চরভদ্রাসনে আ'লীগ নেতার বাধায় বন্ধ খাল খনন

প্রকাশ: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০     আপডেট: ০৫ ফেব্রুয়ারি ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

হাসানউজ্জামান, ফরিদপুর

চরভদ্রাসনে ডেল্টা প্ল্যানের আওতায় খাল খননের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে আওয়ামী লীগ নেতার নির্দেশে  - সমকাল

চরভদ্রাসনে ডেল্টা প্ল্যানের আওতায় খাল খননের কাজ বন্ধ হয়ে গেছে আওয়ামী লীগ নেতার নির্দেশে - সমকাল

ফরিদপুরের চরভদ্রাসনে উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ খানের বাধায় মাঝপথে বন্ধ হয়ে গেছে ডেল্টা প্ল্যানের আওতায় বাস্তবায়নাধীন একটি খাল খননের কাজ। এতে কৃষকসহ এলাকার মানুষের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের সঞ্চার হয়েছে। পাশাপাশি মোটা অঙ্কের আর্থিক ক্ষতির শিকার হচ্ছে খাল খননে নিযুক্ত ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান। প্রকল্পটি নির্ধারিত সময়ে সম্পন্ন করার বিষয়ে শঙ্কিত ঠিকাদারি-সংশ্নিষ্টরা। আগামী বর্ষা মৌসুমের আগে কাজ শেষ করতে না পারলে যেটুকু কাজ হয়েছে, তা-ও বিনষ্ট হয়ে যাবে বলে আশঙ্কা তাদের।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গৃহীত ডেল্টা প্ল্যানের অংশ হিসেবে পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় চরভদ্রাসনের পদ্মা নদী থেকে আড়িয়াল খাঁ নদের সংযোগ খাল পুনর্খনন হিসেবে প্রকল্পটি গ্রহণ করে। প্রায় চার কোটি ৩১ লাখ টাকা প্রাক্কলিত ব্যয়ে হরিরামপুর ইউনিয়নে পদ্মা নদী থেকে জাকিরেরসুরা হয়ে পার্শ্ববর্তী রামনগরে আড়িয়াল খাঁ নদ পর্যন্ত প্রায় সাত কিলোমিটার খালটি খননের কাজ পায় মেসার্স নূর এন্টারপ্রাইজ। ২০১৯ সালের ২৫ ডিসেম্বর এক্সক্যাভেটর মেশিন দিয়ে খনন শুরু করে প্রতিষ্ঠানটি। প্রায় দেড় কিলোমিটার খননের পর গত ২৯ জানুয়ারি কাজটি বন্ধ করে দেওয়া হয়।

এক্সক্যাভেটর চালক নাসির মোল্যা, আনোয়ার হোসাইন ও সাব-কন্ট্রাক্টর জিন্নাত ফকির অভিযোগ করেন, ২৯ জানুয়ারি রাতে চরভদ্রাসন উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ও স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদ খান দলবল নিয়ে এসে তাদের কাজ বন্ধ রাখার জন্য শাসিয়ে যান। এ সময় তাদের হুমকি-ধমকি ও নানাভাবে ভয়ভীতি দেখানো হয়। জিন্নাত ফকির জানান, কাজ বন্ধ থাকলেও পাঁচটি এক্সক্যাভেটর মেশিন ভাড়া বাবদ দিনে সাড়ে তিন লাখ টাকা গচ্চা যাচ্ছে। যত দিন কাজ শুরু না হবে, তত দিন ক্ষতির পরিমাণ বাড়তেই থাকবে।

নূর এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. ইকবাল হোসেন জানান, আগামী দুই মাসের মধ্যে কাজটি সম্পন্ন করতে না পারলে বর্ষা মৌসুমে এ কাজ করা সম্ভব হবে না। কারণ, তখন পদ্মার পানি বেড়ে যাবে এবং খালে ভরপুর পানি থাকার কারণে খননকাজ করা যাবে না। তিনি জানান, এতে যেটুকু কাজ সম্পন্ন হয়েছে, তা-ও নষ্ট হয়ে যাবে।

এ ব্যাপারে ইউপি চেয়ারম্যান আবুল কালাম আজাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, তারসহ অনেকের ব্যক্তিমালিকানাধীন জমি রয়েছে ওই খালে। ক্ষতিপূরণ না দেওয়ায় এলাকাবাসী কাজটি বন্ধ করে দিয়েছে।

জানা গেছে, আবুল কালাম আজাদসহ ২১ জন বাদী হয়ে ভূমি মন্ত্রণালয় ও পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব, পাউবো ফরিদপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, জেলা প্রশাসক, অতিরিক্ত জেলা প্রশাসকসহ (রাজস্ব) ১৫ জনকে বিবাদী করে রিট করেছেন। এর পরিপ্রেক্ষিতে বিচারপতি এফ আর এম নাজমুল আহাসান ও বিচারপতি কে এম কামরুল কাদেরের সমন্বয়ে গঠিত বেঞ্চ ২৯ জানুয়ারি শুনানি শেষে রিটকারীদের বিষয়টি নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেন। যদিও উচ্চ আদালত খাল খননকাজে কোনো স্থগিতাদেশ দেননি। তবে উচ্চ আদালতের আদেশের পর সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কোনো আলোচনা না করেই উপজেলা আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সভাপতি আবুল কালাম আজাদ রাতের অন্ধকারে দলবল নিয়ে কাজটি বন্ধ করে দেন।

এ ব্যাপারে ফরিদপুর পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী সুলতান মাহমুদ বলেন, সহকারী কমিশনারের (ভূমি) কার্যালয় থেকে খালের জমি নির্দিষ্ট করে লাল পতাকা টাঙিয়ে খনন শুরু করা হয়। লাল পতাকা টাঙানোর সময় তারা আপত্তি জানায়নি। কিন্তু এখন কাজের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ শেষ হওয়ার পর এভাবে কাজ বন্ধ করে দেওয়া মানে প্রকল্পটির ভবিষ্যৎই অনিশ্চিত করে দেওয়া।

সরেজমিনে গেলে এলাকাবাসী জানান, স্থানীয় কৃষি ও নৌ যোগাযোগসহ নানা সুবিধার্থে খালটি খনন জরুরি। সাবেক ওয়ার্ড মেম্বার মো. মোসলেমউদ্দিন খান বলেন, দীর্ঘদিনে খালটি ভরাট হয়ে গিয়েছিল। পুনর্খনন করা হলে এলাকাবাসী এতে উপকৃত হবে।

এলাকার কৃষক সামসুল বেপারী বলেন, খালটি খনন করা হলে আশপাশের ইরি ব্লকে পানি দেওয়াসহ পাট জাগ দিতে সুবিধা হবে। কৃষক কম খরচে নৌপথে তাদের ফসল আনা-নেওয়া করতে পারবেন।

মো. হারুন মুন্সি (৬৫) নামের মৌলভীর চরের এক বাসিন্দা বলেন, এই খালে একসময় লঞ্চ চলত। আমরা এ পথেই যাতায়াত করতাম। খালটি খনন করা হলে এলাকাবাসী কৃষিকাজসহ নানা দিক দিয়েই উপকৃত হবেন। 

এ বিষয়ে ফরিদপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আসলাম মোল্লা বলেন, সরকারি কাজে কেউ বাধা দিতে পারে না। প্রয়োজনে সংশ্নিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগ তুলতে পারেন। তিনি বলেন, হাইকোর্ট খাল খননের স্থগিতাদেশ দেননি, তবে কেন বন্ধ করা হলো, সে বিষয়টি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।