দেশের ১৩তম সিটি কর্পোরেশন হচ্ছে ফরিদপুর

প্রকাশ: ২১ অক্টোবর ২০১৯      

ফরিদপুর অফিস

ফরিদপুরবাসীর আনন্দমিছিল -সমকাল

বিভাগীয় সদর দপ্তর হিসেবে প্রতিষ্ঠার পর ফরিদপুর দেশের ১৩তম সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত হবে। সোমবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে প্রশাসনিক পুনর্বিন্যাস সংক্রান্ত জাতীয় বাস্তবায়ন কমিটির (নিকার) বৈঠকে এই প্রস্তাব নীতিগতভাবে অনুমোদন দেওয়া হয়। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত নিকারের বৈঠক শেষে মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম এ তথ্য জানান।

মন্ত্রিপরিষদ সচিব মোহাম্মদ শফিউল আলম জানান, ফরিদপুর সিটি কর্পোরেশন প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব শর্তসাপেক্ষে চূড়ান্ত অনুমোদন দিয়েছে নিকার। নীতিগত সিদ্ধান্ত হলো বিভাগীয় সদর দফতরই হবে সিটি কর্পোরেশন। ফরিদপুর এখনও বিভাগীয় শহর হয়নি। যখন বিভাগীয় শহর হবে তখন থেকেই ফরিদপুর সিটি কর্পোরেশন কার্যকর হবে।

এদিকে নিকারের বৈঠকে ফরিদপুর সিটি কর্পোরেশন অনুমোদনের সংবাদ ফরিদপুরে এসে পৌঁছালে হাজারো জনতা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের বাসভবন শহরের বদরপুরস্থ আফসানা মঞ্জিলে এসে জড়ো হন। 

বিভিন্ন স্লোগানের মাধ্যমে আনন্দ উচ্ছ্বাস প্রকাশ করে ফরিদপুরবাসী। ফরিদপুর সিটি কর্পোরেশন অনুমোদন হওয়ায় ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানান হাজারো মানুষ। এসময় মিষ্টি বিতরণও করা হয়।

আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় কমিটির সভাপতি ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, নিকারের মিটিংয়ে ফরিদপুর সিটি কর্পোরেশনের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। ফরিদপুর সিটি কর্পোরেশনের অনুমোদন দেওয়ায় প্রধানমন্ত্রীকে প্রাণঢালা অভিনন্দন জানাই। 

তিনি বলেন, মিটিংএ একই সঙ্গে ফরিদপুরকে পদ্মা বিভাগ করারও সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। পদ্মা বিভাগের হেড কোয়ার্টার হবে ফরিদপুর। একারণে আমার নিজের পক্ষ থেকে এবং ফরিদপুরবাসীর পক্ষ থেকে বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানাচ্ছি।

তিনি আরও বলেন, ফরিদপুরকে আমি উন্নয়নের মাধ্যমে দেশের মধ্যে অন্যতম জেলায় পরিণত করেছি। ফরিদপুর আরেকধাপ এগিয়ে গেলো। স্বাধীনতার পর ফরিদপুর তার যোগ্য মর্যাদায় আসিন হলো। 

এদিকে ফরিদপুর সিটি কর্পোরেশন অনুমোদন হওয়ায় সোমবার বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে আওয়ামী লীগ ও অঙ্গ সংগঠনের আয়োজনে বিশাল আনন্দ র‌্যালি বের করা হয়। র‌্যালিটি জেলা আওয়ামী লীগ কার্যালয় থেকে শুরু হয়ে মুজিব সড়ক প্রদক্ষিণ শেষে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে গিয়ে শেষ হয়। পরে উৎফুল্ল জনতার মাঝে মিষ্টি বিতরণ করা হয়। 

ফরিদপুর শহর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক চৌধুরী বরকত ইবনে সালাম বলেন, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা মন্ডলীর সদস্য ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় প্রধানমন্ত্রী ফরিদপুরবাসীর আরেকটি প্রাণের দাবি পূরণ করেছেন। এজন্য এ শহরবাসী প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞ। নাগরিকরা এ জন্য আজীবন প্রধানমন্ত্রীকে তাদের হৃদয়ে ধরে রাখবে। 

ফরিদপুর প্রেস ক্লাবের সভাপতি মো. ইমতিয়াজ হাসান রুবেল বলেন, ফরিদপুর শহর এখন উন্নয়নের নতুন যুগে প্রবেশ করল। ভবিষ্যতে এ শহর হবে দেশের অন্যতম একটি আধুনিক ও নাগরিক সুবিধাসংবলিত শহর। 

এ ঘটনায় সাধারণ নাগরিকদের মাঝেও আনন্দ ও উচ্ছ্বাস চোখে পড়ে। ব্যবসায়ী নেতা নজরুল ইসলাম বলেন, এ অনুমোদনের জন্য ফরিদপুরবাসী অপেক্ষায় ছিল। অবশেষে সেই স্বপ্নের দিন আজ এসেছে।

ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক ঝর্ণা হাসান বলেন, ফরিদপুরবাসীর জন্য আজ বড় খুশির দিন, আনন্দের দিন। 

ফরিদপুর শহর আওয়ামী লীগের সভাপতি খন্দকার নাজমুল ইসলাম লেভী বলেন, ফরিদপুরবাসী আরো একধাপ এগিয়ে গেল। 

জানা যায়, ফরিদপুর পৌরসভাকে সিটি কর্পোরেশনের উন্নীত করার প্রস্তাব স্থানীয় সরকার বিভাগের সংশ্লিষ্ট শাখা থেকে গত ১৪মে নতুন উপজেলা ও থানা স্থাপন সংক্রান্ত সচিব কমিটিতে পাঠানো হয়। মন্ত্রিপরিষদ সচিব ওই কমিটির প্রধান। গত ১ আগস্ট বুধবার সচিব কমিটির সভায় ফরিদপুর সিটি কর্পোরেশন গঠনের বিষয়ে আলোচনা হয়। ওই সভায় ফরিদপুরকে সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার সুপারিশ করে সচিব কমিটি। 

ইতিপূর্বে দেশের অন্য যেসব সিটি কর্পোরেশন গঠন করা হয়েছে সেগুলোর ক্ষেত্রে আগে নিকার সভায় সিটি কর্পোরেশনের প্রস্তাব অনুমোদন করা হয়। পরে সিটি কর্পোরেশনের জন্য এলাকা সম্প্রসারণ করা হয়। কিন্তু ফরিদপুর সিটি কর্পোরেশন করার ক্ষেত্রে এলাকা সম্প্রসারণ থেকে শুরু করে অন্যান্য সব প্রয়োজনী কাজ সম্পন্ন করে তবেই প্রস্তাব পাঠানো হয় সচিব কমিটির কাছে।

স্থানীয় সরকার (সিটি কর্পোরেশন) প্রতিষ্ঠা বিধিমালা ২০১০-এর বিধি ৪ এর শর্ত অনুযায়ী একটি সিটি কর্পোরেশন গঠন করতে হলে আটটি শর্ত পূরণ করতে হয়। যার সবগুলোই ফরিদপুরের ছিল। এগুলোর মধ্যে ন্যূনতম আয়তন হতে হয় ২৫ বর্গ কিলোমিটার। প্রস্তাবিত ফরিদপুর সিটি কর্পোরেশনের আয়তন হচ্ছে ৬৬ দশমিক ৫৪ বর্গ কিলোমিটার। ফরিদপুর পৌরসভায় জনসংখ্যা আছে ৫ লাখ ৫৭ হাজার ৬৩২ জন। সিটি কর্পোরেশন করতে হলে জনসংখ্যা থাকতে হয় কমপক্ষে চার লাখ। প্রস্তাবিত সিটি কর্পোরেশনের স্থানীয় বার্ষিক আয়ের উৎস থাকতে হবে কমপক্ষে ৫ কোটি টাকা। ফরিদপুরে স্থানীয় বার্ষিক আয়ের উৎস হচ্ছে ২০ কোটি ৪ লাখ ৯১ হাজার ৩৭৮ টাকা। 

প্রস্তাবিত সিটি এলাকায় শিল্পপ্রতিষ্ঠান থাকা বাধ্যতামূলক এবং সেটি বাণিজ্যিকভাবে গুরুত্বপূর্ণও হতে হবে। প্রস্তাবিত ফরিদপুর সিটি কর্পোরেশনে ছোট-বড় মিলিয়ে শিল্পপ্রতিষ্ঠান আছে ২২৫টি। সিটি কর্পোরেশন গঠনের শর্ত অনুযায়ী ফরিদপুরে ভৌত অবকাঠামো সুবিধাও রয়েছে। বিদ্যমান পৌরসভার বার্ষিক আয় হতে হবে কমপক্ষে ১০ কোটি টাকা। সেখানে ফরিদপুর পৌরসভার বর্তমান বার্ষিক আয় ৫১ কোটি ৩৫ লাখ ৬৫ হাজার ৩৯৫ টাকা। সিটি কর্পোরেশন গঠনের বিষয়ে স্থানীয় জনমতও এর অনুকূলে ছিল। 

সিটি কর্পোরেশনে উন্নীত করার লক্ষ্যে বিদ্যমান ফরিদপুর পৌরসভার সঙ্গে আরও আটটি ইউনিয়নের ৪৩টি মৌজা অন্তর্ভুক্ত করে ফরিদপুর পৌরসভাকে সম্প্রসারণ করা হয়। যেসব ইউনিয়নের মৌজা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে সেগুলো হচ্ছে কৈজুরী, গেরদা, আলিয়াবাদ, ডিক্রিরচর, অম্বিকাপুর, কৃষ্ণনগর, মৃগী, কানাইপুর এবং মাচ্চর ইউনিয়ন। স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে ফরিদপুর সিটি কর্পোরেশনের সীমানা নির্ধারণ, জনমত যাচাইসহ সব কাজ শেষ করে স্থানীয় প্রশাসন।