চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের গত নির্বাচনের আগে ২০১৫ সালের মার্চে নির্বাচন কমিশনে দেওয়া হলফনামায় আ জ ম নাছির উদ্দীন তার প্রায় ১২ কোটি টাকা মূল্যের সম্পদ আছে বলে ঘোষণা দেন। তবে তিন ব্যাংক ও এক বীমা প্রতিষ্ঠানে তখন তার সাড়ে আট কোটি টাকা ঋণ আছে বলেও হলফনামায় উল্লেখ করেন। কিন্তু মেয়র নির্বাচিত হওয়ার তিন মাসের মাথায় সাইফ পাওয়ার টেক লিমিটেড নামের আরেকটি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ অংশীদারিত্বে ৫০ কোটি টাকায় চট্টগ্রাম বন্দরে এনসিটি টার্মিনাল পরিচালনার কাজ নেন তিনি। আবার মেয়র নির্বাচিত হওয়ার ১৫ মাসের মাথায় শিশুপুত্রের জন্য দেড় কোটি টাকায় লেক্সাস ব্র্যান্ডের একটি বিলাসবহুল গাড়িও কেনেন। চট্টগ্রাম সিটি নির্বাচনে এবার আওয়ামী লীগের প্রার্থী মনোনয়নের আগে দলীয় সভাপতি ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে যাওয়া গোয়েন্দা সংস্থার একটি রিপোর্টে প্রশ্ন তোলা হয়েছে এসব নিয়ে। একই রিপোর্টে উল্লেখ আছে 'দানবীর' আ জ ম নাছিরের কথাও। গত সাড়ে চার বছরে সিটি করপোরেশন থেকে বেতন বাবদ পাওয়া পৌনে এক কোটি টাকার পুরোটাই তিনি গরিব-দুঃখীদের দান করেছেন। করপোরেশন থেকে নাছিরের কোনো জ্বালানি খরচ না নেওয়ার তথ্যও আছে রিপোর্টে। কিন্তু 'দানবীর' নাছির শেষ পর্যন্ত হেরে গেলেন বন্দর ব্যবসার আড়ালে।
এ ব্যাপারে মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দীন গতকাল মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সমকালকে বলেন, বৈধভাবে ব্যবসা করার অধিকার প্রত্যেক নাগরিকেরই আছে। চট্টগ্রাম বন্দরে আমার ব্যবসা ছিল মেয়র নির্বাচিত হওয়ার আগে থেকেই। মেয়র পদ ব্যবহার করে আমি কোথাও কোনো অন্যায় সুবিধা নিইনি। বরং নিজের বেতনের টাকা অসহায় ও অসচ্ছল মানুষের মধ্যে বিলিয়ে দিচ্ছি। প্রতি মাসে এক লাখ ৩৫ হাজার টাকা সম্মানী পেলেও সেই টাকা দান করছি অটিজম স্কুল, মেডিকেল, ইঞ্জিনিয়ারিংসহ বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অসহায় শিক্ষার্থী ও অসুস্থ রোগীদের জন্য। বেতন-ভাতা থেকে পাওয়া পৌনে এক কোটি টাকার পুরোটা অসহায়দের মধ্যে বিতরণ করেছি। এখনও করছি। আমি সিটি করপোরেশনের গাড়ি ব্যবহার করি না। জ্বালানি খরচও বহন করি নিজের পকেট থেকে। তারপরও আমার ব্যবসা নিয়ে কেন প্রশ্ন তোলা হচ্ছে। আমি যে ব্যবসায়ী তা হলফনামায়ও উল্লেখ আছে। আমার কেনো কিছু গোপন নেই।
এদিকে, এবার মেয়র পদে দলীয় মনোনয়নবঞ্চিত হওয়ার পর মিথ্যাচার, অপপ্রচার, অপরাজনীতি ও ষড়যন্ত্রের শিকার হয়েছেন বলে মন্তব্য করেছেন আ জ ম নাছির। গতকাল দুপুরে চট্টগ্রাম প্রেসক্লাবে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়ে তিনি এ কথা বলেন। তবে মনোনয়ন না পাওয়ায় কোনো ক্ষোভ, হতাশা, দুঃখ-কষ্ট ও আক্ষেপ নেই বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
কী ছিল নাছিরের হলফনামায়
মেয়র নির্বাচিত হওয়ার আগে দেওয়া হলফনামায় আ জ ম নাছির উল্লেখ করেন, বছরে তার আয় তিন কোটি ৬২ লাখ ৩২ হাজার ৭৪৪ টাকা। তার মোট ১১ কোটি ৯৯ লাখ ৫১ হাজার ১৫২ টাকার স্থাবর-অস্থাবর সম্পদ রয়েছে। এর মধ্যে নাছির নিজ নামে রেখেছেন ১১ কোটি ৫০ লাখ ৭৯ হাজার ২৬০ টাকার সম্পদ। আর তার স্ত্রীর নামে রয়েছে মাত্র ৪৮ লাখ ৭১ হাজার ৮৯২ টাকার সম্পদ। অস্থাবর সম্পত্তির মধ্যে নাছিরের নিজ নামে আছে এক লাখ ৮৪ হাজার ৬৯০ টাকা। আর স্ত্রীর নামে আছে ৪৫ হাজার ৫৭৯ টাকা। আয়ের উৎস হিসেবে তিনি প্রধানত দেখিয়েছেন ব্যবসা খাতকে। এ ছাড়া কোম্পানি থেকে পরিচালক ভাতা হিসেবে ৪২ লাখ টাকা, ওয়াকফ বেনিফিশিয়ারি হিসেবে সম্মানি তিন হাজার টাকা, অন্যান্য খাত থেকে ২৫ হাজার টাকা এবং ব্যাংক সুদ বাবদ ৪ হাজার ৭৪৪ টাকা বছরে আয় আছে বলে উল্লেখ করেন তিনি। বন্দরে বার্থ অপারেটর, সোয়েটার ফ্যাক্টরি, ডেভেলপার, ফিশিং, ঘাট ইজারা এবং তেল পরিবহন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত বলে হলফনামায় উল্লেখ করেছেন আ জ ম নাছির। কিন্তু নির্বাচনের সময় তিন ব্যাংক ও এক বীমা প্রতিষ্ঠানে তার মোট আট কোটি ৬৩ লাখ ৯৪ হাজার ৭২৪ টাকা ব্যাংক ঋণ ছিল বলে উল্লেখ করেছিলেন।
বন্দরে যেভাবে কাজ পেয়েছিল মেয়রের প্রতিষ্ঠান
৫০ কোটি টাকার ওপরে দর গেলে ফাইল যাবে ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটিতে। তাই চট্টগ্রাম বন্দরের এনসিটি পরিচালনায় আগ্রহী অপারেটররা চার জেটির প্রতিটি টেন্ডারেই দর দিয়েছে ৫০ কোটি টাকার নিচে! ২০১৫ সালে মেয়র হওয়ার তিন মাসের মাথায় এই এনসিটিরই ৪ ও ৫ নম্বর জেটিতে যৌথভাবে কাজ পায় মেয়র নাছিরের প্রতিষ্ঠান মেসার্স এমএইচ চৌধুরী, তরফদার রুহুল আমিনের সাইফ পাওয়ার টেক ও একরামুল করিমের এঅ্যান্ডজে এন্টারপ্রাইজ। দুই বছর এ দুটি জেটির কনটেইনার হ্যান্ডেল বাবদ বন্দর থেকে ৪৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা দর চেয়েছে তারা। জানা গেছে, নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনালের টেন্ডার নিয়ে আইনি জটিলতা তৈরি হওয়ার শঙ্কা থাকায় আগ্রহী অপারেটররা তখন মন্ত্রণালয়ের অধীনে রেখেই টেন্ডার কার্যক্রম অনুমোদন করানোর কৌশল নেয়। এ জন্য অবিশ্বাস্যভাবে সব জেটির দর ছিল ৫০ কোটি টাকার নিচে। ৪ ও ৫ নম্বর জেটিতে যোগ্য বিবেচিত হওয়া অপারেটররা ২ ও ৩ নম্বর জেটিতেও অংশ নেয়। কিন্তু সমঝোতার ভিত্তিতে সেখানে এককভাবে কাজ পায় সাইফ পাওয়ার টেক লিমিটেড।
জানতে চাইলে সাইফ পাওয়ার টেক লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তরফদার রুহুল আমিন বলেন, বৈধ প্রক্রিয়াতেই আমরা চট্টগ্রাম বন্দরে কাজ করছি। ২০১৫ সালে মেয়রের প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথভাবে আমরা দু'বছরের জন্য দুটি জেটি পরিচালনার কাজ করি। বছরে সাত লাখ কনটেইনার হ্যান্ডেল হওয়ার ধারণা নিয়ে তখন ৪৯ কোটি ৬৪ লাখ টাকা দর দিয়েছিলাম আমরা। সব নিয়ম মেনে এখনও আমরা সমঝোতার ভিত্তিতে কাজ করছি।
যেখানে ব্যতিক্রম ছিলেন নাছির
সিটি করপোরেশন থেকে বেতন-ভাতা ও জ্বালানি খরচ নিতেন না আ জ ম নাছির উদ্দীন। মেয়র হওয়ার প্রথম মাস থেকে তিনি এ টাকা বিতরণ করতে থাকেন অসহায় ও গরিব-দুঃখী মানুষের মধ্যে। গত সাড়ে চার বছরে বেতন-ভাতার প্রায় পৌনে এক কোটি টাকা এভাবে বিতরণ করেছেন তিনি। দেশে অন্য কোনো মেয়রের এভাবে বেতন-ভাতা না নেওয়ার নজির নেই। তিনি বেতনের টাকা দিয়ে দিয়েছেন অটিজম স্কুলে। টাকার অভাবে মেডিকেল কিংবা ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়তে না পারা অর্ধডজন শিক্ষার্থীকে পড়ার খরচও দিচ্ছেন নিয়মিত। প্রায় দুই ডজন অসুস্থ রোগীকে নিজের বেতন থেকে চিকিৎসা সহায়তা দিয়েছেন আ জ ম নাছির। প্রধানমন্ত্রীর কাছে দেওয়া গোয়েন্দা রিপোর্টে নাছিরের এই দানের কথাও উল্লেখ আছে। কিন্তু দলীয় কোন্দল ও বন্দরকেন্দ্রিক ব্যবসায় জড়ানোর কারণে এবার শেষ পর্যন্ত আর মনোনয়ন পাননি তিনি।



মন্তব্য করুন