ঢাকা শনিবার, ১৮ মে ২০২৪

কুষ্টিয়ার কুমারখালীর চর

সাদিপুর চর যেন অনিয়মের চরাচর

সাদিপুর চর যেন অনিয়মের চরাচর

দুপুরেই ছুটি হয় বিদ্যালয়, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ঝুলছে তালা, কার্যালয়ে আসেন না ইউপি চেয়ারম্যান - সমকাল

মিজানুর রহমান নয়ন, কুমারখালী (কুষ্টিয়া)

প্রকাশ: ৩১ আগস্ট ২০২৩ | ০৪:৫৩ | আপডেট: ৩১ আগস্ট ২০২৩ | ০৪:৫৪

ঘড়ির কাঁটায় তখন বেলা ১১টা ৪১ মিনিট। কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার চর সাদিপুর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তখনও ঝুলছে তালা। আসেননি চিকিৎসকসহ সংশ্লিষ্ট কেউই। অথচ সকাল ৯টায় খোলার কথা তালা। ফলে অনেক রোগী এসে ফিরে গেছেন।

গত মঙ্গলবার উপজেলা শহর থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরের ওই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে গিয়ে এ চিত্র দেখা যায়। স্থানীয়রা জানিয়েছেন, এমন দৃশ্য নিত্যদিনের।

সাংবাদিকের উপস্থিতির খবর পেয়ে প্রায় ১০ মিনিট পরে স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের পরিদর্শক এসে দরজার তালা খুললেন। ভেতরে গিয়ে দেখা যায়, নোংরা-আবর্জনা, মাকড়সার বাসাসহ স্যাঁতসেঁতে পরিবেশ। চিকিৎসকের বসার চেয়ারটিও রাখা রয়েছে টেবিলের ওপরে।

হাসপাতালের পরিদর্শক মামুন হোসেন বললেন, জনবল কম। তিনি আর একজন ফার্মাসিস্ট পদের চিকিৎসক মিলে হাসপাতাল চালাচ্ছেন। তাঁর ভাষ্য, চিকিৎসক অফিসের কাজে শহরে রয়েছেন এবং তাঁর একজন আত্মীয় মারা যাওয়ায় হাসপাতাল বন্ধ রেখেছেন।

পল্লিচিকিৎসক শহিদুল ইসলাম বলেন, ‘হাসপাতাল খোলা কিংবা ডাক্তার আসা-যাওয়ার কোনো ঠিকঠিকানা নেই। রোগীরা এসে ফিরে যান। ওষুধপানিও তেমন দেয় না। এখানে কোনো নিয়মনীতি নেই।’

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে ওই স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসার হেলাল উদ্দিন মোবাইল ফোনে বলেন, তিনি অফিসের কাজের জন্য সেদিন যাননি হাসপাতালে। যোগাযোগ ব্যবস্থা খারাপ হওয়ায় মাঝেমধ্যে দেরি হয়। তাঁর দাবি, তিনি নিয়মিত হাসপাতালে যান। বরাদ্দ কম থাকায় রোগীরা ওষুধ কম পান।

হাসপাতালটির সামনেই চর সাদিপুর ইউপি ভবন। দেখা যায়, ভবনের ছাদে উড়ছে পতাকা। দরজা-জানালা খোলা। সুনসান পরিবেশ। সচিব এলেও আসেননি চেয়ারম্যান। প্রায় ১৮ দিন ধরে চেয়ারম্যান আসেন না পরিষদে। এতে সেবা পেতে ভোগান্তি পোহাতে হয় বলে জানান স্থানীয়রা।

এ সময় গ্রাম পুলিশ মোফাজ্জেল বলেন, ১১ আগস্ট ফুটবল খেলাকে কেন্দ্র করে সাদিপুর গ্রামের সঙ্গে ঘোষপুর গ্রামবাসীর মারামারি হয়। সাদিপুরের মানুষ চেয়ারম্যানকে মারধরের হুমকি দিয়েছেন। সেজন্য চেয়ারম্যান ভয়ে পরিষদে না এসে ঘোষপুর বাজারে দোকান খুলে অফিস করছেন।

এ বিষয়ে পরিষদের সচিব আবু সোহেল মুহাম্মদ রানা বলেন, তিনি পরিষদে ও চেয়ারম্যান বাজারে অফিস করছেন। জনগণের কিছুটা ভোগান্তি হচ্ছে।

পরিষদ চত্বর থেকে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার দূরে দুপুর ১২টা ৪৯ মিনিটে ঘোষপুর বাজারে গিয়ে দেখা যায়, দুটি দোকানঘরে চলছে পরিষদের কার্যক্রম। একটিতে রয়েছেন চেয়ারম্যান। অপরটিতে ভাতার কার্যক্রম চালাচ্ছেন একজন উদ্যোক্তা।

এ সময় ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য আব্দুল লতিফ বলেন, খেলাকে কেন্দ্র করে দুই গ্রামবাসীর মারামারি হয়। সেটা মীমাংসাও করা হয়েছে। তবুও সাদিপুরের লোকজন চেয়ারম্যান ও ইউপি সদস্যদের মারার হুমকি দিয়েছে। সেজন্য চেয়ারম্যানসহ কয়েকজন ইউপি সদস্য পরিষদে যান না। এতে জনগণের ভোগান্তি হচ্ছে।

চেয়ারম্যান মেছের আলী খাঁ বলেন, পরিস্থিতি যেমনই হোক জনগণ যেন সেবা থেকে বঞ্চিত না হয়, সেজন্য বাজারে বসেই কার্যক্রম চালাচ্ছেন তিনি। ঝামেলা মিটে গেলে আবার পরিষদে যাবেন।

দুপুর ২টা ১৭ মিনিট। সাদিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। এ সময়ও বিদ্যালয়টিতে ঝুলছে তালা। নেই শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও কর্মচারীরাও। অথচ বিদ্যালয় ছুটি হওয়ার কথা বিকেল ৪টা ১৫ মিনিটে।

পাশেই সাদিপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়। সেখানে গিয়ে জানা যায়, প্রাথমিক বিদ্যালয়টি ছুটি হয়ে গেছে। মাধ্যমিক বিদ্যালয়টিতে সেদিন আসেননি প্রধান শিক্ষক ও সহকারী প্রধান শিক্ষক।

আবার ২টা ৫৫ মিনিটের দিকে দেখা যায়, প্রাথমিক বিদ্যালয়ে উড়ছে পতাকা। দরজার তালা খুলছেন কর্মচারী আলামিন। খবর পেয়ে একটু পরই বিদ্যালয়ে এলেন প্রধান শিক্ষক সুরাইয়া আক্তার ও সহকারী শিক্ষক কামরুল ইসলাম। তাঁর ভাষ্য, তাঁর এক আত্মীয় মারা গেছেন। তিনি সেই আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়েছিলেন।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, নিয়মের ব্যত্যয় ঘটিয়ে বিদ্যালয় ছুটি দেওয়া হয়েছে। তিনি প্রধান শিক্ষককে শোকজ করেছেন।

আরও পড়ুন

×