বিভেদের বলি কামরান-আসাদ-শফিক

সিলেট আওয়ামী লীগে নতুন নেতৃত্ব

প্রকাশ: ০৬ ডিসেম্বর ২০১৯       প্রিন্ট সংস্করণ

চয়ন চৌধুরী, সিলেট

গত বছরের ৩০ জুলাই অনুষ্ঠিত সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র পদে পরাজিত হন মহানগর আওয়ামী লীগ সভাপতি বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। সেই পরাজয়ের পর সিলেট আওয়ামী লীগে বিভেদের বিষয়টি সামনে এলে জেলা-মহানগরের চার নেতাকে শোকজ করা হয়। কামরান ছাড়া অন্য তিনজন ছিলেন জেলার সাধারণ সম্পাদক শফিকুর রহমান চৌধুরী, মহানগরের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ ও সাংগঠনিক সম্পাদক শফিউল আলম চৌধুরী নাদেল। শোকজের জবাব দিলেও তাতে যে হাইকমান্ডের ক্ষোভ প্রশমিত হয়নি, সিলেট আওয়ামী লীগের নতুন কমিটি ঘোষণা তারই প্রমাণ।

গতকাল বৃহস্পতিবার জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলনের পর কামরান, আসাদ ও শফিক তিনজনই বাদ পড়েছেন। মহানগরের সদ্য বিদায়ী সভাপতি কামরানের সঙ্গে এবারে সভাপতি হতে চেয়েছিলেন আসাদ। অন্যদিকে জেলার সাধারণ সম্পাদক শফিক সভাপতি হওয়ার স্বপ্ন দেখেছিলেন। মহানগরের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী সাবেক সাংগঠনিক সম্পাদক নাদেলের ভাগ্যেও কাঙ্ক্ষিত পদ মেলেনি। অবশ্য মহানগরের সভাপতি হয়েছেন বিদায়ী সাধারণ সম্পাদক আসাদের বড় ভাই মাসুক উদ্দিন আহমদ। জেলা আওয়ামী লীগের বিদায়ী কমিটিতে সহসভাপতি ছিলেন মাসুক। জেলার সভাপতি হওয়ার আলোচনায় থাকলেও মহানগরে তাকে নিয়ে আলোচনা ছিল না। অবশ্য সম্মেলনে তিনি মহানগরের সভাপতি পদে প্রার্থী হন।

গতকাল নগরীর আলিয়া মাদ্রাসা মাঠে জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ ১৪ বছর পর অনুষ্ঠিত কাউন্সিল অধিবেশনের শুরুতেই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক, সড়ক পরিবহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জেলা ও মহানগরের শীর্ষ চার নেতার নাম ঘোষণা করেন। দুই কমিটির শীর্ষ চার নেতার মধ্যে জেলার ভারপ্রাপ্ত সভাপতি অ্যাডভোকেট লুৎফুর রহমান পূর্ণ দায়িত্ব পেলেও বিদায়ী কমিটির বাকিরা বাদ পড়েছেন। সিলেট জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান লুৎফুর রহমান বয়সের জন্য অনেকদিন ধরে দলীয় কর্মকাণ্ডে সেভাবে সক্রিয় নন বলে তার 'ভারমুক্ত' হওয়াকেও চমক মনে করছেন অনেকে। ২০১৫ সালের ৯ সেপ্টেম্বর সভাপতি আব্দুজ জহির চৌধুরী সুফিয়ানের মৃত্যুর পর ভারপ্রাপ্ত সভাপতির দায়িত্ব পান লুৎফুর রহমান।

জেলা ও মহানগরের নতুন সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন যথাক্রমে অ্যাডভোকেট নাসির উদ্দিন খান ও অধ্যাপক জাকির হোসেন। এই দু'জনই বিদায়ী কমিটিতে জেলা ও মহানগরের যুগ্ম সম্পাদকের দায়িত্বে ছিলেন। জেলায় ৯ জন এবং মহানগরে ১২ প্রার্থীর মধ্যে এ দু'জনকে সাধারণ সম্পাদক হিসেবে বেছে নেওয়া হয়। অন্যদিকে জেলার সভাপতি পদে প্রার্থী ছিলেন সাতজন এবং মহানগরে চারজন। জেলার সভাপতি প্রার্থীদের মধ্যে প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থানমন্ত্রী ইমরান আহমদ ও সিলেট-৩ আসনের এমপি মাহমুদ উস সামাদ চৌধুরী কয়েস ছিলেন। দুপুরে সম্মেলন শেষে প্রধান অতিথি সমঝোতার জন্য তাদের ২০ মিনিট সময় দিলে পদপ্রত্যাশীরা দলের সভাপতি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার কথা বলেন।

এদিকে সম্মেলনের দিনক্ষণ ঠিক হওয়ার পর থেকে আসাদ উদ্দিন মহানগরের সভাপতি হতে আগ্রহ প্রকাশ করেন। সর্বশেষ সিটি নির্বাচনে মেয়র পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়নপ্রত্যাশী আসাদকে সভাপতি দেখতে চেয়ে নগরজুড়ে বিশাল বিশাল বিলবোর্ড, তোরণ, পোস্টার, ব্যানার সাটানো হয়। তবে গতকাল সম্মেলনের সময় কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন আগ্রহীদের মনোনয়নপত্র জমা দেওয়ার আহ্বান জানালে আসাদ মহানগরের সভাপতির বদলে সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হন। হাইকমান্ডের ইঙ্গিতে বড় ভাই মাসুক সভাপতি প্রার্থী হওয়ায় আসাদ সাধারণ সম্পাদক পদে প্রার্থী হন বলে ঘনিষ্ঠ সূত্র জানায়।

সিলেট জেলা ও মহানগর আওয়ামী লীগের সম্মেলনের দিনক্ষণ চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকে অনেকে প্রার্থী হলেও সবাই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সিদ্ধান্ত মেনে নেওয়ার কথা বলেছিলেন। স্বাধীনতার পর থেকে নির্বাচনী প্রচার বা আন্দোলন-সংগ্রামের সূতিকাগার হিসেবে পরিচিত পুণ্যভূমি সিলেটে শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার পছন্দের নেতারাই নেতৃত্বে এলেন বলে জানিয়েছেন তৃণমূল নেতাকর্মীরা। দিনভর পদপ্রত্যাশী কিছু নেতার অনুসারীরা সম্মেলনস্থলে মুহুর্মুহু স্লোগান দিলে তাদের সতর্ক করে দেন কেন্দ্রীয় নেতারা। বড় বিলবোর্ড টানিয়ে বা স্লোগান দিয়ে নেতা হওয়া যায় না বলে তাদের মন্তব্যকে অনেকেই তখন আমলে নেননি। বিকেলে তাদের জন্য দুই কমিটির নতুন চার নেতার নাম বিশাল চমক হয়ে আসে।

এই সম্মেলনের মাধ্যমে তৎকালীন সিলেট শহর থেকে মহানগর আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের প্রায় তিন দশকের নেতৃত্বের ইতি ঘটল। ২০০৩ সাল থেকে টানা দেড় যুগ মহানগরের সভাপতি ছিলেন বর্তমানে কেন্দ্রীয় সদস্য কামরান। গত সিটি নির্বাচনের পর থেকে কামরান ও আসাদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যর্থতার বিষয়টি আলোচনায় আসে। সর্বশেষ সম্মেলনের আগে বিদায়ী কমিটির শিক্ষা বিষয়ক সম্পাদক কাউন্সিলর আজাদুর রহমান আজাদ মহানগরের শীর্ষ দুই নেতার বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে সাংগঠনিক ব্যর্থতার অভিযোগ তোলেন। দীর্ঘদিন ধরে অনেকগুলো ওয়ার্ডে কমিটি গঠন করতে না পারার পাশাপাশি সিটি নির্বাচনে কাউন্সিলর পদে দলীয় প্রার্থী দিতে ব্যর্থতার জন্য তাদের দায়ী করেন এবারে সাধারণ সম্পাদক পদপ্রত্যাশী আজাদ।

এদিকে, দুপুরে সম্মেলন উদ্বোধনের সময় দলের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের বলেন, 'বর্তমানে আওয়ামী লীগে কর্মীর সংখ্যা কমে গেছে, বেড়েছে নেতার সংখ্যা। জাতীয় নেতা, স্থানীয় নেতা, বড় নেতা, আধুলি নেতা, সিকি নেতা; আরও কত নেতা। এখন পোস্টার-বিলবোর্ড লাগাতে মানুষ ভাড়া করতে হয়। বিলবোর্ডে সবাই নেতা। এমন নেতার দরকার নেই' দরকার দুঃসময়ের নেতা। ত্যাগী ও যোগ্য নেতা দরকার। এখন শেখ হাসিনার নেতা নয়, কর্মী দরকার।'

তিনি বলেন, 'আওয়ামী লীগ সন্ত্রাস, চাঁদাবাজি, টেন্ডারবাজি ও দুর্নীতিকে কখনও জায়গা দেয়নি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশজুড়ে শুদ্ধি অভিযান শুরু করেছেন। সবাইকে সাবধান হওয়ার আহ্বান জানিয়ে সেতুমন্ত্রী বলেন, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের সুশৃঙ্খল হতে হবে, নিয়মকানুন মেনে চলতে হবে। মনোনয়ন বাণিজ্য ও টাকা দিয়ে পদ-পদবির দিন শেষ।'

ওবায়দুল কাদের বলেন, 'আমাদের প্রধানমন্ত্রী ও দলীয় সভাপতি বিশ্বের তিনজন সৎ প্রধানমন্ত্রীর একজন। তিনি বিশ্বের পরিশ্রমী চারজন রাষ্ট্রনায়কের একজন; বিশ্বের প্রভাবশালী ১০ নেতার একজন। বঙ্গবন্ধুকে বাদ দিয়ে গত ৪৪ বছরে দেশের সবচেয়ে সৎ রাজনীতিবিদের নাম শেখ হাসিনা। বিশ্বের দক্ষ একজন প্রশাসকের নাম শেখ হাসিনা।'

বিশেষ অতিথির বক্তৃব্যে নুরুল ইসলাম নাহিদ বলেন, শেখ হাসিনার নেতৃত্বে স্বাস্থ্য ও শিক্ষাসহ সব ক্ষেত্রে পরিবর্তন এসেছে। আওয়ামী লীগ লক্ষ্য অর্জনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

দুপুরে সম্মেলনস্থলে খাবার নিয়ে দু'পক্ষের মধ্যে হাতাহাতির ঘটনা ঘটে। তাৎক্ষণিকভাবে নেতাদের হস্তক্ষেপে উত্তেজনা নিরসন হয়। এ বিষয়টিকে উল্লেখ করে সম্মেলনের প্রধান বক্তা দলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ বলেন, সারাদেশের বিভিন্ন জায়গায় সম্মেলনে গেলেও এখানকার মতো এত বিশৃঙ্খলা দেখিনি। স্লোগান দিয়ে কাউকে নেতা বানানো যায় না। নেতা হতে যোগ্যতা লাগে।