অহিংসার বাণী শুধু পাথরেই

সরেজমিন ভোলা

প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

রাজীব নুর, ভোলা থেকে

'হিংসা ছাড়রে ভাই/মসজিদ-মন্দিরে প্রভেদ কিছু নাই/উভয়স্থলই ভক্তগণের/উপাসনার ঠাঁই।' যে মন্দিরের মেঝেতে কথাগুলো লিখে রাখা হয়েছে, সেই মন্দিরেই প্রতিমাগুলোর মাথা ভেঙে দেওয়া হয়েছে গত রোববার। অহিংসার বাণী শুধু পাথরেই লেখা, মনে পায়নি স্থান। মন্দির-আশ্রমের সাইনবোর্ডটি ভাসছে মন্দিরেরই পুকুরে। পাশের হিন্দুদের বাড়িঘরে করা হয়েছে ব্যাপক ভাংচুর।

স্থানীয়দের কাছে মন্দিরটি বাউল বাড়ির মন্দির নামে পরিচিত। তবে মন্দিরের সেবায়েত সত্যপ্রসাদ দাসের ছেলে জানালেন, ভাওয়াল বাড়ি স্থানীয়দের কাছে দিনে দিনে বাউল বাড়ি নামে পরিচিতি পেয়েছে। অচ্যুতানন্দ ব্রহ্মচারীর অনুসারীরা এই মন্দিরটি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মুক্তিযুদ্ধের পরপর। হিন্দুদের কাছে অচ্যুতানন্দের ডাক নাম অনুসারে 'অনিল বাবাজী'র মন্দির নামেই পরিচিত এটি। একদা এখানে ভাওয়াল অঞ্চলের কিছু মানুষের বসবাস ছিল। তাই হিন্দু মহল্লাটি ভাওয়াল বাড়ি নামে পরিচিত। সত্যপ্রসাদ এখানে জমি কিনে থিতু হয়েছেন ১৯৭৩ সালে। তাদের আদিবাড়ি শরীয়তপুরের নড়িয়ায়। তবে সত্যপ্রসাদের ঠাকুরদা (পিতামহ) নড়িয়ার পাট চুকিয়ে এসে বসত গড়েন বোরহানউদ্দিনে। ঠাকুরদার বাড়িটি ভাওয়াল বাড়ি থেকে খুব দূরে নয়। এই বোরহানউদ্দিনেই সত্যপ্রসাদের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। দীর্ঘদিন শিক্ষকতা করেছেন বোরহানউদ্দিন স্কুলে। স্থানীয় সাংসদ থেকে পৌর মেয়র সবাই তার সরাসরি ছাত্র। বোরহানউদ্দিন থানা থেকে মাত্র তিনশ' গজ দূরে অবস্থিত মন্দিরসংলগ্ন পুকুরঘাটে বসে সেসব কথা জানালেন সত্যপ্রসাদের ছেলে সঞ্জয় কুমার দাস। সত্যপ্রসাদ যে বছর ভাওয়াল বাড়িতে এসে উঠলেন, সে বছরই জন্ম হয় সঞ্জয়ের।

ছোটবেলাটা বেশ ভালোই কেটেছে- বলছিলেন সঞ্জয়। সংকটের শুরু হয় ১৯৯২ সালে। তখন তিনি সদ্য কলেজে ভর্তি হয়েছেন। কোথাকার বাবরি মসজিদ কে বা কারা ভেঙেছে জেনে তারই বন্ধুরা মিছিল বের করেছিল, 'একটা একটা হিন্দু ধর, ধইরা ধইরা জবাই কর।' সে বছর ডিসেম্বরের ৬ তারিখের ওই দিনটি জীবনে ভুলতে পারবেন না সঞ্জয়। তখন তাদের অনিল বাবাজীর মন্দিরে ছিল কালীপ্রতিমা। হামলার ভয়ে প্রতিমা বিসর্জন দিয়ে এসেছিলেন আগেভাগে। তবু রক্ষা হয়নি। মন্দিরের পুরো কাঠামোটাই গুঁড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল তখন। তারপর মন্দিরটি আবারও গড়া হয়েছে। ২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনের পরও বহু আতঙ্কের দিন গেছে তাদের। নির্যাতন-নিপীড়ন দেখেছেন চোখের সামনে। তবে এবারের ঘটনার জন্য একটুও প্রস্তুত ছিলেন না।

সঞ্জয় বলছিলেন, 'শুক্রবারই শুনেছিলাম বিপ্লব নামে এক হিন্দু ছেলে ধর্মীয় অবমাননাকর কথাবার্তা বলেছে ফেসবুক মেসেঞ্জারে। পরে জানলাম বিপ্লবের ফেসবুক হ্যাক হয়েছে এবং হ্যাকারদেরও ধরা হয়েছে। তারা মুসলমান। ডাকবাংলোর কাছে তৌহিদী জনতার সমাবেশ ডাকা হয়েছে, শোনার পরও ভয়ের কোনো কারণ আছে মনে করিনি।' অবশ্য তিনি এটাও বলেন, 'বিপ্লব যদি অপরাধ করে থাকে, তার বিচার হবে। হিন্দুদের সবার ওপর কেন হামলা করা হবে?'

সঞ্জয় তখন বাড়ি ছিলেন না। তাই ঘটনা সম্পর্কে জানাবার জন্য নিয়ে যান বাড়ির ভেতরে তার মা অঞ্জু রানী দাস ও বাবা সত্যপ্রসাদ দাসের কাছে। অঞ্জু রানী বলেন, 'আমি মন্দিরে পূজা দিয়ে ঘরে ফিরেছি। সঞ্জয়ের বাবা স্নান সেরে ঘরে ফিরেছেন আহ্নিকে বসবেন বলে। এর মধ্যেই মন্দিরে হামলা হয়। একদল মন্দিরে ভাঙচুর করতে থাকে। অন্যরা এসে বাড়িতে ঢোকে। বাড়ির সামনের দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলাম আমরা।'

হামলাকারীদের তাণ্ডবের চিহ্ন ছড়িয়ে আছে এখনও ওই বাড়িতে। ভাঙা জানালা, টুকরো করা আসবাব ছড়িয়ে আছে। সত্যপ্রসাদ বলেন, 'আমি ছিলাম ঘরের সামনের অংশে। পরনে ছিল গামছা। লুঙ্গি পরব বলে মাথা গলিয়েছি, তখনই টের পেলাম হামলাটা। খানিকক্ষণ কী করব বুঝতে না পেরে, লুঙ্গিতে মাথা গলিয়ে বসে ছিলাম।'

সত্যপ্রসাদ জানালেন, একসময় হুঁশ আসে তার। তিনি পেছনের ঘরে গিয়ে দেখেন জানালা ভাঙা। ভয়ে কাঁপছে তার দুই নাতনি ছয় বছরের শ্রীময়ী আর দেড় বছরের সিঁথি। তিনি হাতজোড় করে হামলাকারীদের কাছে ক্ষমা চান। ক্ষমা ওরা করেনি। অশীতিপর এই বৃদ্ধকে মারধরও সইতে হয়েছে।

শ্রীময়ী শুয়ে ছিল ভাঙা জানালার ধারে। বালিশে মুখ গুঁজে। 'কী খবর তোমার'- জিজ্ঞেস করতেই বলল, 'ভয় লাগছে, অনেক ভয়।'

পরে অবশ্য শ্রীময়ী তার ঠাকুরদার সঙ্গে মন্দির পর্যন্ত এলো। এই মন্দিরে প্রতিবছর কার্তিকের প্রথম দিন থেকে দামোদর ব্রত পালিত হয়। এবারও শুরু হয়েছিল ব্রত। বিঘ্ন ঘটায়- ছোট পরিসরে বাড়ির ভেতরেই ব্রতের অংশ হিসেবে গীতাপাঠ ও নামকীর্তন করা হচ্ছে।

সত্যপ্রসাদের পাশের ঘরটিতে পরিবার-পরিজন নিয়ে থাকেন রাজীব চন্দ্র দে। রাজীব চন্দ্রের ঘর তালাবদ্ধ। ঘরের সামনে রাখা আছে পুড়িয়ে দেওয়া মোটরসাইকেল এবং ভাংচুর করা আসবাবপত্র। একটু এগোতেই চোখে পড়ল নারায়ণ চন্দ্রের বাড়ি। তার বাড়িটিরই ক্ষতি হয়েছে সবচেয়ে বেশি। সামর্থ্যের বিবেচনায় তিনিই সবার পেছনে পড়ে থাকা মানুষ। স্পষ্ট করে কথা বলতে পারেন না। প্রতিবন্ধী এই মানুষটি বললেন, 'সাহায্য-সহযোগিতা না পেলে ঘর বানাতে পারব না আর।'

পূজা উদযাপন পরিষদ বোরহানউদ্দিন উপজেলা শাখার সভাপতি অনিল চন্দ্র দাস বলেন, 'ঘর হয়তো বানানোর ব্যবস্থা করা যাবে। এই মানুষগুলোর মন যে ভাঙল, তার কী হবে?' তিনি ১৯৯২ থেকে ঘটে যাওয়া একের পর এক সাম্প্রদায়িক সহিংসতার কথা উল্লেখ করে বলেন, 'বারবার আক্রান্ত হচ্ছি আমরা। তবে এবার প্রশাসন এবং জনপ্রতিনিধিরা যথেষ্ট তৎপর। আশা করছি আর অপ্রীতিকর কিছু ঘটবে না।'

ফেসবুক মেসেঞ্জারে বিপ্লব চন্দ্র শুভ নামে এক ছেলের বিভ্রান্তিকর একটি পোস্ট নিয়ে রোববার বোরহানউদ্দিনে পুলিশের সঙ্গে 'তৌহিদী জনতা'র সংঘর্ষে গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যায় চারজন। ওই ঘটনা যখন চলছিল, তখনই হামলা হয় এই ভাওয়াল বাড়িতে। সেই থেকে ভোলার সর্বত্রই আতঙ্কে কাটছে সংখ্যালঘুদের দিন।