হটি-ব্যাগে বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ, আছেন জাতীয় কবি নজরুলও। টি-ব্যাগেই রেলস্টেশন, যাত্রীবোঝাই বাস, ময়ূর কিংবা বর্ষার প্রথম কদম ফুল। একে তো ফেলনা জিনিস, তার ওপর ছোট্ট একটি টি-ব্যাগ, তারই গায়ে রংতুলির আঁচড়ে বিখ্যাতজন, প্রাকৃতিক দৃশ্যগুলো জীবন্ত করে তুলেছেন তরুণ চিত্রশিল্পী মো. সাদিতউজ্জামান সাদিত। তার এ বৈচিত্র্যময় খুদে শিল্পকর্ম এরই মধ্যে সাড়া ফেলেছে দেশ-বিদেশে।

রাজশাহী মহানগরীর লক্ষ্মীপুর ঝাউতলা এলাকার বাসিন্দা সাদিত বলেন, 'টি-ব্যাগের মতো পরিত্যক্ত একটি জিনিসে ছবি আঁকা- একদম ভিন্ন একটা ক্যানভাস, খুব সহজেই যে কারও  দৃষ্টি আকর্ষণ করা যায়। আমাদের দেশে এ ধরনের কাজ আমার আগে কেউ করেনি। স্বপ্ন দেখি- এ কাজের মাধ্যমেই দেশীয় সংস্কৃতিকে বিশ্বের কাছে নতুন করে তুলে ধরব। আমাদের শিল্পাঙ্গনে এ ছবিগুলো নতুন মাত্রা যোগ করবে। '

সাদিত জানান, চা পানের পর ব্যবহূত টি ব্যাগটি অবহেলায় ফেলে দেওয়া হয়। সেটিই তিনি সংগ্রহ করেন। পরিস্কার করে রোদে শুকান, তারপর সেগুলোর গায়ে তিনি রংতুলির আচড়ে ফুটিয়ে তোলেন ছবি। টি-ব্যাগের গায়েই তিনি ফুটিয়ে তুলেছেন বঙ্গবন্ধু, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য, মুক্তিযুদ্ধ ও বায়ান্নর ভাষা আন্দোলনের গল্পসহ বাংলাদেশের লোকজ সংস্কৃতি। সাধারণত অ্যাক্রেলিক রঙে ছবি আঁকেন তিনি। টি-ব্যাগে এ পর্যন্ত চার শতাধিক ছবি এঁকেছেন সাদিত।

পেশায় ব্যবসায়ী তরুণ এ শিল্পীর বেড়ে ওঠা রাজধানী ঢাকাতেই। পড়েছেন আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনির্ভাসিটিতে, বিবিএ ও এমবিএ। কখনও ভাবেননি চিত্রশিল্পী হবেন। কখনও তার পড়াশোনার বিষয়ও ছিল না চিত্রকর্ম। কিন্তু শখের বসেই এঁকে চলেছেন একের পর এক ছবি। ব্যবসার কাজের পর যখন সময় পান তখনই বসে যান ছবি আঁকতে। সেটি হোক নিজের ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ফ্যাশন হাউস 'সুন্দর'-এ কিংবা বাসায় নিজের রুমে।

তার শোবার ঘরটা রীতিমতো একটি ছবির স্টুডিও বলা যায়। খাটের পাশেই একটি টেবিল-চেয়ার। এই টেবিলে বসেই তিনি ছবি আঁকেন। ঘরের দুই পাশের দেয়াল রীতিমতো ভর্তি হয়ে গেছে তার আঁকা ছবিতে।

কখনও চিত্রকর্মের ওপর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা নেননি সাদিত। ছোটবেলায় শক্ত কাগজে কলম দিয়ে বাবার 'চমমা' (চশমা) আঁকতে গিয়েই হয়তো ছবি আঁকা শুরু তার। সাদিত বলেন, 'আঁকাআঁকি কখনও কারও কাছে শেখা হয়নি। স্কুলে ড্রয়িং ক্লাস থাকত, কিন্তু সেটি এমন কি। বরং স্কুলে থাকতে অবাক হয়ে দেখতাম বন্ধু জিশানের আঁকা। দারুণ ছবি আঁকত, এখন সে আর্কিটেক্ট।' সেসবও মনে প্রভাব ফেলেছে কিছুটা।

সাদিত জানান, ছোটবেলা থেকে বিভিন্ন মাধ্যমে কাজ করলেও টি-ব্যাগে ছবি আঁকার অনুপ্রেরণা পেয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রের চিত্রশিল্পী রুবি সিলভিয়াসের কাছ থেকে। রুবি সিলভিয়াসের কাজ দেখার আগে আরও দু-একজন বিদেশি চিত্রশিল্পীর কাজ দেখেছি। কিন্তু অনুপ্রাণিত হয়েছি রুবি সিলভিয়াসের কাজ দেখে। কারণ আমাদের দেশে তো রিসাইকেল ম্যাটেরিয়াল নিয়ে সেভাবে কাজ হয়নি। আর দেশে টি-ব্যাগে ছবি আঁকাও আমারই প্রথম। ২০১৬ সাল থেকে চলছে টি-ব্যাগে ছবি আঁকা।

সাদিতের টি-ব্যাগ স্টোরিজ নামে ফেসবুক পেজও আছে। সেখানে তিনি আঁকা ছবি নিয়মিত পোস্ট করেন। সেই ছবি দেখে রুবি সিলাভিয়াস নিজেও প্রশংসা করেছেন। সাদিত বলেন, দিনের শুরুতে, কাজের ফাঁকে, বন্ধুদের আড্ডায় কিংবা একাকী বারান্দায়- চা যেমন একটা তৃপ্তির জায়গা, আঁকাআঁকিটাও। এই দুই ভালোলাগাকে এক করতেই টি-ব্যাগ স্টোরিজ।

টি-ব্যাগে খুদে ছবি নিয়ে সাদিতের এ পর্যন্ত বেশ কিছু স্বীকৃতি মিলেছে। বিখ্যাত টার্কিশ কোম্পানি পেলি পেপার তাদের ক্যাটালগের প্রচ্ছদ সাদিতের আঁকা ছবি দিয়ে করেছে। পেলি পেপার পৃথিবীব্যাপী টি-ব্যাগের কাগজ উৎপাদন করে। এছাড়া সম্প্রতি মুক্তি পাওয়া দেবী সিনেমার পোস্টারও তিনি এঁকেছিলেন। কাজ করেছেন ইস্পাহানি মির্জাপুর টি-ব্যাগের সঙ্গেও। তার টি-ব্যাগে আঁকা ছবি নিয়ে রূপালী ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি এ বছরের ক্যালেন্ডার তৈরি করেছে।