সন্তান প্রতিবন্ধী হওয়ায় স্বামীর ঘরে ঠাঁই হয়নি দুলালীর

প্রকাশ: ১৪ মার্চ ২০২০   

শামীম হাসান মিলন, চাটমোহর (পাবনা)

মায়ের কোলে শিশু দুর্জয়- সমকাল

মায়ের কোলে শিশু দুর্জয়- সমকাল

পাবনার চাটমোহর উপজেলার ডিবিগ্রাম ইউনিয়নের একটি গ্রাম 'কাঁটাখালী'। গ্রামের নামের মতোই কাঁটাবিদ্ধ হয়েছেন দুলালী খাতুন নামে এক গৃহবধূ। তিনি কেন প্রতিবন্ধী সন্তান জন্ম দিলেন সেই 'অপরাধে' তাকে ঠাঁই দেওয়া হয়নি শ্বশুরবাড়িতে। দুই বছর ধরে মায়ের বাড়িতে চরম মানসিক ও আর্থিক কষ্টে দিন কাটছে দুলালীর।

কাঁটাখালী কান্দিপাড়া গ্রামের রব্বান খানের ছেলে দিনমজুর আলামিনের সঙ্গে তিন বছর আগে বিয়ে হয় দুলালীর। এনজিও থেকে কিস্তি নিয়ে বিয়েতে যৌতুক হিসেবে দেওয়া হয় ১০ হাজার টাকা, একটি বাইসাইকেলসহ নানা জিনিসপত্র। পরে কিনে দেওয়া হয় একটি ব্যাটারিচালিত অটোভ্যান। বিয়ের পর ভালোই কাটছিল তাদের সংসারজীবন। দুলালীর কোলজুড়ে আসে একটি ছেলেসন্তান। নাম রাখা হয় দুর্জয়। জন্মের পরই দুর্জয় অসুস্থ হলে চিকিৎসকের কাছে নিয়ে যাওয়া হয়। মায়ের অপুষ্টির কারণে সন্তান শারীরিক প্রতিবন্ধী হয়েছে বলে জানান চিকিৎসক। এর পরই ঘটে বিপত্তি। স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন যখন বুঝতে পারেন দুলালীর গর্ভে জন্ম নেওয়া সন্তান প্রতিবন্ধী, তখন থেকেই তার ওপর নেমে আসে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন। এক পর্যায়ে বের করে দেওয়া হয় বাড়ি থেকে।

বিধবা মা খইচন বেওয়ার কাছে ঠাঁই হয় দুলালীর। দুই বছর ধরে দুলালী অসুস্থ সন্তানকে নিয়ে বাবার কুঁড়েঘরে অর্ধাহারে-অনাহারে দিন কাটালেও মন গলেনি স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজনের। তাদের এমন অমানবিক আচরণের বিচার চেয়ে গ্রামপ্রধানদের কাছে গেলেও মেলেনি প্রতিকার। দুলালী প্রতিবন্ধী সন্তানকে বুকে আগলে রেখেছেন শত কষ্টের মাঝেও। ধারদেনা করে চিকিৎসা করাতে গিয়ে নিঃস্ব হয়ে পড়েছেন তিনি। ছেলেকে সুস্থ করতে চাইলে ঢাকায় ভালো কোনো চিকিৎসককে দেখানোর পরামর্শ দেন পাবনার শিশু বিশেষজ্ঞ ডা. নীতিশ কুমার। কিন্তু টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না। সন্তানের চিকিৎসার জন্য জনপ্রতিনিধি ও সমাজের বিত্তবানদের দ্বারে দ্বারে ঘুরেও মেলেনি কোনো সহযোগিতা।

দুলালী খাতুন বলেন, 'অসুস্থ সন্তান জন্ম দেওয়া কি আমার অপরাধ। মাঝেমধ্যে মনে হয় আত্মহত্যা করি। কিন্তু ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে পারি না। ওর বাবা মুখ ফিরিয়ে নিলেও আমার জীবনটা এই ছেলের মধ্যে। আমি ছাড়া কে দেখবে দুর্জয়কে।' তিনি আরও বলেন, ছোটবেলায় বাবা মারা গেলেন। মা অনেক কষ্টে মানুষের বাড়িতে কাজ করে আমাকে বিয়ে দিলেন। কিন্তু কোনো দিকেই সুখ পেলাম না। কথা বলতে বলতে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়েন দুলালী।

জানতে চাইলে বিষয়টি এড়িয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেন দুলালীর শ্বশুর রব্বান খান। পরে তিনি বলেন, আমি ছেলেকে বের করে দিয়েছিলাম, ছেলের বউকে নয়। আমি বৌমাকে ফেরানোর চেষ্টা করেছি; কিন্তু সে আসেনি। ছেলে এখন চট্টগ্রামে থাকে। সে আমার ফোনও ধরে না। এখানে আমার করার কিছু নেই।

স্থানীয় ইউপি সদস্য হাফিজুল ইসলাম বলেন, কয়েক মাস আগে রাগের মাথায় আলামিন স্ত্রী দুলালীকে মুখে মুখে ছেড়ে দিয়েছিল। আমরা গ্রামপ্রধানদের নিয়ে বসে সেটা মীমাংসা করে দিয়েছিলাম। পরে কী হয়েছে জানি না। ওরা কেউ আসেনি আমার কাছে।

স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান নবীর উদ্দিন মোল্লা বলেন, বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে এমনটা হয়ে থাকলে জঘন্য অপরাধ করেছে ছেলেপক্ষ। আমি এ ব্যাপারে খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিচ্ছি।