উদ্যোগ

আলো ছড়াচ্ছে আরিফের স্কুল ও পাঠাগার

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

মো. আতাউর রহমান মনির, লক্ষ্মীপুর

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোকিত স্কুল ও আলোকিত পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা আরিফ চৌধুরী শুভ	- সমকাল

শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোকিত স্কুল ও আলোকিত পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা আরিফ চৌধুরী শুভ - সমকাল

ফসলের মাঠের বুক চিরে সোজা রাস্তা চলে গেছে গ্রামের ভেতর। মেঠোপথের দু'পাশে গাছের সারি। বাতাসে যেন ছড়িয়ে পড়ছে সবুজের ঘ্রাণ। পথের পাশ দিয়ে বয়ে চলেছে খাল। সেই খালের বাঁকেই আলোকিত স্কুল ও আলোকিত পাঠাগার। লক্ষ্মীপুরের কুশাখালী ফরাশগঞ্জে আরিফ চৌধুরী শুভর উদ্যোগে গড়ে ওঠা প্রতিষ্ঠান দুটি এখন আলো ছড়াচ্ছে পুরো এলাকায়।
মাধ্যমিক, উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পার না হতেই কুশাখালীর মেয়েদের বিয়ে হয়ে যায়, ছেলেরা ছোটে শহরের দিকে কাজের খোঁজে। বছরের পর বছর এভাবেই চলছিল। এ গ্রামের এসএসসি পাস আরিফ চৌধুরী শুভ ছোটকাল থেকেই ভাবতেন গ্রাম নিয়ে। সেই ভাবনা পরিকল্পিত রূপ পায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার পর। গত এক দশক ধরে অন্ধকারে আলোর মশাল জ্বালানোর চেষ্টা করে চলেছেন আরিফ। শত বাধাবিপত্তি মোকাবিলা করে স্থানীয় তরুণদের সংগঠিত করেছেন, গড়ে তুলেছেন গ্রামীণ জনপদে পিছিয়ে থাকা সুবিধাবঞ্চিত শিশুদের জন্য বিনামূল্যের স্কুল ও পাঠাগার।
বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাড়িতে এলেই শুভ ছুটে যান শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও বাড়িতে বাড়িতে। শিক্ষার্থীদের উৎসাহ দেন। তার বিভিন্ন উদ্যোগ এরই মধ্যে গ্রামবাসীর প্রশংসা কুড়িয়েছে। ২০ বছর ধরে এলাকার যে রাস্তা ছিল সংস্কারহীন, সেটি সংস্কারের উদ্যোগ নিয়েছেন। নিরাপদ পানি পানের ব্যবস্থা করতে এলাকায় এ পর্যন্ত ২০টিরও বেশি গভীর নলকূপ বসানোর ব্যবস্থা করেছেন তিনি। এনজিওর সহায়তায় গৃহহীনদের নির্মাণ করে দিয়েছেন বসতঘর, বসিয়েছেন গভীর নলকূপ, সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করেছেন বাল্যবিয়েসহ বিভিন্ন ব্যাপারে, রোধ করেছেন রাতের অন্ধকারে রাস্তার দু'পাশের সরকারি গাছ কাটা। ২০ শিক্ষার্থীর পড়াশোনার ব্যয় বহনও করেন তিনি।
আলোকিত পাঠাগার ও স্কুলের প্রতিষ্ঠাতা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের ছাত্র আরিফ চৌধুরী শুভর জন্ম লক্ষ্মীপুরের কুশাখালি ইউনিয়নের দুর্গম এলাকা ফরাশগঞ্জে। ১৯৮৫ সালে তার বাবা মুক্তিযোদ্ধা ডা. মোমতাজ উদ্দিন ৭৮ শতাংশ জমি দান করেন একটি হাইস্কুল গড়ে তুলতে। ২০১৩ সালে বাবার স্মৃতিরক্ষায় 'ডা. মোমতাজ উদ্দিন আলোকিত স্কুল' গড়ে তোলেন আরিফ শুভ ও তার ভাই। তাদের সঙ্গে যুক্ত হন গ্রামের কলেজপড়ূয়া তরুণ নোমান হোসেন রাজু।
ফরাশগঞ্জ বাজারে একটি ভাড়া দোকানে মাত্র ১৩ জন শিক্ষার্থী নিয়ে যাত্রা শুরু করে আলোকিত স্কুল। পরের বছর শিক্ষার্থীর সংখ্যা বাড়লে বাজার থেকে একটু দূরে মাসিক এক হাজার টাকার ভাড়াবাড়িতে পাঠদান কার্যক্রম শুরু করেন উদ্যোক্তারা। মাত্র ১৩ শিশু নিয়ে একটি ক্লাসে শুরু হওয়া সেই স্কুলটিতে এখন শিক্ষার্থীর সংখ্যা শতাধিক। শিক্ষক ৫ জন। স্বল্প বেতনের এই শিক্ষকরা বিভিন্ন কলেজের শিক্ষার্থী ও স্থানীয় বাসিন্দা। প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় পুরো ইউনিয়নে দুইবারই শতভাগ পাস করেছে আলোকিত স্কুল। চলতি বছর ২১ ফেব্রুয়ারি আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে এই স্কুলের প্রভাতফেরির দৃশ্য বিবিসির সেরা ছবি হিসেবে নির্বাচিত হয়েছে।
গ্রামীণ শিক্ষার্থীদের বইপড়ার প্রতি আগ্রহী করে তুলতে ২০১৫ সালে আরিফ চৌধুরী শুভ গড়ে তোলেন আলোকিত পাঠাগার। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার পাশাপাশি টিউশনি করে টাকা জমিয়ে এটি গড়ে তোলেন তিনি। এই পাঠাগার প্রতিষ্ঠার শুরুতে তিনি গ্রামবাসী, এমনকি নিজের সহপাঠী কাউকেও পাননি। উদ্বোধনী আয়োজনে প্রায় ৪০০ গ্রামবাসীকে আমন্ত্রণ জানিয়েছিলেন। কিন্তু আসেননি একজনও। একটু অবাক হলেও মনোবল হারাননি শুভ। এরপর আসে নানা বিপত্তি। পাঠাগারে মলমূত্র ছোঁড়া, আগুন লাগানো, চাঁদাবাজি, আসবাব ভাঙার মতো নানা ঘটনাও ঘটে। অবশেষে মা ফাতেমা বেগমের সিদ্ধান্তে তিনি বাবার কবরের পাশে তৈরি করেন পাঠাগার। শত বাধা ঠেলে এখন তার পাঠাগারের সুফল পাচ্ছে আশপাশের প্রায় ৬টি গ্রামের শিক্ষার্থীরা। বই আছে হাজারের মতো। জাতীয় পাঠাগার আন্দোলনের (জাপাআ) প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি হওয়ার সুবাদে ওই সংগঠন থেকেও গ্রামের পাঠাগারটিকে সাহায্য করে আসছেন তিনি। আরিফের প্রতিষ্ঠিত জাপাআ সারাদেশে দুই শতাধিক পাঠাগার প্রতিষ্ঠা ও বিভিন্ন সেবা দিয়ে আসছে।
জ্ঞানার্জনে এখন পাঠাগারপ্রিয় হয়ে উঠছে লক্ষ্মীপুরের কুশাখালীর ছয়টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের তিন শতাধিক শিক্ষার্থী। 'আলোকিত সমাজ বিনির্মাণে আলোকিত মানুষ চাই'-এ স্লোগানে এ পাঠাগারকে ঘিরে বই পড়ার আনন্দে মেতেছে তারা।
কথা হয় আলোকিত পাঠাগারে নিয়মিত বই পড়তে আসা স্কুলছাত্রী তানিয়ার সঙ্গে। সে বলে, 'এখানে ছড়া ও গল্পের বই পড়ি। পাশাপাশি পত্রিকার মাধ্যমে বিভিন্ন খবরাখবরও জানতে পারি।' পাঠাগারের আরেক নিয়মিত পাঠক আয়শা বলেন, 'এখন অবসর সময়টুকু পাঠাগারে বিভিন্ন বই পড়ে কাটাই। কোনো কোনো বই বাড়িতেও নিয়ে যাই।'
আলোকিত পাঠাগারের প্রতিষ্ঠাতা আরিফ চৌধুরী শুভ বলেন, ছোটবেলা থেকেই গ্রামের মানুষের কষ্ট আমাকে তাড়িয়ে বেড়াত। তখন থেকেই চেষ্টা করতাম শিক্ষার আলো ছড়িয়ে দেওয়ার। অবশেষে সেই চেষ্টা খানিকটা হলেও সফল হয়েছে। তবে এ ধরনের প্রতিষ্ঠান টিকিয়ে রাখতে ও বিকশিত করতে সবার সহায়তা দরকার।
দিঘলী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বলাই চন্দ্র নাথ জানান, আরিফ চৌধুরী শুভর ফরাশগঞ্জ আলোকিত পাঠাগারটির সুফল পাচ্ছেন এলাকার বয়োজ্যেষ্ঠসহ সবাই। পাঠাগার গঠনে শুভর উদ্যোগ ছড়িয়ে পড়ূক সকল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে।
সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শফিকুর রিদোয়ান আরমান শাকিল জানান, অন্ধকার দূর করে আলো ছড়াচ্ছে দুর্গম এলাকায় ব্যক্তি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত পাঠাগারটি। এটি নির্মাণের কাজ মুগ্ধ করেছে তাকে। কোনো কিছু দরকার হলে সহায়তা করতেও প্রস্তুত রয়েছেন তিনি।