মুন্সীগঞ্জের টঙ্গিবাড়ীর নাটেশ্বর বৌদ্ধ নগরী আবিস্কারের পর এবার আবিস্কৃত হয়েছে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ পিরামিড আকৃতির নান্দনিক স্তূপ। ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে প্রত্নতাত্ত্বিক খননে আবিস্কৃত হলো এটি। এতে স্থাপত্যটির অনেক রূপ ফুটে উঠেছে। তার মধ্যে মেদির দেয়াল ৬৪ সেন্টিমিটার উঁচু ও প্রশস্ত প্রায় তিন মিটার। অন্য অংশে তিন মিটার পর্যন্ত টিকে আছে কোনো কোনো জায়গায়। দেয়ালের বহিঃপার্শ্বে চারটি প্যানেলে বিভক্ত মনোরম নকশা তৈরি করা হয়েছে। কেন্দ্রের অংশটি মাটি দিয়ে ভরাট করা। ফলে নিরেট আকার ধারণ করেছে স্তূপটি। দুই বছর আগে নাটেশ্বরের এ স্থাপত্যটির উত্তর ও পূর্ব বাহুর অংশবিশেষ উন্মোচিত হয়েছিল।
গতকাল বুধবার বিকেলে টঙ্গিবাড়ীর নাটেশ্বর গ্রামে আবিস্কৃত দেড় হাজার বছরের প্রাচীন বৌদ্ধ নগরীর স্থানে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. নূহ-উল-আলম লেনিন এসব তথ্য উল্লেখ করে আরও জানান, ২০১২ থেকে ২০১৫ সালের চলমান সময়ের মধ্যে নাটেশ্বর গ্রামের খননের মাধ্যমে বেরিয়ে আসে বৌদ্ধ মন্দির, অষ্টকোনাকৃতি স্তূপ, ইট নির্মিত নালা, রাস্তাসহ বিভিন্ন স্থাপনা। খননকাজ অব্যাহত রাখায় ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে আবিস্কৃত হয়েছে দেশের সর্ববৃহৎ দুষ্প্রাপ্য পিরামিড আকৃতির নান্দনিক স্তূপের ৪৪ মিটার দীর্ঘ দক্ষিণ বাহু। এটির সময়কাল জানতে আমেরিকার বেটা অ্যানালাইটিক ইন্‌ক ল্যাব থেকে কার্বন-১৪ তারিখ নির্ণয় করা হয়েছে ৭৮০-৯৫০ খ্রিস্টাব্দ।
খননকাজের তত্ত্বাবধানে থাকা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাহ সুফি মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, 'বৌদ্ধ ধর্মে স্তূপ একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থাপত্য। স্তূপ মূখ্যত সমাধি। তবে এটি বৌদ্ধ ধর্ম, দর্শন ও সংস্কৃতিকেও প্রতিনিধিত্ব করে। এই স্থাপত্যের মাধ্যমে গৌতম বুদ্ধ ও তার প্রবর্তিত বৌদ্ধ ধর্মকে প্রতীকায়ন হিসেবে উপস্থাপিত করা হয়। স্তূপটি ব্যতিক্রমী, পিরামিড আকৃতির। এই আকৃতি নিজে একটি তাৎপর্য বহন করে এবং বাংলাদেশে এই প্রথম। পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের জন্মভূমি বিক্রমপুরে প্রায় ১২০০ বছর আগের স্তূপ আবিস্কার অত্যন্ত তাৎপর্যপূণ ঘটনা। বিশালত্বের দিক থেকে এটি সাঁচী, ভারহুত, অমরাবতী, সারনাথসহ পৃথিবী বিখ্যাত মহাস্তূপগুলোর সঙ্গে তুলনীয়। যার সময়কাল বিবেচনায় এটি পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের (৯৮২-১০৫৪ খ্রিষ্টাব্দ) পূর্বের কীর্তি।'
অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি ড. নূহ-উল-আলম লেনিন জানান, অতীশ দীপংকর শ্রীজ্ঞানের জন্মের আগেই বিক্রমপুরে সমৃদ্ধ একটি বৌদ্ধ সভ্যতা ও সংস্কৃতি বিকশিত ছিল; সেই উঁচুমানের সভ্যতায় বিশ্ববরেণ্য পণ্ডিত অতীশ দীপংকর শ্রীজ্ঞানের জন্ম ও বেড়ে ওঠা। সে কারণে হাজার বছর আগে পণ্ডিত অতীশ দীপংকর শ্রীজ্ঞানের জ্ঞানগরিমায় অভিভূত হয়ে তিব্বতের বৌদ্ধ ধর্ম রক্ষার জন্য তাকে আমন্ত্রণ জানান চীনের রাজা। তিনি চীনে এখনও পূজনীয়। বৌদ্ধ ধর্ম রক্ষা ছাড়াও তিনি কৃষিপ্রযুক্তি ও ওষুধ প্রযুক্তি নিয়ে চীনে গিয়েছিলেন। এখনও চীন সরকার এবং জনগণ পণ্ডিত অতীশ দীপঙ্কর শ্রীজ্ঞানের অবদানের কথা কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্বীকার করে। তার জীবনীগ্রন্থে উল্লেখিত নগর ও অট্টালিকার সঙ্গে নাটেশ্বরে আবিস্কৃত বিশাল আকৃতির স্তূপের মিল পাওয়া যায়। বেশির ভাগ তিব্বতীয় ঐতিহাসিক সাক্ষ্য অনুসারে অতীশ দীপঙ্কর প্রাচীন পূর্ব ভারতের ঝাহরের (তধযড়ৎ) এক রাজকীয় পরিবারে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। সেই নগরে হাজার হাজার ভবন রয়েছে। নগরের প্রাসাদটি সোনার অলংকরণে সাজানো। বর্তমানের প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ এবং খনন এখনও সমাপ্ত হয়নি, কিন্তু এরই মধ্যে যে সব প্রত্নবস্তুু আবিস্কৃত হয়েছে তা বিভিন্ন তাম্রলিপিতে বিক্রমপুর নামে যে রাজধানী নগরের উল্লেখ পাওয়া যায়, তারই প্রমাণ দিচ্ছে।
খননকাজ তত্ত্বাবধানে থাকা জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক শাহ সুফি মোস্তাফিজুর রহমান জানান. অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে ২০১১ সাল থেকে প্রাচীন নিদর্শন ও প্রত্নতাত্ত্বিক সম্পদ উদ্ধারে প্রত্নতত্ত্ব জরিপ ও খননকাজ শুরু হয়। এতে সদরের রামপাল ইউপির রঘুরামপুর গ্রামে আবিস্কত হয় হাজার বছরের বৌদ্ধবিহার ও টঙ্গিবাড়ীর নাটেশ্বরে বৌদ্ধমন্দির এবং রামপাল ইউপির বল্লালবাড়ী এলাকায় আবিস্কৃত হয় সেন বংশের রাজবাড়ি। এ ছাড়া বৌদ্ধবিহার আবিস্কার হওয়ার পর আশপাশ এলাকায় খননকাজ চলাকালে টঙ্গিবাড়ীর নাটেশ্বর গ্রামে আবিস্কৃত হয় দেড় হাজার বছরের প্রাচীন বৌদ্ধ নগরী। ২০১২ থেকে ২০১৫ সালের চলমান সময়ের মধ্যে নাটেশ্বর গ্রামের খননের মাধ্যমে বেরিয়ে আসে বৌদ্ধমন্দির, অষ্টকোনাকৃতি স্তূপ, ইট নির্মিত নালা, রাস্তাসহ বিভিন্ন স্থাপনা। এ খননে দেড় হাজার বছরের বৌদ্ধযুগের প্রাচীন নগরের নিদর্শন আবিস্কৃত হয়। আর ২০১৯-২০২০ অর্থবছরে আবিস্কৃত হলো বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ দুষ্প্রাপ্য পিরামিড আকৃতির নান্দনিক স্তূপের ৪৪ মিটার দীর্ঘ দক্ষিণ বাহু।
সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বিক্রমপুর জাদুঘরের কিউরেটর অধ্যাপক মো. শাহজাহান মিয়া, অগ্রসর বিক্রমপুর ফাউন্ডেশনের কেন্দ্রীয় পর্ষদের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক জাহাঙ্গীর আলম, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক আবির-বিন-কায়সার, গবেষণা সহযোগী মামুন দেওয়ান, ড. মাহবুবুল আলম, মো. আওলাদ হোসেন প্রমুখ।

বিষয় : প্রত্নতত্ত্ব নিদর্শন

মন্তব্য করুন