মায়ের স্বপ্ন পূরণে ঋণ করে বাড়িটি বানিয়েছিলেন ভ্যানচালক কবির

প্রকাশ: ১২ নভেম্বর ২০১৯      

নাজিরপুর (পিরোজপুর) প্রতিনিধি

ভাঙা বাড়ির সামনে মায়ের সঙ্গে কবির -সমকাল

‘ঘুর্ণিঝড় ফনীর পরপরই প্রতিবেশি স্থানীয় ইউপি সদস্যকে আমার ঘরের পাশ থেকে তার গাছগুলো কেটে নিতে বলেছিলাম, কিন্ত তিনি তা করেননি। আজ তার গাফিলতির কারণেই আমি সর্বশান্ত। ঘূর্ণিঝড় বুলবুলের তাণ্ডবে আমার নবনির্মিত ঘরটি পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতেই এনজিও থেকে ঋণ তুলে এক বছর আগে ঘরটির নির্মাণকাজ শুরু করেছিলাম। যা প্রায় শেষের পথে এ মাসেই মা ও বিধাব বোনকে নিয়ে নতুন ঘরে ওঠার প্রস্তুতি চলছিলো।’

এভাবেই নিজের দুর্দশার কথা বলছিলেন নির্মাণাধীন বাড়ির মালিক হতদরিদ্র ভ্যানচালক কবির মোহন। তিনি পিরোজপুরের নাজিরপুর উপজেলার কলারদোয়ানিয়া ইউনিয়নের মুনিরাবাদ গ্রামের শাহজাহান মোহনের ছেলে।

মঙ্গলবার সকাল ১১টায় সরেজমিনে ওই এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, রাস্তার পাশের বড় আকারের তিনটি চাম্বলগাছ ভ্যানচালক কবিরের নির্মাণাধীন বাড়ির উপর সেটি পুরোপুরি বিধ্বস্ত হয়ে গেছে। স্থানীয় লোকজনের সহায়তায় ভাঙা বাড়ির উপর থেকে গাছগুলো সরানোর চেষ্টা করছেন কবির। এ সময় সাংবাদিকদের দেখে কান্নায় ভেঙে পড়েন ভ্যানচালক কবির ও তার স্বামী পরিত্যক্তা মা কুলসুম বেগম।

কুলসুম বেগম সমকালকে বলেন, পনের বছর আগে ছোট ছোট দুই ছেলে ও দুই মেয়ে রেখে তার স্বামী শাহজাহান মোহন অন্য একটি বিয়ে করে গোপালগঞ্জে বসবাস শুরু করেন। স্বামীর রেখে যাওয়া একটি কুড়েঘরে থেকে তিনি মানুষের বাড়িতে ও ক্ষেতখামারে দিনমজুরের কাজ করে ছেলে মেয়েদের বড় করেছেন। পরবর্তীতে বড় ছেলে রাজ্জাক মোহন (২৫) কয়েক বছর আগে বিয়ে করে স্ত্রীকে নিয়ে অন্যত্র আলাদা সংসার শুরু করেন। তখন ছোট ছেলে কবিরই ভ্যান চালিয়ে সংসারের হাল ধরেন এবং দুই বোনকে বিয়ে দেন। এর মধ্যে ছোট মেয়ে নাজমুন্নাহারের স্বামী ভ্যানচালক আনোয়ার কিডনি রোগে আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। তখনও কবির ঋণ করে আনোয়ারের চিকিৎসা ব্যয় বহন করেছে। বর্তমানে বিধবা হয়ে নাজমুন্নাহার তার এক শিশু সন্তান নিয়ে তাদের সংসারে আছেন। 

তিনি জানান, কবির বিবাহযোগ্য হওয়ায় তাকে বিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত নেন তিনি। কিন্তু এই কুড়েঘরে থাকা ভ্যানচালক ছেলেকে কে মেয়ে দেবে! তাই এনজিও থেকে ঋণ তুলে এক বছর আগে বাড়িতে নতুন একটি ঘর তুলতে শুরু করেন। ওই টাকা দিয়েও কাজ শেষ করা সম্ভব না হওয়ায় স্থানীয়ভাবে সুদে টাকা এনে ঘরের কাজ চলছিলো। তার সেই স্বপ্ন ভেঙে দিলো ঘুর্ণিঝড় বুলবুল।

ভ্যান চালক কবির বলেন, বাবার রেখে যাওয়া কুড়ে ঘরে মা ও সন্তানসহ বিধবা বোনকে নিয়ে বসবাস করা সম্ভব না হওয়ায় দুটি এনজিও থেকে দেড় লাখ ও স্থানীয় মহাজনদের কাছ থেকে এক লাখ টাকা সুদে এনে বাড়িতে নতুন ঘর তৈরির কাজ প্রায় করে ফেলেছিলাম। আশা ছিল আর কিছুদিন পরেই নতুন ঘরে মা-বোনকে নিয়ে উঠবো এবং মায়ের স্বপ্ন পূরণের জন্য বিয়ে করবো। কিন্তু আমার ঘরের পাশেই থাকা প্রতিবেশির তিনটি বড় গাছ বুলবুলের তাণ্ডবে ভেঙে পড়ায় আমার সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেছে। এখন আমি কিভাবে এনজিওর কিস্তি ও সুদের টাকা পরিশোধ করে আবার ঘর নির্মাণ করবো!

আইয়ুব আলী বলেন, ঝড়ের কারণেই গাছগুলো ভেঙে পড়েছে। এখানে আমার কোন হাত ছিলো না। তারপরও সাধ্যমত তাদের সাহায্য করবো।

সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান হাসনাত ডালিম বলেন, ঝড়ে অনেকেরই ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, তবে ভ্যানচালক করিবের বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। সে যাতে আবারও ঘুরে দাঁড়াতে পারে সেই চেষ্টা করবো।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা রোজী আকতার জানান, ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকায় কবিরের নামও রয়েছে। সরকারিভাবে কোন বরাদ্দ আসলে তার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।