হত্যার পর গৌরাঙ্গের ২ চোখ তুলে নেয় ভাই-ভাতিজারা

প্রকাশ: ০৩ ডিসেম্বর ২০১৯      

 সাইফুল হক মোল্লা দুলু, কিশোরগঞ্জ

হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তারকৃতরা

পরিবারের এক কিশোরীকে ধর্ষণ করায় এর শোধ নিতে খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে গৌরাঙ্গ দত্তকে (৫৫) হত্যা করা হয়। বাজিতপুর উপজেলার সরারচর ইউনিয়নের উত্তর সরারচর গ্রামে গত ১৭ নভেম্বর সকালে বড় ভাই দেবতোষ দত্তের (৭০) বাড়িতে বিষ খাইয়ে গৌরাঙ্গ দত্তকে হত্যার পর লাশ ঘরের চৌকির নিচে সারাদিন রেখে দেওয়া হয়। সন্ধ্যায় দেবতোষ দত্ত, তার ছেলে সুজিত দত্ত আর ভাতিজা হৃদয় দত্ত মিলে গৌরাঙ্গের মৃতদেহ থেকে দুই চোখ উপড়ে ফেলে এবং ডান কান কেটে নেয়। পরে মৃতদেহ প্লাস্টিকের একটি বস্তায় ভরে রাত ১০টার দিকে অটোরিকশায় করে ভাগলপুর-সরারচর সড়কে নিয়ে সরারচর রেলস্টেশনের পাশের একটি পতিত জমিতে ফেলে রেখে যায় তারা। বাজিতপুরে চাঞ্চল্যকর গৌরাঙ্গ দত্ত হত্যাকাণ্ডের এমন নৃশংস বর্ণনা দিয়েছে খাবারের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে দেওয়া ভাতিজা সুজিত দত্তের স্ত্রী সোমা দত্ত (৩৫)। সোমবার বিকেলে আদালতে ১৬৪ ধারায় তার স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করা হয়। তাতেই উঠে আসে নির্মমতার এই চিত্র।

কিশোরগঞ্জের সিনিয়র জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট শহিদুল ইসলাম তার খাসকামরায় সোমা দত্তের এই স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি রেকর্ড করেন। এরপর রাতেই তাকে কিশোরগঞ্জ জেলা কারাগারে পাঠানো হয়। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা বাজিতপুর থানার এসআই মাহবুবুর রহমান এ তথ্য নিশ্চিত করেন।

নিহত গৌরাঙ্গ দেবনাথ উত্তর সরারচর গ্রামের মৃত ললিত দত্তের ছেলে। এই কিলিং মিশনে অংশ নেওয়া বড় ভাই দেবতোষ দত্ত, তার স্ত্রী খেলন রানী (৬৫), ভাতিজা সুজিত দত্ত (৪২), তার স্ত্রী সোমা দত্ত, ভাতিজা হৃদয় দত্ত (২০), ভাস্তি জামাই নূপুর সরকার (৪৫), তার ভাই শীতল সরকার (৪২) এবং ভাতিজি জেবা (৩৮)- এই আটজনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ।

বাজিতপুর থানার পরিদর্শক (তদন্ত) সারোয়ার জাহান জানান, গত ১৮ নভেম্বর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে সরারচর রেলস্টেশনের পাশের একটি পতিত জমিতে দুই চোখ ওঠানো এবং ডান কান কাটা অবস্থায় এক অজ্ঞাত লাশের খবর পেয়ে তারা ঘটনাস্থলে গিয়ে লাশ উদ্ধার করেন। পিবিআইর সহায়তায় ফিঙ্গারপ্রিন্টের মাধ্যমে লাশের পরিচয় শনাক্ত করে জানা যায়, নিহতের নাম গৌরাঙ্গ দত্ত। তার বাড়ি উত্তর সরারচর গ্রামে। তবে গৌরাঙ্গ দত্ত ২০/২৫ বছর আগে ভিটেমাটি বিক্রি করে দিয়ে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায় গিয়ে বসবাস শুরু করেন। সেখানে একটি গার্মেন্টে চাকরি করতেন গৌরাঙ্গ দত্ত। মেয়ের বিয়ের দাওয়াত দিতে গত ১৩ নভেম্বর উত্তর সরারচর গ্রামে বড় ভাই দেবতোষ দত্তের বাড়িতে আসেন তিনি। পরদিন রাতে এক ঘরে ঘুমানোর সুযোগে নাতনি সম্পর্কের পরিবারের এক মেয়েকে ধর্ষণ করেন গৌরাঙ্গ। ধর্ষণের শিকার কিশোরী বিষয়টি পরদিন সকালে বাড়ির লোকজনের কাছে খুলে বলে। এতে পরিবারের লোকজন ক্ষিপ্ত হয়ে গৌরাঙ্গ দত্তের চোখ তুলে ফেলে শোধ নেওয়ার পরিকল্পনা করে। গৌরাঙ্গ দত্তকে কোনো কিছু বুঝতে না দিয়ে ভাতিজা সুজিত দত্ত বাজার থেকে বিষ কিনে আনে। ১৭ নভেম্বর সকালে সুজিতের স্ত্রী সোমা খাবারের সঙ্গে সেই বিষ মিশিয়ে খেতে দেয় গৌরাঙ্গকে। তিনি তা খেয়ে কিছুক্ষণের মধ্যে মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন।

সারোয়ার জাহান আরও জানান, লাশ উদ্ধারের পর প্রথমে অজ্ঞাতনামা হিসেবে থানায় জিডি করা হয়। পরে পরিচয় শনাক্ত হওয়ার পর গত ২২ নভেম্বর নিহত গৌরাঙ্গ দত্তের স্ত্রী প্রতিমা দত্ত বাজিতপুর থানায় সাতজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। এরপর ২২ নভেম্বর চারজন ও ২৩ নভেম্বর বাকি তিনজনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আদালতের মাধ্যমে চার আসামি দেবতোষ, পুত্রবধূ সোমা, মেয়ে জেবা ও জেবার দেবর শীতলকে তিন দিনের রিমান্ডে এনে জিজ্ঞাসাবাদ করার দ্বিতীয় দিনে সোমা আদালতে জবানবন্দি দেয়। বাকি তিনজনকে মঙ্গলবার আদালতে পাঠানোর পর তাদের কারাগারে পাঠানো হয়। এ তিন আসামি সুজিত, নূপুর ও হৃদয়ের চার দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হওয়ায় তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।