প্রতিবন্ধী ৪ মেয়েকে নিয়ে বৃদ্ধ বাবার লড়াই

প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০১৯     আপডেট: ২৪ অক্টোবর ২০১৯      

ফুলবাড়িয়া (ময়মনসিংহ) প্রতিনিধি

বাড়ির আঙিনায় পাটি বিছিয়ে বসে আছে চার বোন -সমকাল

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাধাকানাই ইউনিয়নের চৌরঙ্গীপাড় গ্রামে এক দরিদ্র পরিবারের ৫ কন্যা সন্তানের মধ্যে ৪ জনই শারীরিক প্রতিবন্ধী হওয়ায় পরিবারটি মানবেতর জীবনযাপন করছে।

হতদরিদ্র দিনমুজুর ইব্রাহিম আলীর (৭০) প্রতিবন্ধী চার কন্যা পারভীন আক্তার (৩৫), বিউটি আক্তার (২০), তাপুসি (১৫) ও শাবনুর (১১)। তাদের মা শামছুন্নারও মানসিক প্রতিবন্ধী। 

সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, রাধাকানাই ইউনিয়নের চৌরঙ্গীপাড় গ্রামে বাঁশঝাড়ের নিচে ২০ হাতের একটি খুপড়ি ঘরে প্রতিবন্ধী মেয়েদের নিয়ে বাবা-মাকে কোন রকমে পড়ে থাকতে হয়।

সামনে ছোট পরিসরের সেঁতসেঁতে আঙিনা। এখানেই পাটি বিছিয়ে বসে আছেন পারভীন, বিউটি, তাপসী ও শাবনূর। এদের কেউই হাঁটতে পারেন না, গড়িয়ে গড়িয়ে চলাফেরা করতে হয় তাদের। এভাবে চলতে চলতে ৪ বোনের শরীরে কালচে দাগ হয়ে গেছে, থেঁতলে গেলে পায়েল আঙ্গুলগুলো। 

এক বোন বিউটি আক্তার কথা বলতে পারলেও অন্যরা ঠিকমতো কথাও বলতে পারেন না। জমিজমা নেই তাদের। বসত ভিটাটুকুই একমাত্র সম্বল। মানসিক ভারসাম্যহীন মা যেন থেকেও নেই। বেশিরভাগ সময়ই বাবার বাড়িতে কাটান তিনি। একটু মনমালিন্য হলেই চলে যান বাপের বাড়ি। সকাল থেকে রাত মেয়েদের সেবাযত্ম নিতে ব্যস্ত থাকতে হয় ইব্রাহীম মিয়ার।

একমাত্র উপার্জনক্ষম হতদরিদ্র পিতা দিনমজুর ইব্রাহিম আলী অন্যের কাজ করে সংসার চালান। প্রতিবন্ধী চার কন্যার দেখভালের কারণে এখন ঠিকমতো কোন কাজেও যেতে পারছেন না। প্রতিবন্ধী মেয়েদের  গোসল, খাওয়া-দাওয়া, প্রকৃতির কাজ সব কিছুই সামলাতে হয় ইব্রাহিমের। তিন মাস পরপর পাওয়া ২ মেয়ের প্রতিবন্ধী ভাতা ও মানুষের আর্থিক সহায়তায় অর্ধহারে অনাহারে চলে তাদের দিন।

প্রতিবন্ধী বিউটি আক্তার বলেন, আমরা অসহায় ও দুঃখী মানুষ। খেয়ে না খেয়ে বেঁচে আছি। এখন অন্যের সহযোগিতা ছাড়া আমাদের বেঁচে থাকাই দায় হয়ে পড়েছে। 

বিউটি বলেন, আব্বার কষ্ট সহ্য করতে পারি না। এখন আব্বার বয়স হয়েছে। আমাদের টানা হেঁচড়া করতে তার কষ্ট হয়। বাড়িতে টিউবওয়েল নাই, আব্বা দূরের পুকুর থেকে বালতিতে করে পানি নিয়ে এসে আমাদের গোসল করায়। তার এই কষ্ট দেখে মরে যেতে ইচ্ছা হয়। সরকার যদি আমাদের দেখাশুনার কোন ব্যবস্থা করে দিত, তাহলে আব্বার কষ্ট কমে যেত।

ইব্রাহিম আলী বলেন, জন্মের এক বছর পর থেকে সন্তানদের হাত বাঁকা হয়ে আস্তে আস্তে ওদের শরীরে শক্তি হারিয়ে ফেলে। মানুষের কাজ করে যা আয় করেছি, সেটা দিয়ে অনেক চিকিৎসা করিয়েছি। এরপরও কোন কাজ হয়নি। ডাক্তররা বলেছে ভালো হবে না। ৫টি মেয়ের মধ্যে চারজনই প্রতিবন্ধী। সরকার যে টাকা ভাতা দেয় এতে ওদের খাবার দাবার হয় না। আগের দিন কাজ করলে পরের দিন আমি অসুস্থ হয়ে যাই। যতদিন বেঁচে থাকি ততোদিন তাদের দেখাশোনা করে যাবো। কিন্তু আমি মরে গেলে এদের কি হবে? 

উপজেলা সমাজ সেবা কর্মকর্তা মো. এহছানুল হক বলেন, পরিবারটির খোঁজ খবর নিয়ে মানবিক দিক বিবেচনা করে দুই প্রতিবন্ধী মেয়েকে ভাতা দেয়ার ব্যবস্থা হয়েছে। অন্য দুজনেরও ভাতার ব্যবস্থাসহ সরকারি সুযোগ সুবিধার ব্যবস্থা করা হবে।