পুত্ররা পরীক্ষায়, নকল নিয়ে ব্যস্ত শিক্ষক পিতারা

প্রকাশ: ১৭ ফেব্রুয়ারি ২০২০   

বরিশাল ব্যুরো

সন্তান এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। আর পরীক্ষা কেন্দ্রের ওই কক্ষেই পরিদর্শকের দায়িত্ব পালন করছেন শিক্ষক বাবা বা মা। শুধু তাই নয়, পরীক্ষা শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে প্রশ্নপত্র পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে কেন্দ্রের বাইরে। বাইরে থেকে স্কুলের ম্যনেজিং কমিটির সদস্যরা ওই প্রশ্নের উত্তর তৈরি করে পাঠাচ্ছেন পরীক্ষা কক্ষে। দেখে দেখে সেই উত্তর লিখছে তাদের পরীক্ষার্থী সন্তানরা। 

চলমান এসএসসি পরীক্ষায় নকল সরবরাহ ও অনিয়মের এই অভিযোগ উঠেছে ঝালকাঠির নলছিটি উপজেলার বি জি ইউনিয়ন একাডেমি বাহাদুরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের কয়েকজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে। ওই কেন্দ্রের ৬ থেকে ৭ জন শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যের সন্তান এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে।

এ বিষয়ে নলছিটি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রুম্পা সিকদার বলেন, ওই পরীক্ষা কেন্দ্র বাতিল হয়ে যাবে। জেলা প্রশাসক এমনটাই মত দিয়েছেন। শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রকের কাছেও এ ধরনের অভিযোগ রয়েছে। অভিযুক্ত দু'জন শিক্ষককে এরই মধ্যে দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

জানা গেছে, নলছিটি বি জি ইউনিয়ন একাডেমি বাহাদুরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রে এ বছর মোট পরীক্ষার্থী ৯৬৭ জন। আশপাশের ১০টি স্কুলের শিক্ষার্থীরা এ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিচ্ছে। পরীক্ষার শুরু থেকেই এ কেন্দ্রে শিক্ষকদের সহায়তায় নকল করার অভিযোগ উঠেছে।

বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষক জোহরা পরীর ছেলে মো. রাহাত ওই কেন্দ্রেই পরীক্ষা দিচ্ছে। জোহরা পরী কেন্দ্রটিতে পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার স্বামী গোলাম কিবরিয়া পারভেজ প্রশ্নের উত্তর তৈরি করে ছেলেকে সরবরাহ করছেন। সহকারী শিক্ষিকা সুরাইয়া পারভিন শিউলির মেয়ে শশীও পরীক্ষার্থী। গত ৯ ফেব্রুয়ারি গণিত পরীক্ষা চলাকালে শিউলি ওই কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করেন। ওইদিন শিক্ষিকা শিউলির বাড়িতে অভিযান চালিয়ে প্রশ্নপত্র উদ্ধার করেন উপজেলার সহকারী কমিশনার (ভূমি)।

ম্যানেজিং কমিটির সদস্য সাইদুর রহমান বাচ্চু ওই বিদ্যালয়ের মধ্যে অবস্থিত প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক। তার ছেলে সিয়াম ও ভাইয়ের ছেলে আবির এসএসসি পরীক্ষা দিচ্ছে। নকল সরবরাহের জন্য আবিরের বাবা পাশের সরমহল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের অফিস সহকারী আল আমিনকে কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করতে রাখা হয়েছে। বাচ্চুর চাচা সরমহল মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শারীরিক শিক্ষা বিষয়ের শিক্ষক নান্না মিয়ার বিরুদ্ধে নাতি আবির ও সিয়ামকে অসাদুপায় অবলম্বনে সহায়তা করার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

একইভাবে ম্যানেজিং কমিটির সদস্য ইউনুস আলী হাওলাদারের মেয়ে তানজিলা ও সদস্য আ. জলিলের মেয়ে বিথি এবং সদস্য আ. সালাম সিকদারের ছেলে সম্রাট ওই কেন্দ্রের পরীক্ষার্থী। অভিযোগ রয়েছে, ওই কেন্দ্রের প্রশ্ন বাইরে নিতে সহযোগিতা করছেন সহকারী প্রধান শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন, শিক্ষক রেজাউল করিম ও আজমল হোসেন। তবে বিদ্যালয়ের সহকারী প্রধান শিক্ষক দেলোয়ার হোসেন বলেন, কেন্দ্র সচিব বললে তিনি দায়িত্ব পালন করেন মাত্র। নকল সরবরাহের সঙ্গে তিনি জড়িত নন।

এদিকে সোমবার পদার্থ বিজ্ঞান পরীক্ষায় নিয়ম বহির্ভুতভাবে বিজ্ঞান বিষয়ের দুই শিক্ষক ওই কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করেন। তারা হলেন রেজাউল করিম ও আ. সালাম।

বি জি ইউনিয়ন একাডেমি বাহাদুরপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয় কেন্দ্রের সচিব ও প্রধান শিক্ষক আলী হায়দার সিকদার স্বীকার করেন, তার বিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষক ও ম্যানেজিং কমিটির সদস্যের সন্তান এ কেন্দ্রে পরীক্ষা দিচ্ছে। তিনি বলেন, পরিদর্শকের ঘাটতি থাকায় সন্তান পরীক্ষা দিলেও সংশ্লিষ্ট দুই শিক্ষককে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল। এক শিক্ষিকার বাসা থেকে পরীক্ষা চলাকালে উত্তরপত্র উদ্ধার হলেও সেটা তার মেয়ের- এমন প্রমাণ পাওয়া যায়নি।

এ ব্যাপারে বরিশাল শিক্ষা বোর্ডের পরীক্ষা নিয়ন্ত্রক অরুন গাইন বলেন, ওই কেন্দ্রের পরীক্ষা সুষ্ঠুভাবে সম্পন্ন করতে ইউএনও এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসককে অবহিত করা হয়েছে। শিক্ষা বোর্ডের টিমও কেন্দ্রটি নজরদারিতে রেখেছে।