দুদকের মামলা

চট্টগ্রামে হিমশিম খাচ্ছেন বিএনপির শীর্ষ নেতারা

প্রকাশ: ১১ জানুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

সারোয়ার সুমন, চট্টগ্রাম

চট্টগ্রামে শীর্ষ বিএনপি নেতা প্রায় সবাই দুর্নীতি মামলার আসামি। বিদেশে অর্থ পাচার থেকে শুরু করে অবৈধ সম্পদ অর্জন কিংবা তথ্য গোপন ইত্যাদি অভিযোগে এসব মামলা করেছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। ইতোমধ্যে আদালতের রায়ে বিএনপির কোনো কোনো নেতার দণ্ডাদেশ হয়েছে, কেউ কেউ গ্রেপ্তার হয়ে কারাগারে আছেন, কারও ওপর দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

বিদেশে অর্থ পাচারের অভিযোগে মামলা হয়েছে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরীর বিরুদ্ধে। জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আনা হয়েছে সাবেক মন্ত্রী আবদুলল্গাহ আল নোমানের বিরুদ্ধে। বিএনপির সাবেক নেতা ও মন্ত্রী মোর্শেদ খানের বিরুদ্ধে আনা হয়েছে ৩২১ কোটি টাকা পাচারের অভিযোগ। অবৈধ সম্পদ অর্জন ও তথ্য গোপনের অভিযোগ উঠেছে সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর নাছিরের বিরুদ্ধে। অপরিশোধিত পাম অলিন আমদানির নামে ব্যাংক থেকে দেড়শ' কোটি টাকা নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে মামলা হয়েছে মহানগরের সহসভাপতি শামসুল আলমের বিরুদ্ধে।

এদিকে উত্তর জেলা বিএনপির আহ্বায়ক আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে ব্যাংকের ৩২৫ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে মামলা হয়েছে। এরই মধ্যে সাবেক প্রতিমন্ত্রী মীর নাছিরকে ১৩ বছরের কারাদণ্ড দিয়েছেন আদালত। মীর নাছিরের ছেলে ব্যারিস্টার মীর হেলালকেও তিন বছরের দণ্ডাদেশ দেওয়া হয়েছে। আসলাম চৌধুরী ও শামসুল আলমকে গ্রেপ্তার করা হলেও আমীর খসরু ও মোরশেদ খানের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে দুর্নীতি মামলায় সাজা পাওয়া বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিন বলেন, 'সরকার প্রতিহিংসা থেকে একের পর এক বিএনপি নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলা দিচ্ছে। জনগণ এসব বিশ্বাস করে না। এসব নিয়ে এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে চাই না। আমি এখন অসুস্থ।' তবে নগর বিএনপির সভাপতি ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, 'ক্যাসিনো কেলেঙ্কারিতে আওয়ামী লীগের অনেক মন্ত্রী-এমপির নাম এসেছে। রাঘববোয়ালদের আড়াল করা হয়েছে। আওয়ামী লীগ বিরোধী দলের জন্য আইন করে। কিন্তু নিজেদের সাত খুনও মাফ করে দেয়। চট্টগ্রামে শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি মামলাও তাদের এ দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ।' আমীর খসরুর বক্তব্য নিতে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।

অবৈধ সম্পদ অর্জন এবং সম্পদের তথ্য গোপনের অভিযোগে ২০০৭ সালের ৬ মার্চ মীর নাছির ও তার ছেলে মীর হেলালের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় দুদক মামলা করে। ২০০৮ সালের ৪ জুলাই মীর নাছিরকে ১৩ বছর এবং মীর হেলালকে তিন বছরের কারাদণ্ড দেন বিশেষ জজ আদালত। এ রায়ের বিরুদ্ধে তারা পৃথক আপিল করলে ২০১০ সালের ১০ আগস্ট মীর নাছিরের এবং একই বছরের ২ আগস্ট মীর হেলালের সাজা বাতিল করে রায় দেন হাইকোর্ট। পরে এ রায় বাতিল চেয়ে দুদক আপিল আবেদন করে। এ আপিলের শুনানি শেষে বিএনপি নেতা মীর মোহাম্মদ নাছির উদ্দিনের ১৩ বছর ও তার ছেলে মীর মোহাম্মদ হেলাল উদ্দিনকে দেওয়া তিন বছরের সাজা বহাল রাখেন হাইকোর্ট।

বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও সাবেক পররাষ্ট্রমন্ত্রী এম মোর্শেদ খানের বিরুদ্ধে দুদক মামলা করেছে অর্থ পাচারের অভিযোগে। এ মামলায় তার স্ত্রী নাসরিন খান এবং ছেলে ফয়সাল মোর্শেদ খানকেও আসামি করা হয়েছে। ২০১৪ সালের ১ জানুয়ারি দুদক রাজধানীর রমনা থানায় এ মামলা করে।

মামলার এজাহারে বলা হয়, মোর্শেদ খানের প্রতিষ্ঠান ফারইস্ট টেলিকম লিমিটেডের মাধ্যমে মোট ১১টি বিভিন্ন ধরনের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করে ৩২১ কোটি সাত লাখ ৫৩ হাজার ৩৫৯ টাকা দেশের বাইরে পাচার করা হয়েছে। মোর্শেদ খান বিএনপি সরকারের পররাষ্ট্রমন্ত্রী থাকার সময় এ অর্থ পাচার করেন। দুদক বিভিন্ন ব্যাংকে ফারইস্ট টেলিকমের নামে চারটি এফডি হিসাব, একটি ইনভেস্টমেন্ট ফান্ড হিসাব, একটি ইউএসডি কারেন্ট হিসাব ও একটি ইউএসডি সেভিংস হিসাব খুঁজে পায়। এ ছাড়া স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ড ব্যাংকে মোর্শেদ খানের নামে একটি ইউএসডি সেভিংস ও একটি হংকং ডলার সেভিংস হিসাব এবং ওই ব্যাংকে ছেলে ফয়সালের নামে একটি ইউএসডি সেভিংস ও একটি হংকং ডলার সেভিংস হিসাবে এসব অর্থ লেনদেনের প্রমাণ পেয়েছে দুদক। এ জন্য ২০১৯ সালের ১০ জুন মোর্শেদ খান ও তার পরিবারকে দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়।

অপরিশোধিত পাম অলিন আমদানির নামে ব্যাংক থেকে দেড়শ' কোটি টাকা নিয়ে আত্মসাতের অভিযোগে বিএনপি নেতা শামসুল আলমের বিরুদ্ধে মামলা করেছে দুদক। ২০১৮ সালের ১৬ মে নগরীর ডবলমুরিং থানায় দুদক প্রধান কার্যালয়ের উপ-পরিচালক শামসুল আলম বাদী হয়ে এ মামলা করেন। দুদক কর্মকর্তা শামসুল আলম জানান, ভোজ্যতেল পরিশোধনকারী প্রতিষ্ঠান ইলিয়াছ ব্রাদার্সের পরিচালকরা ব্যাংক কর্মকর্তাদের যোগসাজশে জামানতবিহীন ১৫৫ কোটি ৪৪ লাখ ৫৩ হাজার টাকা ঋণ নেন। অন্য ব্যাংকে দায়দেনার কথা গোপন করে ইলিয়াছ ব্রাদার্স ব্যাংকের অর্থায়নে ঋণপত্র খুলে এবং ১১টি চেকের মাধ্যমে ১৯১ কোটি টাকার ভুয়া জামানত দেখিয়ে ইন্দোনেশিয়া থেকে ক্রুড পাম অলিন (অপরিশোধিত পাম তেল) আমদানি করে। পরে তা খোলাবাজারে বিক্রি করলেও প্রতিষ্ঠানটি ব্যাংকের ঋণের টাকা পরিশোধ করেনি।

মামলায় শামসুল আলমের পরিবারের পাঁচ সদস্য ও অগ্রণী ব্যাংকের সাবেক-বর্তমান পাঁচ কর্মকর্তাকেও মামলায় আসামি করা হয়েছিল। এছাড়া ২০১৯ সালের ২৬ নভেম্বর অর্থ আত্মসাতের আরেকটি মামলায় শামসুল আলমকে গ্রেপ্তার করে ইপিজেড থানা পুলিশ। নগরীর গোলপাহাড় মোড়ের নিজ কার্যালয় থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। ইপিজেড থানার পরিদর্শক (তদন্ত) মো. ওসমান গনি জানান, শামসুল আলমের বিরুদ্ধে প্রায় ১৫ কোটি টাকার চেক ডিজঅনারের মামলা করেছিল মেঘনা গ্রুপ। সে মামলার সাজা পরোয়ানার ভিত্তিতে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

৩২৫ কোটি ৭৬ লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে ২০১৬ সালের ১৭ জুলাই বিএনপি নেতা আসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে মামলা করে দুদক। মামলায় আসলাম চৌধুরীর স্ত্রী রাইজিং স্টিল মিল লিমিটেডের চেয়ারম্যান জামিলা নাজনিন মাওলা ও ছোট ভাই রাইজিং স্টিল মিল লিমিটেডের এমডি আমজাদ হোসেন চৌধুরীসহ ৬ জনকে আসামি করা হয়েছে। দুদকের সমন্বিত জেলা কার্যালয়-১-এর উপপরিচালক মানিক লাল বাদী হয়ে নগরীর ডবলমুরিং থানায় এ মামলা করেন। এ ক্ষেত্রে এবি ব্যাংকের আগ্রাবাদ শাখা থেকে তিনটি লোনের বিপরীতে ৩২৫ কোটি ৭৬ লাখ ৩০ হাজার ৯৫৫ টাকা আত্মসাৎ করা হয়েছে বলে প্রাথমিক তদন্তে প্রমাণিত হয়েছে।

দুর্নীতির মামলা আছে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমানের বিরুদ্ধেও। এ মামলায় রায় ঘোষণারও তারিখ দিয়েছিলেন আদালত। এ ক্ষেত্রে আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জনের অভিযোগ আমলে নিয়ে অনুসন্ধান চালায় দুদক। ১৯৯৭ সালের ৭ আগস্ট নোমানের সম্পদের হিসাব বিবরণী দাখিলের জন্য নোটিশ জারি করা হয়। তিনি এটি আমলে না নেওয়ায় ১৯৯৮ সালের ১৯ আগস্ট রাজধানীর ধানমন্ডি থানায় দুদকের কর্মকর্তা আবদুল্লাহ আল জাহিদ বাদী হয়ে নোমানের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন। এরপর ২০০০ সালের ৩০ মে অভিযোগপত্র দাখিল করা হয়। ২০০৪ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি নোমানের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করেন আদালত। অভিযোগপত্রে আটজনের মধ্যে বিভিন্ন সময় সাতজন আদালতে সাক্ষ্য দেন। এরপর আদালত রায় ঘোষণার তারিখ নির্ধারণ করেন।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ও তার স্ত্রী তাহেরা আলমকে বিদেশযাত্রায় নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে দুদক। তাদের সম্পদ বিবরণী জমা দিতেও দুদক নোটিশ দিয়েছে।