বাঁচতে চাইলে ৬ মাস গুম হয়ে থাকবি, বিশ্বনাথকে আরডিসি নাজিম

প্রকাশ: ১৭ মার্চ ২০২০     আপডেট: ১৭ মার্চ ২০২০   

কুড়িগ্রাম প্রতিনিধি

হাসপাতালে ভর্তি বিশ্বনাথ নমদাস- সমকাল

হাসপাতালে ভর্তি বিশ্বনাথ নমদাস- সমকাল

'তোমার ক্রসফায়ারের অর্ডার হয়ে গেছে। বাঁচার একটা পথ আছে। আমি রেকর্ড চালু করছি। যেভাবে বলতে বলি, সেভাবে বলবা।... সাংবাদিক বা অন্য কেউ জিজ্ঞেস করলে বলবা আমাকে ম্যাজিস্ট্রেট মারেনি। সাংবাদিক আমাকে শেখায় দিছে। আর তুমি এখান থেকে সোজা রংপুর যাবা। যায়া মোবাইল বন্ধ করে রাখবা। বাড়ির কাউকে ফোন দিবা না। ছয় মাস ওখানে গুম হয়া থাকবা। তোমার কোনো কিছু চাওয়ার থাকলে আমার নম্বর দিলাম, এই নম্বরে ফোন দিবা। টাকা পৌঁছে দেবো।'

মঙ্গলবার সকালে জেলা কারাগার থেকে বের করে গাড়িতে করে নিজের বাসায় নিয়ে গিয়ে বিশ্বনাথ নমদাসকে (৩৪) এভাবে হুমকি-ধমকি দেন সদ্য প্রত্যাহার হওয়া কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর (আরডিসি) নাজিম উদ্দিন। এরপর আবার গাড়িতে করে তাকে খলিলগঞ্জ বাজারে নিয়ে গিয়ে রংপুরগামী বাসে তুলে দিতে চেষ্টা করেন তিনি। 'একটু পরে যাচ্ছি' বলে কৌশলে সেখান থেকে পালিয়ে শহরের বানিয়াপাড়া এলাকায় বোন শুক্লা দাসের বাড়িতে গিয়ে ওঠেন বিশ্বনাথ। বোন-ভগ্নিপতি সকাল ১০টার দিকে তাকে জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। হাসপাতালের সার্জারির ওয়ার্ডের ৬ নম্বর বেডে শুয়ে গতকাল সকালে ঘটে যাওয়া ঘটনার বর্ণনা দেন তিনি।

বিশ্বনাথের অভিযোগের বিষয়ে মোবাইলে যোগাযোগ করা হলে আরডিসি নাজিম উদ্দিন বিস্ময় প্রকাশ করে বলনে, 'এই দুনিয়ায় থাকাই দুস্কর হয়ে পড়েছে। এগুলো সত্য নয়।' গত শুক্রবার মধ্যরাতে বাংলা ট্রিবিউনের জেলা প্রতিনিধি আরিফুল ইসলাম রিগ্যানকে নির্যাতনের ঘটনায় জেলা প্রশাসকসহ অন্য কর্মকর্তাদের সঙ্গে আরডিসি নাজিম উদ্দিনকেও প্রত্যাহার করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে ন্যস্ত করা হয়। গতকাল বিকেল ৩টার দিকে কুড়িগ্রাম ছাড়েন নাজিম।

একটি উন্মুক্ত জলাশয়ে মাছের পোনা ছাড়ার ঘটনায় গত ২৬ ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে যায় বিশ্বনাথ নমদাস ও তার সঙ্গী আঙ্গুরের বাবা খালেকুজ্জামান মজনুকে। রাতেই ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে বিশ্বনাথকে দুই বছর এক মাস ও খালেকুজ্জামান মজনুকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দেন আরডিসি নাজিম উদ্দিন।

বিশ্বনাথ নমদাসের জামিনের বিষয়ে অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির জানান, বিশ্বনাথ নমদাসের নিযুক্ত আইনজীবী হিসেবে গত ১ মার্চ জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের কাছে আপিল, জামিন ও নথি তলবের আবেদন দাখিল করেছিলেন। এরই পরিপ্রেক্ষিতে সোমবার বিকেলে শুনানির জন্য অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের আদালতে তাকে ডাকা হয়। তিনি বিকেল ৪টা ৪০ মিনিটে শুনানি শুরু করেন। ৫টার মধ্যে শুনানি শেষ হলে জামিন মঞ্জুর করা হয়। সঙ্গে সঙ্গে জামিনের আদেশ কারাগারে পাঠানো হয়। গতকাল সকালে মুক্তি পান বিশ্বনাথ।\হগতকাল দুপুরে ভিতরবন্দ ইউনিয়নের পঞ্চায়েতপাড়া গ্রামে গেলে নাজিমের নির্যাতনের শিকার খালেকুজ্জামান মজনু (৭০) বলেন, 'ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় দুই লাখ টাকা দিলে ছেড়ে দেবেন বলে প্রস্তাব দেন আরডিসি। কোনো দোষ করিনি, টাকা দেবো কেন- বলায় আমাকে ছয় মাসের কারাদণ্ড দিয়েছে। ছেলেরা পরদিন প্রায় দেড় লাখ টাকা খরচ করে আমাকে জামিনে মুক্ত করে আনে।'

জেলা হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিষ্টান ঐক্য পরিষদের সভাপতি এসএম ছানালাল বকসী বিচার বিভাগীয় তদন্ত করে এই গর্হিত কাজের জন্য আরডিসি নাজিম উদ্দিনের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দাবি করেছেন।