স্বামীর নির্যাতনের রোমহর্ষক বর্ণনা দিলেন এক আইনজীবী

প্রকাশ: ০৫ নভেম্বর ২০১৯      

 মানিকগঞ্জ প্রতিনিধি

আইনজীবী কামরুন্নাহার সেতু

'ও আমাকে প্রতিদিন মারতো। পুতা দিয়ে আঘাত করত, যাতে কেউ মারধরের আওয়াজ না পায়। আমার সারা শরীর থেঁতলে গেছে ওই আঘাতে। যন্ত্রণা সহ্য করতে না পেরে আত্মহত্যারও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম। সে সুযোগও পাইনি। সেখান থেকে জীবিত ফিরতে পারব সে আশা ছেড়েই দিয়েছিলাম।' বিয়ের এক মাসের মধ্যে প্রতারক স্বামীর ১৫ দিনের বন্দিদশা থেকে ফিরে এসে এভাবেই তার ওপর নির্যাতনের বর্ণনা দিলেন মানিকগঞ্জ জেলা জজকোর্টের আইনজীবী কামরুন্নাহার সেতু। সোমবার রাতে তিনি সদর থানায় প্রতারক স্বামী শাওন মিয়ার বিরুদ্ধে মামলা করেছেন।

মামলার এজাহার থেকে জানা যায়, মানিকগঞ্জের হরিরামপুর উপজেলার আজিমনগর গ্রামে শাওন মিয়ার সঙ্গে আইনজীবী কামরুন্নাহার সেতুর পরিচয় হয়। গত ৯ সেপ্টেম্বর তারা গোপনে বিয়ে করেন। গত ১৭ অক্টোবর মানিকগঞ্জ আদালত থেকে সেতুকে নিজের ব্যক্তিগত গাড়িতে করে নবীনগর কহিনুর গেটে নিয়ে যায় শাওন। সেখানকার তুনু হাজির ছয়তলা বাড়ির চারতলার একটি কক্ষে নিয়ে রাখেন তাকে। প্রথম দু'দিন সেতুর সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে সে। তৃতীয় দিন সেতুর মানিকগঞ্জ ডাকঘরে থাকা কয়েকটি হিসাব থেকে তাকে টাকা উঠিয়ে দিতে বলে। অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তিন দফায় ১৬ লাখ টাকা তুলে দিতে বাধ্য করে শাওন। এর দু'দিন পর আরও টাকা দাবি করে। আর টাকা নেই জানালে তার নামে থাকা জমি লিখে দিতে বলে। এতে রাজি না হওয়ায় শুরু হয় অমানুষিক নির্যাতন। কেড়ে নেওয়া হয় মোবাইল ফোন, জাতীয় পরিচয়পত্র ও ড্রাইভিং লাইসেন্স। এভাবে চলতে থাকে নির্যাতন।

মামলার এজাহারে সেতু আরও জানান, সর্বশেষ গত ২ নভেম্বর রাতে তাকে বেদম মারধর করা হয়। হত্যার হুমকি দেওয়া হয়। খুন করার জন্য রান্নাঘর থেকে বঁটি আনতে গেলে তিনি চিৎকার শুরু করেন। তা শুনে বাড়ির মালিক এসে তাকে তাদের ঘরে নিয়ে যান। পরের দিন বাবাবাড়িতে দিয়ে আসার কথা বলে শাওন অস্ত্রের ভয় দেখিয়ে তাকে ঢাকায় নিয়ে যায়। চিকিৎসার নামে একটি হাসপাতালে নিয়ে ইনজেকশন দিয়ে মেরে ফেলার পরিকল্পনা করে শাওন। ওই ঘটনায় হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পুলিশকে খবর দিলে সেখান থেকে পালিয়ে যায় শাওন।

জিম্মিদশা থেকে মুক্ত হয়ে মানিকগঞ্জে আসার পর কামরুন্নাহর সেতু আরও জানান, তার বাড়ি মানিকগঞ্জ সদর উপজেলার জাগীর ইউনিয়নের ঢাকুলী গ্রামে। আগের স্বামীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হওয়ার পর তিনি কলেজ পড়ুয়া ছেলেকে নিয়ে বাবার বাড়িতে থাকেন। তিনি ২০১৩ ও ২০১৪ সালে মানিকগঞ্জ জেলা আইনজীবী সমিতির নির্বাচনে সর্বোচ্চ ভোট পেয়ে সদস্য হন। স্বামীর সঙ্গে বিয়ে বিচ্ছেদের সুযোগে তার সঙ্গে শাওন প্রেমের সম্পর্ক গড়ে তোলে। কিন্তু সে যে একজন পেশাদার প্রতারক তা তার জানা ছিল না।

কামরুন্নাহার সেতুর বাবা মো. সফিউদ্দিন বলেন, মেয়ে নিখোঁজ হওয়ার পর শাওন তাকে ফোন করে মেয়েকে দিয়ে ৫ লাখ টাকা চায়। না দিলে তাকে হত্যা করার হুমকি দেয়। তিনি গত ৩ নভেম্বর মানিকগঞ্জ থানায় শাওনের বিরুদ্ধে অপহরণ মামলা করেন।

সদর থানার ওসি (তদন্ত) হানিফ সরকার বলেন, মঙ্গলবার বিকেলে নির্যাতনের শিকার ওই আইনজীবী আদালতে ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে জবানবন্দি দিয়েছেন। সন্ধ্যায় তাকে চিকিৎসার জন্য মানিকগঞ্জ ২৫০ শয্যা হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। অভিযুক্ত শাওনকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে।