প্রায় দেড়শ' বছরের পুরোনো কিশোরগঞ্জ সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয়। এই বিদ্যালয়ের খেলার মাঠে ১৯৭৩ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এসে জনসভা করেছিলেন। বিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. আলীম চৌধুরীর স্মৃতি। এই ছাত্রাবাসে থেকে তিনি বিদ্যালয়টিতে পড়াশোনা করেছিলেন। এই খেলার মাঠ, ছাত্রাবাস, মনোরম পুকুর ও স্টাফ কোয়ার্টার- সবই দখলে রেখেছে বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল নামে একটি ইংরেজি মাধ্যম শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। অন্তত দেড়শ' কোটি টাকার এ সম্পত্তি দখলমুক্ত করতে গত ১৩ বছর ধরে আন্দোলন করে আসছেন সরকারি বালক বিদ্যালয়ের প্রাক্তন এবং বর্তমান শিক্ষার্থীসহ অভিভাবক ও স্থানীয় বিশিষ্টজন। এ নিয়ে গতকাল রোববারও ছাত্র গণজমায়েত কর্মসূচি পালন করা হয়েছে।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানায়, ২০০৬ সালের ১৫ নভেম্বর শহরের আলোরমেলা এলাকায় সরকারি বালক বিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসের দুটি ভবন মাসিক ১২ হাজার টাকায় দুই বছরের জন্য ভাড়া নিয়ে বিয়াম ল্যাবরেটরি ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল চালু করা হয়। ছাত্রাবাসের পাশাপাশি বিয়াম স্কুল কর্তৃপক্ষ বালক উচ্চ বিদ্যালয়ের খেলার মাঠ, পুকুর এবং স্টাফ কোয়ার্টারও নিজেদের দখলে নিয়েছে। দেড় হাজার ছাত্র নিয়ে বালক বিদ্যালয়ে ডাবল শিফট চালু হওয়ায় দূরের ছাত্রদের আবাসন সংকট প্রকট আকার ধারণ করেছে। ছাত্রদের দুর্ভোগ লাঘবে ছাত্রাবাসটি ফেরত পাওয়া অত্যন্ত জরুরি হয়ে পড়েছে। কিন্তু বিয়াম স্কুল কর্তৃপক্ষকে বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও তারা দখল ছাড়েনি।

এ পরিস্থিতিতে গতকাল আবারও আন্দোলনে নামেন বিদ্যালয়ের বর্তমান ও সাবেক ছাত্ররা। বিদ্যালয়ের ১৯৭২ ব্যাচের ছাত্র মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার কামালকে আহ্বায়ক এবং মাসুদুল হাসান মাসুদ, রেজাউল করিম শিপন ও মাসুদ আল মামুন খানকে সমন্বয়কারী করে চার সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। এদিন সকাল সাড়ে ১১টায় বিদ্যালয় প্রাঙ্গণে ছাত্র গণজমায়েত কর্মসূচি পালন হয়। বর্তমান ছাত্ররা ক্লাস বর্জন করে কর্মসূচিতে যোগ দেন। এ সময় বক্তব্য দেন ভূমি পুনরুদ্ধার কমিটির আহ্বায়ক মুক্তিযোদ্ধা আনোয়ার কামালসহ সাবেক ছাত্র কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান মাসুদ আল মামুন খান, সাবেক ভাইস চেয়ারম্যান শেখ সেলিম কবির, যুবলীগ নেতা কামরুল ইসলাম উজ্জ্বল, সদর উপজেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সাধারণ সম্পাদক সাজ্জাদ হোসেন হৃদয়, জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক সাকাউদ্দিন আহমেদ রাজন। কর্মসূচিতে সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য দেন বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক একেএম আবদুল্লাহ, ছাত্র শিহাব ও জুবায়ের। ছাত্র গণজমায়েত শেষে একটি বিশাল বিক্ষোভ মিছিল শহর প্রদক্ষিণ করে।

বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও সংশ্নিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সাবেক চারদলীয় জোট সরকারের শেষ সময়ে প্রশাসনের ছত্রছায়ায় দ্বিতল ছাত্রাবাসটি দখল করে বিয়াম ল্যাবরেটরি স্কুল চালু করা হয়। তখনকার শিক্ষামন্ত্রী ড. এম. ওসমান ফারুক ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী জামায়াত নেতা আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের (যুদ্ধাপরাধ মামলায় মৃত্যুদণ্ডে দণ্ডিত) নির্দেশে তৎকালীন বিয়াম ফাউন্ডেশনের মহাপরিচালক শহিদুল আলম অবৈধ প্রভাব খাটিয়ে ছাত্রাবাসটি দখল করে বিয়াম স্কুল চালু করেন। একই সময়ে খেলার মাঠটিতে তুর্কি হোপ স্কুল চালু করার ভিত্তিপ্রস্তরও স্থাপন করা হয়। বঙ্গবন্ধু ও শহীদ বুদ্ধিজীবী ডা. এএফএম আলীম চৌধুরীর স্মৃতিবিজড়িত খেলার মাঠ এবং ছাত্রাবাসটি দখল করে নেওয়ায় সেই সময় বালক বিদ্যালয়ের ছাত্ররা আন্দালনে নামে। আন্দোলনের এক পর্যায়ে তুর্কি হোপ স্কুল প্রতিষ্ঠার কার্যক্রম স্থগিত রাখলেও ছাত্রাবাসটির দখল ছাড়েনি বিয়াম স্কুল। ধারাবাহিক আন্দোলনের মুখে বিয়াম স্কুল কর্তৃপক্ষ তাদের কার্যক্রম সীমিত রাখে। গত ৩০ জানুয়ারি বালক বিদ্যালয়ের অ্যালামনাই অ্যাসোসিয়েশনের অনুষ্ঠানে সাবেক ছাত্ররা খেলার মাঠ ও ছাত্রাবাস দখলের বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় আনেন। তারা অভিযোগ করেন, প্রশাসনের ছত্রছায়ায় এমন নজিরবিহীন অবৈধ দখল দেশে দ্বিতীয়টি নেই।

বিদ্যালয়ের কয়েকজন সিনিয়র শিক্ষক ও অভিভাবক জানান, ১৮৮১ সনে প্রতিষ্ঠিত কিশোরগঞ্জ বালক উচ্চ বিদ্যালয় ১৯৬৭ সালে সরকারি করা হয়। তখন বিদ্যালয়ের জন্য ৬ দশমিক ৫ একর জায়গার খেলার মাঠের দক্ষিণ দিকে দোতলা ছাত্রাবাস নির্মাণ করা হয়। তখন থেকেই জেলার হাওরাঞ্চলসহ আশপাশের এলাকার ছাত্ররা আবাসিক ছাত্র হিসেবে লেখাপড়া করে আসছিল।

২০০৬ সালের প্রথম দিকে তৎকালীন শিক্ষামন্ত্রী ওসমান ফারুক ও সাবেক শিক্ষাসচিব শহিদুল আলম কিশোরগঞ্জে বিয়াম ও তুর্কি হোপ ইংলিশ স্কুল প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন। একই বছরের ১৭ জুন প্রশাসনের ছত্রছায়ায় একরকম জোর করেই খেলার মাঠটি দখল করে নেয়। ওইদিন শিক্ষামন্ত্রী ওসমান ফারুক ও সমাজকল্যাণমন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মোজাহিদ খেলার মাঠে দুটিতে স্কুলের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন। এ ঘটনায় শহরে বিক্ষোভ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ হলে পুলিশি বাধায় তা পণ্ড হয়ে যায়।

বালক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক একেএম আব্দুল্লাহ বলেন, শত বছরের পুরোনো খেলার মাঠটি দখল করায় তখন আমরা হতবাক হয়েছিলাম। এ নিয়ে প্রতিবাদ করায় তৎকালীন প্রশাসন থেকে আমার ওপর চাপ প্রয়োগসহ নানাভাবে হুমকি-ধমকি দেওয়া হয়। তিনি বলেন, বিদ্যালয়ের তৎকালীন ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও জেলা প্রশাসক সিএম ইউসুফ হোসাইন বিয়াম স্কুলের জন্য মাসে ১২ হাজার টাকা ছাত্রাবাসটি ভাড়া দেন। অথচ তারা মাত্র তিন মাস ভাড়া প্রদান করেছিল। প্রধান শিক্ষক বলেন, ইতোমধ্যে আমাদের অনুমতি ছাড়াই সুবিশাল গেট নির্মাণ করে ছাত্রাবাস দখল করে নিয়েছে বিয়াম স্কুল কর্তৃপক্ষ। এ ছাড়া ছাত্রাবাসের জায়গায় অভিভাবক শেড, ক্যান্টিন ও সেন্ট্রিরুম তৈরি করে দখল পাকাপোক্ত করেছে।

এবার এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া কয়েকজ ছাত্র জানান, বিদ্যালয়ের ছাত্রাবাসটি দখল হওয়ায় শতাধিক আবাসিক ছাত্র অন্যের বাসাবাড়িতে লজিং থেকে পড়াশোনা করছেন। তারা আক্ষেপ করে বলেন, একটি ছাত্রাবাস দখল হয়ে যাবে, সরকার কিছুই করবে না- এটা কীভাবে হয়?

সার্বিক বিষয়ে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) দুলাল চন্দ্র সূত্রধর বলেন, বিয়াম স্কুল এবং সরকারি বালক উচ্চ বিদ্যালয় দুটি প্রতিষ্ঠানেই জেলাবাসী উপকৃত হচ্ছেন। বিয়াম কীভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, তা আমার জানা নেই। তবে দুটি প্রতিষ্ঠানই থাকুক এটা আমরা চাই। এ ব্যাপারে আলাপ-আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায়।

জেলা প্রশাসক সারওয়ার মুর্শেদ চৌধুরী বলেন, আলাপ-আলোচনা না করে কর্মসূচি দেওয়া ঠিক হয়নি। আলোচনার ভিত্তিতে সমস্যার স্থায়ী সমাধান হতে পারে। এ ব্যাপারে জেলা প্রশাসন সব সময় প্রস্তুত রয়েছে।