বগুড়ার ভিআইপি প্রতারক

ব্যাংকের ৫০০ কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছে ওরা

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০১৯     আপডেট: ১২ নভেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ     

এস এম কাওসার বগুড়া

সম্পর্ক তৈরি করেন চতুরতার সঙ্গে। সুবোধ আচরণ আর অতি ভদ্রতা দেখে যে কেউ গলে যেতে বাধ্য। মাঝেমধ্যে ব্যাংক কর্তাদের জন্মদিনে পার্টির আয়োজন, দামি উপহার প্রদান, তিথিপর্বে নিমন্ত্রণ, এভাবে চলতে থাকে মাসের পর মাস। এমনকি বছরজুড়েও এমন আতিথেয়তা। কিন্তু এই সম্পর্কের আড়ালে লুকিয়ে থাকে তাদের অসৎ উদ্দেশ্য।

এমন মুখোশধারী ভদ্রবেশীরাই ব্যাংক থেকে কোটি কোটি টাকা ঋণ নিয়ে তা পরিশোধ না করে প্রতারণা করে চলেছেন। এমনকি কেউ শতকোটি টাকা নিয়ে লাপাত্তা হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। একসময় এসব ভদ্রবেশী মধুর সম্পর্ক স্থাপনকারী ভিআইপি প্রতারকরা ব্যাংক কর্তাদের পেছনে দিনের পর দিন ঋণের জন্য ঘুরেছেন, ঋণ পেয়ে তারা এখন ঘোরাচ্ছেন ব্যাংক কর্তাদের। ব্যাংক কর্তারা ধরনা দিয়ে কোনো ফল না পেয়ে আদালতের আশ্রয় নিয়েছেন। তবুও তাদের কাছ থেকে ঋণের টাকা তুলতে পারছেন না। ব্যাংকের টাকা পরিশোধ না করে বিলাসী জীবনযাপন করছেন, দামি গাড়ি ব্যবহার করছেন, মাঝেমধ্যেই বেড়াতে যান বিদেশে। খোঁজ নিয়ে বগুড়ায় এমন বেশ কিছু ভদ্রবেশী ঋণখেলাপি এবং ঋণের টাকা নিয়ে উধাও হওয়ার তথ্য পাওয়া গেছে। এদের কয়েকজনের কাছেই ব্যাংকের পাওনা প্রায় ৫০০ কোটি টাকা।

এদের মধ্যে জেলার দুপচাঁচিয়া উপজেলায় অবস্থিত জেএন ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক গোপাল আগরওয়াল (৫৫) এবং তার স্ত্রী মেসার্স শুভ ফিড প্রসেসিংয়ের স্বত্বাধিকারী দীপা আগরওয়াল (৪৫) ব্যবসা করে আসছিলেন দীর্ঘদিন থেকে। তারা স্থানীয় জনতা, সোনালী ও রাজশাহী কৃষি উন্নয়ন ব্যাংক থেকে প্রায় ২০ কোটি টাকা ঋণ নেন। ওই টাকায় শিল্পকারখানা পরিচালনা করছিলেন প্রায় পনেরো বছর ধরে। ব্যাংকের সঙ্গে সুসম্পর্ক তৈরি করে তারা যৎসামান্য সম্পত্তি মর্টগেজ রেখেই এই বিপুল পরিমাণ ঋণ নেন বলে অভিযোগ আছে। এভাবে চলার একপর্যায়ে এই দম্পতি এক বছর আগে সাউথইস্ট ব্যাংক নওগাঁ শাখায় ঋণের জন্য যোগাযোগ করতে থাকেন। অভিযোগ রয়েছে, এই দম্পতি ব্যাংক কর্তাদের মাঝেমধ্যে দামি উপহার, জন্মদিনে পার্টির আয়োজন করা ছাড়াও নানা তিথিপর্বে নিমন্ত্রণ করতেন। এভাবেই সম্পর্ক জোরালো করেন এবং বিশ্বস্ততা অর্জন করেন। তারা ওই ব্যাংক থেকে এক বছর আগে ১১৫ কোটি টাকা ঋণ নেন। এর বিপরীতে সম্পত্তি মর্টগেজ রাখেন মাত্র দেড় কোটি টাকার। ঋণ নেওয়ার পর থেকে ধীরে ধীরে ওই দম্পতি ব্যাংকের সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করতে থাকেন। ঋণের তিন কিস্তি দেওয়ার পর গত ছয় মাস হয় আর কোনো কিস্তি দেন না। ব্যাংক কর্তৃপক্ষ খোঁজ নিতে গিয়ে জানতে পারে, তারা ঋণের টাকা বিদেশে পাচার করেছেন এবং ওই দম্পতিও লাপাত্তা হয়ে গেছেন।

এ ঘটনায় গত ৯ অক্টোবর সাউথইস্ট ব্যাংক নওগাঁ শাখার প্রধান কর্মকর্তা কামারুজ্জামান থানায় ওই দম্পতির বিরুদ্ধে টাকা আত্মসাতের একটি অভিযোগ দায়ের করেছেন। অভিযোগ থেকে জানা গেছে, গোপাল আগরওয়ালকে ৮৪ কোটি ১৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা এবং তার স্ত্রী দীপা আগরওয়ালকে ৩০ কোটি ৮০ লাখ ১৪ হাজার মোট ১১৪ কোটি ৯৪ লাখ ২ হাজার টাকা ঋণ দেওয়া হয়।

প্রতারণার আরেক চমকপ্রদ ঘটনা হলো, একটি পরিবার তাদের সদস্যদের নামে বিভিন্ন ব্যাংক থেকে নানা কৌশলে প্রায় ২০০ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে ফেরত দিচ্ছে না। এরা হলেন- শহরের সেউজগাড়ী এলাকার জহুরুল হক মোমিন, তার স্ত্রী শিরিন আখতার ঝুনু, তার আপন ভাই এনামুল হক বাবু এবং বাবুর স্ত্রী আইরিন হক রুমা। মাহিন ফুড, রিমা ফ্লাওয়ার মিল, রিমা ট্রেডিংসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের নামে এই ঋণ নেন তারা। এদের মধ্যে শুধু জহুরুল হক মোমিনের বিরুদ্ধে অর্থঋণ আদালতে আটটি মামলা রয়েছে। এই আটটি মামলা থেকে জানা যায়, তার কাছে ইসলামী ব্যাংক, প্রাইম ব্যাংক ও সোস্যাল ইসলামী ব্যাংকসহ বিভিন্ন ব্যাংকের পাওনা দেড়শ' কোটি টাকারও বেশি। মোমিনের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে দায়ের করা এই মামলাগুলো সবগুলোরই বিচারকাজ সম্পন্ন হয়। এর মধ্যে ২৩৬/২০০৯ নং মামলায় ১ কোটি ২০ লাখ টাকা, ৮৮/২০০৯ নং মামলায় ২১ কোটি ৯৪ লাখ, ৮৯/২০০৯ নং মামলায় ৩০ কোটি ৮০ লাখ টাকা, ৪১৫/২০০৯ নং মামলায় ১০ কোটি টাকা, ৫১৮/২০০৯ নং মামলায় ১ কোটি ৫০ লাখ টাকা, ১২১/২০০৯ নং মামলায় ৫১ কোটি ৯৪ লাখ টাকা, ১২২/২০০৯ নং মামলায় ৩৬ কোটি ৮০ লাখ টাকা এবং ৪১৬/২০০৯ নং মামলায় তিন কোটি টাকা প্রদানের নির্দেশ দেন আদালত।

এদিকে, ব্যাংকের এসব মামলায় অর্থ আত্মসাৎ ও প্রতারণার অভিযোগে আদালত ২০১৩ সালের ৪ জুলাই জেলে পাঠান জহুরুল হক মোমিনকে। সাড়ে চার বছর কারাবাসের পর হাইকোর্টে ১০ লাখ টাকা জমা দিয়ে মুচলেকায় জামিনে ছাড়া পান তিনি। জামিনের সময় আদালতকে অঙ্গীকার দিয়েছিলেন, ব্যাংকের ঋণের টাকা তিনি ওই বছরের মধ্যেই পরিশোধ করবেন। কিন্তু এখনও ব্যাংকের টাকা ফেরত দেননি।

সোস্যাল ইসলামী ব্যাংক বগুড়া শাখা জহুরুল হক মোমিনের ভাই এনামুল হক বাবুর স্ত্রী আইরিন হক রুমার কাছে বর্তমানে পাওনা তিন কোটি ১৩ লাখ ৮৮ হাজার টাকা। এনামুল হক বাবুর কাছে পাওনা ছয় কোটি ৭৫ লাখ পাঁচ হাজার টাকা। তাদের বিরুদ্ধেও বিভিন্ন ব্যাংক থেকে একাধিক মামলা দায়ের করা হয়েছে।

ইসলামী ব্যাংকের দায়ের করা মামলা সূত্রে জানা যায়, জহুরুল হক মোমিনের স্ত্রী শিরিন আখতার ঝুনু তার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান শিরিন ট্রেডিং অ্যান্ড কোম্পানির নামে চার কোটি ৪৬ লাখ ৪৬ হাজার ৩১৬ টাকা ঋণ নিয়ে পরিশোধ করেননি। তার বিরুদ্ধেও একাধিক মামলা রয়েছে। এ বিষয়ে মামলা দায়ের করা হলে শিরিন আক্তার ঝুনুকে গ্রেফতার করতে আদালত তার নামে ওয়ারেন্ট ইস্যু করেন। পুলিশ ২০১৮ সালের ১১ জুন শিরিন আক্তার ঝুনুকে গ্রেফতার করে। তখন তিনি দ্রুত টাকা পরিশোধ করার অঙ্গীকার করে জামিন নিয়েছেন। পরে অর্ধেক টাকা পরিশোধের কথা বললেও এখনও কোনো টাকা পরিশোধ করেননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

ইসলামী ব্যাংক বগুড়া শাখার বিনিয়োগ বিভাগের প্রধান তৌহিদ রেজা জানান, মাহিন ফুডের মালিক জহুরুল হক মোমিনের কাছে ইসলামী ব্যাংকের পাওনা ৩১ কোটি ৮৩ লাখ ৭০ হাজার ৮৯০ টাকা। পাওনা আদায়ে মামলা করা হয়েছিল ব্যাংক থেকে। পুলিশ তাকে গ্রেপ্তার করলে আদালতে ১০ লাখ টাকা জমা দিয়ে মুচলেকা দিয়েছিলেন যে, বাকি টাকা এক বছরের মধ্যেই পরিশোধ করবেন। কিন্তু তিনি আদালতের কাছে দেওয়া ওয়াদা এখন পর্যন্ত রক্ষা করেননি। উল্টো তিনি ওই মামলার বিপরীতে হাইকোর্টে রিট করে সময় ক্ষেপণ করছেন। ইতোমধ্যে তিনি আদালতে রিট করেই ১০ বছর পার করেছেন। আদালত যতবারই ব্যাংকের পক্ষে রায় দেন, ততবারেই তিনি রিট করেন। ব্যাংকের ওই কর্মকর্তা আরও জানান, এরা ব্যাংকের টাকা পরিশোধ করছেন না, অথচ বিলাসিতা করছেন, দামি গাড়িতে ঘুরছেন এবং মাঝে মধ্যে বিদেশে বেড়াতে যাচ্ছেন। এদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনেও (দুদক) মামলা রয়েছে। তবুও তাদের বাগে আনা যাচ্ছে না।

ব্যাংক কর্মকর্তা তৌহিদ রেজা আরও বলেন, 'এদের এমন কী খুঁটির জোর আছে, যার কারণে ব্যাংকের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেও দোর্দণ্ড প্রতাপে ঘুরে বেড়াচ্ছেন!' তিনি অভিযোগ করে বলেন, 'এদের ব্যাংকে মর্টগেজ রাখা সম্পদ-সম্পত্তি একাধিকবার নিলাম করা হয়েছে, কিন্তু এদের প্রভাবের কারণে কেউ তাদের সম্পদ-সম্পত্তি কিনতে রাজি হন না বেদখল হয়ে যাওয়ার ভয়ে।' এ বিষয়ে তিনি সরকারের হস্তক্ষেপ আশা করছেন।

এসব অভিযোগের ব্যাপারে জানতে জহুরুল ইসলাম মোমিনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করার চেষ্টা করেও তাকে পাওয়া যায়নি, এমনকি তিনি ফোনও ধরেন না।

এদিকে শুধু ব্যবসায়ীরাই নয়, ব্যাংকের কিছু কর্মকর্তাও অর্থ আত্মসাতের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। এদের মধ্যে যেমন- বগুড়ায় ইসলামী ব্যাংকের প্রায় তিন কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ওই ব্যাংকের সাবেক দুই কর্মকর্তা ও এক ব্যবসায়ীকে পাঁচ বছর করে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। বগুড়ার স্পেশাল জজ আদালতের বিচারক চলতি বছরের ২৫ এপ্রিল এ রায় দেন। দণ্ডিতরা হলেন- ইসলামী ব্যাংকের বগুড়া শাখার সাবেক ম্যানেজার (বর্তমানে চাকরিচ্যুত) সারওয়ার আলম, ফরেন এক্সচেঞ্জ বিভাগের ইনচার্জ (বর্তমানে চাকরিচ্যুত) এরশাদ আলী ও মেসার্স রেজা অ্যান্ড কোম্পানির স্বত্বাধিকারী রেজানুর রহমান রেজা। রায়ে আত্মসাৎ করা টাকাও ফেরত দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

রূপালী ব্যাংক মহাস্থানগড় শাখায় গ্রাহকের নামে ভুয়া ঋণ উত্তোলন দেখিয়ে দুই কোটি ৬০ লাখ টাকা আত্মসাতের মামলায় ওই শাখার সাবেক ব্যবস্থাপকসহ সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের ও চার্জশিট দিয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।

দুদক বগুড়া সমন্বিত কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক রবীন্দ্রনাথ চাকী সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে চলতি বছরের ১৩ ফেব্রুয়ারি এই চার্জশিট দাখিল করেন।

চার্জশিটে অভিযুক্তরা হলেন- রূপালী ব্যাংক বগুড়ার মহাস্থানগড় শাখার সাবেক ব্যবস্থাপক (সাময়িক বরখাস্ত) জোবায়নুর রহমান, সাবেক সিনিয়র অফিসার (বগুড়ার মোকামতলা শাখায় কর্মরত) ইশরাত জাহান, সাবেক প্রিন্সিপাল অফিসার (জয়পুরহাট শাখায় কর্মরত) মাহতাব উদ্দিন এবং সাবেক সিনিয়র অফিসার (টিএমএসএস শাখায় কর্মরত) কায়দে আজম, মহাস্থান হাটের ইজারাদার আজমল হোসেন, জাহিদুর রহমান ও মোশাররফ হোসেন।

এভাবে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা কয়েকজন ব্যবসায়ী ও ব্যাংক কর্তা আত্মসাৎ করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব টাকার বেশিরভাগই বিদেশে পাচার করা হয়েছে বলেও অভিযোগ আছে।