করোনাভাইরাসের প্রভাবে দেশের প্রধান পর্যটন কেন্দ্র কক্সবাজারে বিপর্যয় নেমে এসেছে। চার শতাধিক হোটেল, মোটেল ও গেস্ট হাউস দুই সপ্তাহ ধরে বন্ধ রয়েছে। পাশাপাশি বন্ধ রয়েছে বিমান, জাহাজ, সড়ক পরিবহনসহ পর্যটন খাতে নিয়োজিত অন্যান্য ব্যবসা। এতে এই শিল্পে নিয়োজিত লক্ষাধিক শ্রমিক-কর্মচারী বেকার হয়ে পড়েছেন।

সংশ্নিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, কক্সবাজারে চার শতাধিক হোটেল, মোটেল ও গেস্ট হাউস বন্ধ থাকায় এখানে অধিকাংশ শ্রমিক-কর্মচারীকে ছুটি দেওয়া হয়েছে। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে পাঁচ শতাধিক খাবার হোটেলও। পর্যটনকেন্দ্রিক সব ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও বন্ধ রয়েছে। ফেডারেশন অব ট্যুরিজম ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সাধারণ সম্পাদক আবুল কাশেম জানান, পর্যটন জেলা কক্সবাজারে প্রতিবছর প্রায় দুই কোটি পর্যটক আসেন। তাদের যাতায়াতে প্রতিদিন দুই শতাধিক দূরপাল্লার বাস ও ১০/১২টি বিমান কাজ করে। এখানে পর্যটকদের জন্য চার শতাধিক হোটেল, মোটেল ও কটেজ এবং পাঁচ শতাধিক রেস্তোরাঁ রয়েছে। পর্যটকদের ভ্রমণকে আরামদায়ক করতে শতাধিক ট্যুর অপারেটর প্রতিষ্ঠান কাজ করে। বিভিন্ন পর্যটন কেন্দ্রে কাজ করেন তিন শতাধিক ক্যামেরাম্যান। এ ছাড়া শামুক-ঝিনুকের দোকানসহ বিভিন্ন পণ্য বিক্রি করেন হাজারো ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী।

আবুল কাশেম বলেন, করোনার কারণে পর্যটন ব্যবসা ২০ মার্চ থেকে বন্ধ। অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ঈদুল ফিতরের আগের দিন পর্যন্ত বন্ধ থাকবে। সেই হিসাবে দুই মাসে কয়েক হাজার কোটি টাকার লোকসান গুনতে হবে সংশ্নিষ্ট ব্যবসায়ীদের। তিনি বলেন, ব্যবসা-বাণিজ্য বন্ধ থাকলেও রক্ষণাবেক্ষণ খরচ গুনতে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের। কর্মকর্তা- কর্মচারীদের বেতন, বিদ্যুৎ বিল, টেলিফোন বিলসহ নানা খাতে লোকসানের পরিমাণ বেড়েই যাচ্ছে।

ট্যুর অপারেটর ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজার (টুয়াক)-এর যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান মিল্ক্কী বলেন, কক্সবাজার জেলায় শতাধিক ট্যুরিজম প্রতিষ্ঠান কাজ করে। তাদের প্রত্যেকের অফিস ও কর্মচারী রয়েছে। ব্যবসা বন্ধ থাকলেও অফিস ভাড়া, বিদ্যুৎ বিল এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাবদ প্রতিদিন কমপক্ষে লক্ষাধিক টাকা লোকসান গুনতে হবে তাদের। এভাবে পর্যটন-সংশ্নিষ্ট এই ব্যবসায়ীদের দুই মাসে প্রায় ৫শ' কোটি টাকা ক্ষতি হবে।

ভর মৌসুম হলেও কক্সবাজারে শুঁটকি উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। সাগরে যাচ্ছেন না জেলেরা। শুকানোর জন্য শ্রমিকের অভাব। সব মিলিয়ে এর সঙ্গে সংশ্নিষ্টদের গুনতে হচ্ছে শতকোটি টাকা লোকসান। নাজিরারটেক শুঁটকি উৎপাদন সমিতির সভাপতি আতিকুর রহমান বলেন, ছুরি, লইট্টা, পোয়াসহ অনেক ধরনের মাছ মিলিয়ে ৬ হাজার টন শুকানো মাছ গুদামে পড়ে রয়েছে। এই শুঁটকি নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। ভর মৌসুমেও করোনার কারণে শুঁটকি উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। পর্যটক না থাকায় শুঁটকি বেচাকেনা নেই। শুঁটকি ব্যবসায়ীদের পথে বসার উপক্রম হয়েছে।

কক্সবাজার জেলা মৎস্য কর্মকর্তা এস এম খালেকুজ্জমান বলেন, করোনার কারণে শুঁটকি ব্যবসায়ীদের কিছু লোকসান হচ্ছে, এটা সত্যি। জেলেরা করোনার ভয়ে সাগরে মাছ আহরণে যাচ্ছেন না। তাই শুঁটকি উৎপাদন গত বছরের তুলনায় ৪০ ভাগ কমে গেছে।

অন্যদিকে কক্সবাজার দোকান মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আমিনুল ইসলাম মুকুল বলেন, সামনে বৈশাখ। গত বছর এই সময়ে শতকোটি টাকার ব্যবসা হয়েছে। কিন্তু এবারে করোনার কারণে দোকান বন্ধ। পর্যটন শিল্প বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ীদের এই লোকসান কোনোভাবে পূরণ হওয়ার সম্ভাবনা নেই।

কক্সবাজার চেম্বার অব কমার্সের সভাপতি মো. আলী বলেন, করোনা পরিস্থিতির কারণে সরকার বিভিন্ন খাতে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য প্রণোদনা দেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছে। পর্যটন শিল্প-সংশ্নিষ্টদের জন্য বিশেষ অগ্রাধিকার দিতে হবে। না হলে এই শিল্প আর দাঁড়াতে পারবে না।