ঝড় থামলেও দুর্ভোগ শেষ হয়নি মিনারা-ফুলজানদের

প্রকাশ: ১৪ নভেম্বর ২০১৯   

নাসির লিটন ও নোমান সিকদার, চরফ্যাশন থেকে ফিরে

শূন্যভিটায় খোলা আকাশের নিচে বসে আছেন মিনারা ও তার সন্তান -সমকাল

শূন্যভিটায় খোলা আকাশের নিচে বসে আছেন মিনারা ও তার সন্তান -সমকাল

‘চাল-বেড়া নেই তাতে কি? ভিটাটাতো নিজের। কি করে ছেড়ে যাই। আর যাবইবা কোথায়? ২/১দিনের জন্য ভাই বন্ধু আশ্রয় দিলেও স্থায়ীভাবে রাখবে না। এ ভিটায় ফিরে আসতেই হবে। তাই রোদ-নিশিতে(কুয়াশা) এখানেই দিন কাটাই।’

ঘুর্ণিঝড় বুলবুল চলে যাওয়ার তিনদিন পর শূন্যভিটায় বসে কথাগুলো বললেন ঘরবাড়ি হারা চরফ্যাশনের চর দক্ষিণ মঙ্গল গ্রামের খলিল মাঝির স্ত্রী ফুলজান বিবি। ঝড়ের থামার তিনদিন পর বুধবার কথা হয় ফুলজানের সঙ্গে। 

তিনি বলেন, ‘দিন হইলে রইদে পুড়ি, আর রাইত হইলে নিশিতে ভিজি। সরকার আমাগোরে ২ বান্ডেল টিন আর ৬ হাজার টাকা দিছে। এইতে কি আর ঘর দুয়ার অয়? সরকার যদি আমাগো আরও সহযোগিতা করে তাহলে পোলাইন লইয়া বালা (ভালো) কইর‌্যা চইলতে পারমু।’ 

গৃহকর্তা খলিল মাঝি বলেন, ‘যতদিন ঘর উঠাইতে না পারমু ততদিন এভাবেই থাকমু।’ 

খলিল মাঝির বাড়ি গিয়ে দেখা যায়, তার ২ ছেলে পাশের ধানক্ষেত থেকে ভাঙাচোড়া টিন-কাঠ তুলে আনছেন। আর শুন্যভিটার ঝড়-বৃষ্টিতে ভিজে যাওয়া চালডাল শুকিয়ে নিচ্ছেন পরিবারের নারী সদস্যরা। ঝড়ে আহত খলিল মাঝি দাঁড়িয়ে কাজের তদারকী করছেন। শরীরে আঘাত পাওয়ার কারণে নিজে কাজে অংশ নিতে পারছেন না। 

তাই খলিল আপসোস করে বলেন, ‘নিজে কাজ করতে পারলে একজন শ্রমিকের খরচ বেঁচে যেত।’

খলিল মাঝির ভিটার উত্তর পাশেই ছিল মিনারার বসত ঘর। কিন্তু বুধবার মিনারার সঙ্গে কথা হয় তার শূন্যভিটায়। তিনি বলেন, ‘ঝড়ের কারণে পাতিল-হাড়ি, চুলা কিছুই নাই। ঝড়ের পর থেকে পোলাইন ছাওয়াল লইয়া প্রতিবেশির ঘরে খাই। কয়দিন এইভাবে চলমু তাও জানি না।’ 

প্রতিবেশির দেওয়া খাবারে কতদিন চলবে, মিনারা জানেন না। জানেন না এ ধংসস্তুপে বসে কি করবেন। ভেবে পাচ্ছেন না কিভাবে নতুন করে নিবাস গড়বেন। দুঃখ করে মিনারা বলেন, ‘ঘর আমার মায়া ছাইড়্যা গেলেও, আমার তো তারে (ঘর) ত্যাগ করার সামর্থ নাই।’

জেলা প্রশাসনের দেওয়া ২ বান্ডেল টিন ও নগদ ৬ হাজার টাকা আর্থিক সহায়তা পেয়েছেন মিনারা বেগম। যে ঘরটি ঝড়ে উড়ে গেছে সেটি করতে খরচ হয়েছে প্রায় ৩ লাখ টাকা। যা তিলে তিলে গড়ে তোলা হয়েছে। ঘুর্ণিঝড় বুলবুল তো শুধু ঘরই নেয়নি; নিয়ে গেছে ব্যবহারের মালামালও। সরকারিভাবে পাওয়া এতো অল্প টাকায় ঘর তোলা সম্ভব হবে না বলে জানান মিনারা। 

তিনি বলেন, ‘উপজেলা সদর থেকে টিন এনে ভাইর বাসায় রেখেছি। খালি ভিটায় রাখলে চোরের ভয় আছে। টাকা সংগ্রহ করে আবার নতুন ঘর তুলবো। চারদিন খোলা আকাশে নিচে। নিজের ঘরের রান্না বন্ধ। ঘর তোলার টাকা কোথায় পাব এমন চিন্তা করলে অস্থির হয়ে যাই। নতুন করে সংসার শুরু করতে হবে। সরকার যদি আরেকটু সহযোগিতা করে তাহলে বাঁচা সহজ হবে।’

চরকলমি ইউনিয়নের চেয়াম্যান কাওছার হোসেন মাস্টার জানান, তার ইউনিয়নের ২৬টি বসত ঘর সম্পূর্ণ বিধ্বস্থ হয়েছে। সরকারি সাহায্য পেলেও তা ক্ষতির তুলনায় কম। মিনারা- ফুলজানদের মতো ক্ষতিগ্রস্থ অনেকেই মানবেতর জীবনযাপন করছেন।

দক্ষিণ মঙ্গল গ্রামের মতোই লালমোহনের চরপ্যায়ারীমোহন গ্রামে গিয়ে দেখা যায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর কেউ কেউ বসতভিটার ওপর থাকা ধ্বংসম্ভুপ সরিয়ে সেটি বসবাসের উপযোগী করছেন। কিছু পরিবার টংঘর তুলেছেন রোদ বৃষ্টি থেকে রক্ষা পেতে। চর প্যাচারীমোহন গ্রামের মোহাম্মদ আলী, মোস্তফা ও নাসিরের ভিটায় ঝড়ে ক্ষতিগ্রস্থ মালামাল পড়ে আছে। 

মোহাম্মদ আলী জানান, তার স্ত্রী সাজেদা বেগম ও ছেলে সজিব ঝড়ে আহত হওয়ার পর থেকে লালমোহন হাসপাতালে ভর্তি আছেন। তাদের চিকিৎসা নিয়েই তিনি ব্যস্ত। এখন ঘর তোলার মতো সামর্থ তার নেই। 

ক্ষতিগ্রস্ত মোস্তফার ছেলে তারেক ঝড়ে আহত হয়ে ঢাকায় এবং স্ত্রী চরফ্যাশন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। আহতদের চিকিৎসার খরচ জোগাতেই তার কষ্ট হচ্ছে। এর মধ্যে ঘর তোলার অর্থ কিভাবে জোগার করবেন। অর্থাভাবে নাসিরের ঘরটিও বিধ্বস্ত অবস্থায় পড়ে আছে।

লালমোহনের লর্ডহার্ডিঞ্জ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান আবুল কাশেম মিয়া জানিয়েছেন, ক্ষতিগ্রস্থদের ইউনিয়ন পরিষদ ও জেলা প্রশাসনের পক্ষে সহায়তা করা হয়েছে। কিন্তু তাদের ঘুরে দাঁড়াতে আরও সহযোগিতার দরকার।

ঘুর্ণিঝড়ের পর থেকেই ক্ষতিগ্রস্থ এলাকায় জেলা প্রশাসনের ত্রাণ তৎপরতা দেখা গেছে। জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ মাসুদ আলম ছিদ্দিক জানিয়েছেন, চাল ও শুকনো খাবার ছাড়াও ক্ষতিগ্রস্থ প্রত্যেক পরিবারকে ২ বান্ডেল টিন ও নগদ ৬ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এরপরও যারা ঘর তুলতে পারবেন না তাদের পূর্ণবাসনে পর্যায়ক্রমে সরকারিভাবে ঘর দেওয়ার আশ্বাস দেন তিনি। এছাড়া ট্রলারডুবিতে নিহত প্রত্যেক জেলে পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা করে আর্থিক সহায়তা দেওয়া হয়েছে।