রংপুরে অন্তহীন অনিয়ম

প্রকাশ: ১৯ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

মেরিনা লাভলী, রংপুর

রংপুরে ভূমিসংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তিতে ব্যাপক অনিয়মের অভিযোগ করেছেন সেবাগ্রহীতারা। ভূমি-সংশ্নিষ্ট কার্যালয় ও আদালতে বছরের পর বছর ঘুরলেও মিলছে না কাঙ্ক্ষিত সেবা। উল্টো হয়রানির শিকার হচ্ছেন। এ অবস্থায় ভূমির মামলার জটিলতা ও ভোগান্তি কমানোর দাবি জানিয়েছেন তারা।

জেলা জজকোর্ট চত্বরে কথা হয় নগরীর ধাপ জেল রোড এলাকার নজরুল ইসলামের সঙ্গে। তিনি জানান, ১৯৭২ সালে সদরের ভগি মৌজার সাবেক ১২৪৩ দাগের ২১ শতক জমি একই এলাকার জোতিন্দ্র নাথ রায়ের কাছ থেকে কেনেন। এরপর জমিটি বুঝে নিতে গিয়ে তিনি দেখতে পান এটির পরিমাণ সাড়ে ১৮ শতক। জোতিন্দ্র নাথ রায় বাকি আড়াই শতক জমি বুঝিয়ে দিতে টালবাহানা শুরু করেন এবং তার ছেলে রাজেন্দ্র নাথ রায় রংপুর জোনাল সেটেলমেন্ট অফিসের কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করে ওই আড়াই শতক জমি নিজ নামে রেকর্ড করে নেন। পরে নজরুল ইসলাম ৩০ ধারায় সেটেলমেন্ট অফিসে মামলা করে পক্ষে রায় পেলেও গোপনে রাজেন্দ্র নকশা পরিবর্তন করে ওই আড়াই শতক তার জমির মধ্যে রয়েছে দেখান। সেটেলমেন্ট অফিসে জমি নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি না হওয়ায় নজরুল ইসলাম মিঠাপুকুর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতে মামলা করেন। এতে ওই আড়াই শতক জমির ওপর অবৈধভাবে নির্মাণকাজ বন্ধ করার নির্দেশ দেন আদালত। আদালতের নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে সেখানে পাকা ঘরসহ সীমানা প্রাচীর নির্মাণ করেন রাজেন্দ্র। এতে নজরুল ইসলাম আবার মিঠাপুকুর আদালতে মামলা করেন। এরপর ১১ বছর কেটে গেলেও তার জমিসংক্রান্ত বিরোধের নিষ্পত্তি হয়নি।

নজরুল ইসলাম বলেন, আদালতে জমি নিয়ে বিরোধের অনেক মামলা পড়ে রয়েছে। একজন বিচারকের পক্ষে এতসংখ্যক মামলা নিষ্পত্তি করা সম্ভব নয়। তাই বিচারকের সংখ্যা দ্রুত বাড়ানো উচিত।

আদালত চত্বরে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক ব্যক্তি বলেন, জমি নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তি করা কোনোকালেই সম্ভব নয়। টাকা ও পেশিশক্তি যার আছে, জমি তার। কোর্টের পেশকার, পিওন টাকা ছাড়া নথি নড়ান না। মামলাসংক্রান্ত কোনো কাগজ দেখাতে চান না। এছাড়া সেটেলমেন্ট অফিসে সীমাহীন দূর্নীতি হয়। সার্ভেয়াররা টাকার বিনিময়ে আমার ঘরের ওপর রাস্তার নকশা তুলে দিয়েছেন, জমির মাপজোকে কমবেশি করে দিচ্ছে। দুর্নীতিবাজ সার্ভেয়ার ও কর্মকর্তাদের নাম প্রকাশ করলে জমি নিয়ে তারা আরও হেনস্তা করবে, তাই ভয়ে কারও নাম বলতে পারি না। তাদের সম্পত্তি নিয়ে দুদক অনুসন্ধান করলে সব বেরিয়ে আসবে।

রংপুর সদরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) ছন্দা পাল জানান, ভূমি সেবা দিতে গিয়ে হিমশিম খাচ্ছি। জনবলের স্বল্পতা রয়েছে। এছাড়া সেবাগ্রহীতারা এখন পর্যন্ত সচেতন হয়নি, গ্রামের সাধারণ মানুষ দালালের খপ্পরে এখনও পড়ছে।

এদিকে মিঠাপুকুরের বালুয়া মাসিমপুর ইউনিয়নের বালুয়া ভূমি অফিসে ঘুষ ছাড়া কাজ হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে এলাকাবাসীর। উপজেলার বালুয়া মাসিমপুর ও ময়েনপুর ইউনিয়নের ভূমি অফিস বালুয়া মাসিমপুর বন্দরে অবস্থিত। দুটি ইউনিয়নের জমিজমা-সংক্রান্ত সব কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে থাকে এই ভূমি অফিস থেকে। দুই ইউনিয়নের কৃষক তাদের খাজনা দেওয়া, ই-নামজারি খারিজ, মাঠ পর্চাসহ সব ধরনের সেবা পেতে এখানে আসেন। একটি নামজারি (জমির খারিজ) করতে সরকারি খরচ হয় ১১০০ টাকা। কিন্তু ভূমি অফিসের সহকারী তহশিলদার সাইফুল ইসলাম জমি নামজারি খারিজ বাবদ ৬ থেকে ৮ হাজার টাকা নেন। এছাড়া মাঠ পর্চায় রেকর্ড রুমের কথা বলে ৬০০ টাকা আদায় করা হয়। বালুয়া মাসিমপুর এলাকার কৃষক বাবলু মিয়া, মশিয়ার রহমান, বুরু মিয়াসহ অনেকে বলেন, তহশিলদার সাইফুল ইসলাম স্থানীয় কিছু দালালের মাধ্যমে ভূমি সেবা নিতে আসা মানুষের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের টাকা নেন।

এ ব্যাপারে অভিযুক্ত তহশিলদার সাইফুল ইসলাম দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সম্পূর্ণ মিথ্যা। একটি কুচক্রী মহল তাকে নিয়ে ষড়যন্ত্র করছে।

উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) রোকসানা বেগম বলেন, বালুয়া মাসিমপুর ইউনিয়ন বূমি অফিসের সহকারী তহশিলদারের বিরুদ্ধে লোকমুখে নানা অনিয়মের অভিযোগ জানতে পেরেছি। লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত করে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রংপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, গত জুলাই পর্যন্ত জেলায় জমিসংক্রান্ত মামলা হয়েছে ৮ হাজার ৭২৬টি। এর মধ্যে আপিল মামলা ১১৬টি। রিট পিটিশন ও সিভিল রিভিশন মামলা হয়েছে ২৬০টি। এর মধ্যে রিট মামলা ১৩২টি এবং সিভিল মামলা ১২৮টি।

অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) শরীফ মুহম্মদ ফয়েজুল আলম বলেন, বর্তমান সরকারের আমলে ভূমি নিয়ে বিরোধ নিষ্পত্তিতে ব্যাপক অগ্রগতি হয়েছে। চেষ্টা করছি, ভূমি নিয়ে মানুষের হয়রানি কমিয়ে দ্রুত গ্রাহক সেবা নিশ্চিতের।

ইউনিটি ফর ইউনিভার্স হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশন অব বাংলাদেশ রংপুর বিভাগীয় কমিটির ভাইস চেয়ারম্যান জাভেদ ইকবাল সমকালকে বলেন, জমিসংক্রান্ত মামলা নিষ্পত্তির পেছনে ছুটতে ছুটতে অনেক মানুষ সর্বস্ব খোয়াচ্ছেন। আদালতের পেশকার, সেটেলমেন্ট কর্মকর্তা, দালালসহ পদে পদে টাকা খরচ করতে হচ্ছে সেবাগ্রহীতাদের। ভূমিসংক্রান্ত সমস্যা নিরসনে সংশ্নিষ্ট কার্যালয়গুলোতে যেমন পর্যাপ্ত জনবল নিয়োগ প্রয়োজন, তেমনি দুর্নীতি প্রতিরোধে কঠোর মনিটরিং ব্যবস্থা রাখতে হবে সরকারকে। তাহলেই ভূমি নিয়ে মানুষের দূর্ভোগ অনেকাংশে কমবে।