দুর্গেই দুর্দিন বিএনপির

চট্টগ্রামে দল ছাড়ছেন হেভিওয়েট নেতারা

প্রকাশ: ০৮ নভেম্বর ২০১৯     আপডেট: ০৮ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

বিএনপির দুর্গ হিসেবে পরিচিত চট্টগ্রামেই দুর্দিন শুরু হয়েছে বিএনপির। এখানে বিএনপি ছাড়ছেন একের পর এক হেভিওয়েট রাজনীতিবিদ। চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা থাকাকালেই বিএনপি ছেড়েছিলেন সাবেক মেয়র এম মনজুর আলম। এর পর মিরসরাই থেকে এমপি ভোটে দাঁড়ানো শিল্পপতি কামাল উদ্দিনও ছাড়েন বিএনপির রাজনীতি। সর্বশেষ এ তালিকায় যুক্ত হয়েছে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোর্শেদ খানের নাম।


কেউ কেউ আবার দলের সঙ্গে একেবারে সম্পর্কচ্ছেদ না করলেও মান-অভিমানে নিষ্ফ্ক্রিয় হয়ে আছেন দীর্ঘদিন। দলে যথাযথভাবে মূল্যায়িত না হওয়ার কারণে বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ আবদুল্লাহ আল নোমান বিএনপি একেবারে না ছাড়লেও ব্যবহার করছেন না দলীয় পদবি ভাইস চেয়ারম্যান। একইভাবে নিষ্ফ্ক্রিয় হয়ে আছেন ভাইস চেয়ারম্যান পদ পাওয়ায় নাখোশ নেতা গোলাম আকবর খোন্দকার এবং নগর বিএনপির সাবেক সহসভাপতি শিল্পপতি শামসুল আলমও।

২০১৫ সালের এপ্রিলে বিএনপি ছাড়ার পাশাপাশি রাজনীতি ছেড়ে দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছিলেন সাবেক মেয়র এম মনজুর আলম। সে বার মেয়র নির্বাচনের দিন ব্যাপক ভোট কারচুপির অভিযোগে তিন ঘণ্টার মাথায় প্রার্থিতা থেকে সরে দাঁড়ান তিনি। দলের নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধেও এ সময় ক্ষোভ প্রকাশ করেন তিনি। ওই নির্বাচনে তিন লাখ চার হাজার ৮৩৭টি ভোট পেয়েছিলেন তিনি। প্রসঙ্গত, মনজুর আলম বিএনপির টিকিটে মেয়র নির্বাচন করে ২০১০ সালে টানা তিনবারের নির্বাচিত মেয়র প্রয়াত এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরীকে লক্ষাধিক ভোটের ব্যবধানে হারিয়ে রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন।

২০১৫ সালে দল ও রাজনীতি ত্যাগের ঘোষণার পর দীর্ঘদিন নীরব ছিলেন মনজুর আলম। তবে বছরখানেক পর বিএনপির রাজনীতি ছেড়ে আওয়ামী লীগে যুক্ত হন তিনি। সর্বশেষ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ থেকে সীতাকুণ্ড আসনে মনোনয়নও পান। কিন্তু একই আসনে মনজুর আলমের নিজ ভাতিজা দিদারুল আলম সম্ভাব্য প্রার্থী তালিকায় থাকায় সেখান থেকে নির্বাচন করতে অপারগতা জানান তিনি। নগরীর ডবলমুরিং-পাহাড়তলী আসন থেকে মনোনয়ন চেয়েছিলেন তিনি। তবে পাননি মনোনয়ন। আসন্ন মেয়র নির্বাচনে আওয়ামী লীগের সম্ভাব্য প্রার্থী হিসেবে নাম শোনা যাচ্ছে তার।

এ প্রসঙ্গে কথা বলতে গেলে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান মনজুর আলম। তিনি বলেন, 'রাজনীতির চেয়ে সমাজসেবা করতে বেশি পছন্দ করি। এটাতে আনন্দও পাই বেশি। তাই ধ্যান-জ্ঞানে আছে কেবল সমাজসেবা।'

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ে বিএনপির রাজনীতিতে এক সময় অপরিহার্য নাম ছিল এমডিএম কামাল উদ্দিন। ২০০৮ সালের সংসদ নির্বাচনে তিনি মিরসরাই থেকে ধানের শীষ প্রতীকে নির্বাচনও করেন। তবে হেরে যান আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের কাছে। ২০১৪ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ না নিলেও মিরসরাইয়ে হেভিওয়েট প্রার্থী হিসেবে ছিলেন কামাল উদ্দিন। কিন্তু এ নির্বাচনের পরই দলের সঙ্গে সম্পর্ক চুকিয়ে ফেলেন এ শিল্পপতি। মিডিয়ায় এমন বক্তব্যও দেন যে, বিএনপির সঙ্গে তার কোনো সম্পর্ক নেই। প্রকাশ্যে কোনো পদত্যাগপত্র না দিলেও এ শিল্পপতি বিএনপির সঙ্গে সম্পর্কের ইতি টেনেছেন নীরবেই।

এ প্রসঙ্গে মিরসরাই উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শাহিদুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, 'গত চার বছর দলীয় কোনো কর্মসূচিতে অংশ নেননি কামাল উদ্দিন চৌধুরী। বিএনপির দিবসভিত্তিক কোনো অনুষ্ঠানেও উপস্থিত হচ্ছেন না। সর্বশেষ সংসদ নির্বাচনেও বিএনপি থেকে আর মনোনয়ন চাননি তিনি।'

বিএনপি ত্যাগের তালিকায় সম্প্রতি যুক্ত হয়েছে সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোর্শেদ খানের নাম। দলের মহাসচিবের কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগপত্র জমা দিয়েছেন তিনি। অথচ অনেকেরই ধারণা, চট্টগ্রামের বোয়ালখালী-চান্দগাঁও আসনে এখনও বিএনপির রাজনীতিতে অপরিহার্য নাম মোর্শেদ খান। দলীয় রাজনীতিতে দীর্ঘদিন নিষ্ফ্ক্রিয় থাকলেও পারিবারিক পরিচয় ও ব্যক্তিগত ইমেজের কারণে এলাকায় স্বতন্ত্র একটি অবস্থান আছে তার। এ আসন থেকে তিনি যতবার নির্বাচন করেছেন, ততবারই বিজয়ী হয়েছেন। মোর্শেদ খান সর্বপ্রথম এমপি নির্বাচিত হয়েছিলেন ১৯৮৬ সালে। ১৯৯১ সালে তিনি বিএনপিতে যোগ দেন। এর পর চট্টগ্রাম-৮ (বোয়ালখালী-চান্দগাঁও) আসন থেকে বিএনপির টিকিটে তিনবার এমপি নির্বাচিত হন। ১৯৯২ থেকে ১৯৯৬ সাল পর্যন্ত পূর্ণমন্ত্রীর পদমর্যাদায় প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার বিশেষ দূত ছিলেন মোর্শেদ খান। একই সঙ্গে বাংলাদেশ স্পেশাল কমিটি অন ফরেন অ্যাফেয়ার্সের চেয়ারম্যানও ছিলেন। ২০০১ থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোট সরকারের আমলে পররাষ্ট্রমন্ত্রীর দায়িত্বও পালন করেন তিনি। অথচ সেই মোর্শেদ খানই এখন সম্পর্কচ্ছেদ করলেন বিএনপির সঙ্গে।

এ প্রসঙ্গে মোরশেদ খানের বক্তব্য জানতে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও সাড়া দেননি তিনি। তবে বিএনপি মহাসচিবের কাছে দেওয়া পদত্যাগপত্রে তিনি উলেল্গখ করেন, 'অনেকটা দুঃখ ও বেদনাক্রান্ত হৃদয়ে পদত্যাগের এ চিঠি।' ব্যক্তিগত কারণে তিনি পদত্যাগ করছেন বলে উল্লেখ করেন এ চিঠিতে।

এদিকে বিএনপির রাজনীতিতে অনেক পরে সক্রিয় হলেও ইতিমধ্যেই স্থায়ী কমিটির সদস্য হয়েছেন আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী- এমন উপেক্ষার কারণে এখন আর দলীয় পদবি ব্যবহার করছেন না আবদুলল্গাহ আল নোমান। তার সমর্থকদের মতে, চট্টগ্রামের রাজনীতিতে এককভাবে বিএনপিকে প্রতিষ্ঠা করেছেন নোমান। অথচ পদে পদে উপেক্ষিত তিনি। বড় বড় নেতা এভাবে দল ছাড়ায়, কেউ-বা নিষ্ফ্ক্রিয় হয়ে পড়ায় ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে বিএনপির রাজনীতি, দুর্বল হচ্ছে দলের সাংগঠনিক ভিত্তি।