এবং খারিজ বাতিলের মামলার রায় হওয়ার পরও দীর্ঘদিনেও তা কার্যকর না করার বিস্তর অভিযোগ রয়েছে।

বগুড়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের (রাজস্ব) কার্যালয়ের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, জেলার ১২টি এসিল্যান্ড অফিসে ভূমি সংক্রান্ত যত মামলা হয় তার ১২ শতাংশই হয় খারিজ বাতিল সংক্রান্ত। আর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকের দপ্তরে আপিল মামলার শতভাগই খারিজ বাতিল সংক্রান্ত।

টাকায় মেলে জাল খারিজ :খারিজ বাতিল সংক্রান্ত মামলাগুলো অনুসন্ধানকালে বগুড়া সদর এসিল্যান্ড অফিসের একটি মামলার নথির (নং-০৮, ২০১৬-২০১৭) সন্ধান মিলেছে, যেখানে জাল কাগজে বসতবাড়ির জায়গা খারিজ করিয়ে নেওয়ার প্রমাণ মিলেছে। অবশ্য এ বিষয়ে মামলা হলে শেষ পর্যন্ত খারিজটি [নং ১১৯০(ওঢ-ও)১৪-১৫] বাতিল হয়ে যায়। ওই মামলার বাদী শহরের সূত্রাপুর এলাকার চাঁদ সুলতানা শোভার একমাত্র ছেলে মীর সারোয়ার সজীব বলেন, আইন অনুযায়ী ওয়ারিশ, ক্রয় কিংবা আদালতের আদেশের ভিত্তিতে কেউ কোনো জমির বৈধ মালিক সাব্যস্ত হলেই কেবল তিনি সেই জমি তার নামে খারিজ করতে পারেন। কিন্তু আইনের সেই বিধানকে অবজ্ঞা করে তাদের বাড়ির সাড়ে ৪ শতাংশ জায়গা এমন এক ব্যক্তির নামে খারিজ করে দেওয়া হয়েছিল, যিনি তাদের ওয়ারিশ নন কিংবা তারা তার কাছে জায়গা বিক্রিও করেননি। পরে ভূমি অফিস থেকে জাল খারিজের সেই নথি সংগ্রহ করে দেখতে পান তাকে ওয়ারিশ সূত্রে জমির মালিক দেখানো হয়েছিল। আর এই কাজটি করেন বগুড়া পৌর ভূমি অফিসের তৎকালীন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা জহুরুল ইসলামের (বর্তমানে কাহালুতে উপজেলা সদরে কর্মরত)। পরে তারা জানতে পরেন, জহুরুল মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সেই জাল খারিজটি করে দিয়েছিলেন। এটা বাতিল করতে আইনজীবীর মাধ্যমে মামলা দায়ের এবং এক বছরেরও বেশি সময় শুনানি করতে গিয়ে তাদের প্রায় ১০ হাজার টাকা খরচ হয়ে যায়।

অভিযুক্ত জহুরুলের বর্তমান কর্মস্থল কাহালু ইউনিয়ন ভূমি অফিস। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, 'মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে জাল খারিজের কাগজে স্বাক্ষর করার তথ্য সত্য নয়। হয়তো ভুলে করে ফেলেছি। অনেক মামলার মধ্যে দু'একটা ভুল হতেই পারে।' তার অফিসে আসা একজন সেবাগ্রহীতা এ প্রতিবেদককে বলেন, 'জহুরুল সাহেব পয়সা ছাড়া কিছুই বোঝেন না। যত পরিচিতই হোন না কেন টাকা ছাড়া তিনি কোনো কাজ করেন না। তিনি প্রচুর পয়সার মালিক। শহরে তার ফ্ল্যাট বাড়ি আছে।' জহুরুল এসব অভিযোগও অস্বীকার করেন।

নন্দীগ্রাম এসিল্যান্ড আফিসে খারিজ বাতিলের মামলার সময় অর্থ গ্রহণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন ওই দপ্তরের তৎকালীন অফিস সহকারী মদন কুমার। তার দাবি, তিনি নন্দীগ্রামসহ সবখানেই সততার সঙ্গে কাজ করেছেন। মামলার শুনানির দিন বাদীপক্ষের কাছ থেকে অর্থ গ্রহণের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন নন্দীগ্রাম এসিল্যান্ড অফিসের নাজির শামীম আহমেদ। শুনানি শেষে তাৎক্ষণিকভাবে তারিখ ঘোষণা না করার বিষয়ে জানতে চাইলে নন্দীগ্রামের এসিল্যান্ড আরাফাত হোসেন বলেন, 'আমি একসঙ্গে দুই উপজেলার দায়িত্বে রয়েছি। এর পাশাপাশি সরকারি অন্যান্য দায়িত্বও পালন করতে হয়। আমার অনুপস্থিতিতে কোনো ব্যক্তিকে যাতে অহেতুক অফিস থেকে ফেরত যেতে না হয় সেজন্য ক্যালেন্ডার দেখে তারিখ দিতে হয়। তবে এখন থেকে আমরা তাৎক্ষণিকভাবে তারিখ জানিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করব।' খারিজের নামে তার কর্মচারীদের বিরুদ্ধে অতিরিক্ত অর্থ আদায়সহ মামলার শুনানির দিন নাজিরের অর্থ গ্রহণের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, বিষয়গুলো খতিয়ে দেখা হবে।

তদারকির দাবি :বেসরকারি সংস্থা সুশাসনের জন্য প্রচারাভিযানের (সুপ্র) বগুড়া জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক কেজিএম ফারুক বলেন, ভূমি অফিসে টাকা ছাড়া কাজ হয়, এ কথা কেউ বিশ্বাস করতে চায় না। অথচ আমরা সরকারি অফিসগুলোতে লেখা দেখতে পাই 'আমি ও আমার অফিস দুর্নীতিমুক্ত'। তিনি বলেন, অনিয়ম দুর্নীতি রুখতে সরকার ভূমি অফিসের কার্যক্রম ডিজিটাইজড করতে যাচ্ছে। এটা ভালো উদ্যোগ। তবে খেয়াল রাখতে হবে কাজগুলো ডিজিটাইজড হলেও কেউ যেন এনালগ পদ্ধতিতে দুর্নীতি করতে না পারে। এজন্য মাঠ পর্যায়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কার্যক্রম কঠোরভাবে তদারকি করতে হবে। সচেতন নাগরিক কমিটির (সনাক) বগুড়া জেলা শাখার সভাপতি মাসুদুর রহমান হেলাল বলেন, জনগণকে বলব, তারা যেন জমির কাগজগুলো সম্পর্কে ধারণা রাখেন। দেখা গেছে, অধিকাংশ মানুষ জমির কাগজপত্র বোঝেন না বলেই দালালদের কাছে যান।

বগুড়ায় দুদকের সহকারী পরিচালক আমিনুল ইসলাম জানান, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং ভবিষ্যতেও থাকবে। তিনি বলেন, নন্দীগ্রামে তিন বছর আগে তিনিই ঘুষ গ্রহণকালে মিজানুরকে হাতেনাতে গ্রেফতার করেছিলেন। দুর্নীতির অভিযোগ পাওয়া গেলে আবারও সেখানে অভিযান চালানো হবে।

বগুড়ার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) আব্দুল মালেক জানান, দুর্নীতির বিরুদ্ধে তাদের জিরো টলারেন্স নীতি রয়েছে। ভূমি প্রশাসনের প্রতিটি কাজে তারা স্বচ্ছতা বজায় রাখতে চান। কোথাও কোনো অভিযোগ পেলে অবশ্যই ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।