আ'লীগ নেতার বাধায় বন্ধ হয়ে গেল খাল খনন কাজ

প্রকাশ: ০৪ ফেব্রুয়ারি ২০২০   

ফরিদপুর অফিস

কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এভাবেই অলস পড়ে আছে এক্সকেভেটরগুলো -সমকাল

কাজ বন্ধ হয়ে যাওয়ায় এভাবেই অলস পড়ে আছে এক্সকেভেটরগুলো -সমকাল

ফরিদপুরের চরভদ্রাসন উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতির বাধায় মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেছে ডেল্টা প্ল্যানের অধীনে বাস্তবায়নাধীন একটি খাল খনন কাজ। এতে ওই এলাকার মানুষের মাঝে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। একইসঙ্গে মোটা অংকের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করার বিষয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েছেন সংশ্লিষ্টরা। 

জানা গেছে, প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক গৃহিত ডেল্টা প্ল্যানের অংশ হিসেবে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয় চরভদ্রাসনের পদ্মা নদী হতে আড়িয়াল খাঁ নদের সংযোগ খাল পুনঃখনন হিসেবে এই প্রকল্পটি গ্রহণ করে। এরই অংশ হিসেবে চলতি বছর প্রায় ৪ কোটি ৩১ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে হরিরামপুর ইউনিয়নে পদ্মা নদী থেকে জাকিরেরসুরা হয়ে রামনগরে আড়িয়াল খাঁ নদ পর্যন্ত প্রায় ৭ কিলোমিটার খালটি খননের কাজ পায় মেসার্স নূর এন্টারপ্রাইজ নামে একটি ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। গত বছরের ২৫ ডিসেম্বর হতে তারা খাল খননের কাজ শুরু করে। প্রায় দেড়কিলোমিটার খননের পর গত ২৯ জানুয়ারি রাতে কাজটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

খাল খননের কাজে ব্যবহৃত এক্সকেভেটর চালক নাসির মোল্লা, আনোয়ার হোসাইন ও সাইটের সাব-কন্ট্রাক্টর জিন্নাত ফকির অভিযোগ করেন, ২৯ জানুয়ারি রাতে চরভদ্রাসন উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ খান দলবল নিয়ে এসে তাদেরকে কাজ বন্ধ রাখার জন্য শাসিয়ে যায়। এ সময় তাদের হুমকি-ধমকি দেওয়া এবং নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয়।

জিন্নাত ফকির জানান, কাজ বন্ধ থাকলেও পাঁচটি এক্সকেভেটর মেশিনের ভাড়া বাবদ প্রতিদিন তাদের প্রায় সাড়ে ৩ লাখ টাকা গচ্চা যাচ্ছে। কাজ শুরু না হওয়া পর্যন্ত ক্ষতির পরিমাণ বাড়তেই থাকবে।

মেসার্স নূর এন্টার প্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. ইকবাল হোসেন জানান, আগামী দুই মাসের মধ্যে কাজটি সম্পন্ন করতে না পারলে বর্ষা মৌসুমে এই কাজ করা সম্ভব হবে না। কারণ তখন পদ্মার পানি বেড়ে যাবে এবং খালে পানি থাকার কারণে খনন কাজ করা যাবে না। 

তিনি জানান, এতে যেটুকু কাজ তিনি সম্পন্ন করেছেন তাও নষ্ট হয়ে যাবে।

জানা গেছে, উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল কালাম আজাদসহ ২১ জন বাদী হয়ে ভূমি মন্ত্রণালয় ও পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব, পাউবো ফরিদপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, জেলা প্রশাসক অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকসহ (রাজস্ব) ১৫ জনকে বিবাদী করে একটি রিট করেন। এ প্রেক্ষিতে বিচারপতি এফআরএম নাজমুল আহসান ও বিচারপতি কেএম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত একটি বেঞ্চ ২৯ জানুয়ারি রিটটির শুনানি শেষে রিটকারীদের সঙ্গে বিষয়টি নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেন। তবে উচ্চ আদালত খাল খননের এই কাজ বাস্তবায়নে কোন স্থগিতাদেশ দেননি। 

এ ব্যাপারে উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল কালাম আজাদ দাবি করেন, তিনি নিজে খাল খননের কাজ বন্ধ করার নির্দেশ দেননি। তারসহ আরো অনেকের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি রয়েছে ওই খালে। তাদের ক্ষতিপূরণের জন্য এলাকাবাসী কাজটি বন্ধ করে দিয়েছে।

ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুলতান মাহমুদ বলেন, সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয় হতে খালের জমি নির্দেশনা করে লাল পতাকা টাঙিয়ে দেওয়ার পরে খনন প্রকল্পটি গ্রহণ করা হয়। যখন ওই লাল পতাকা টাঙানো হয়েছিলো তখনই তারা আপত্তি জানাতে পারতো। কিন্তু এখন কাজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শেষ হওয়ার পর এভাবে কাজ বন্ধ করে দেওয়া মানে প্রকল্পটির ভবিষ্যতই অনিশ্চিত করে দেওয়া।

এব্যাপারে সরেজমিনে এলাকাবাসীর সঙ্গে আলাপকালে তারা স্থানীয় কৃষি ও নৌ যোগাযোগসহ নানা সুবিধার্থে খালটি খনন করা জরুরি বলে জানান। মো. মোসলেম উদ্দিন খান নামে সাবেক একজন ওয়ার্ড মেম্বার বলেন, খালটি পুনঃখনন করা হলে এলাকাবাসী ব্যাপক উপকৃত হবে।

ওই এলাকার কৃষক সামসুল বেপারী বলেন, খালটি খনন করা হলে আশেপাশের ইরি ব্লকে পানি দেওয়াসহ পাট জাগ দিতে সুবিধা হবে। কৃষকেরা কম খরচে নৌ পথে তাদের ফসল আনা নেওয়া করতে পারবে।

মো. হারুন মুন্সি (৬৫) নামে স্থানীয় মৌলভীর চরের একজন বাসিন্দা বলেন, ছোটবেলায় এই খালে লঞ্চ চলতে দেখেছি। আমরা এই পথেই যাতায়াত করতাম। খালটি খনন করা হলে এলাকাবাসী কৃষিকাজসহ নানা দিক দিয়েই উপকৃত হবেন। খাল খননের এই কাজটি যেনো বন্ধ হয়ে না যায় সেজন্য আমরা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিকট জোর দাবি জানাচ্ছি।

এ বিষয়ে ফরিদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা বলেন, সরকারি কাজে কেউ বাধা দিতে পারে না। প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ তুলতে পারে। 

তিনি বলেন, হাইকোর্টতো খাল খননের স্থাগিতাদেশ দেননি। তারপরও কেনো খালের খনন কাজ বন্ধ হলো বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।