সরেজমিন কর্ণফুলী

সাম্পানওয়ালাদের দুর্দিন

প্রকাশ: ০৬ এপ্রিল ২০২০     আপডেট: ০৬ এপ্রিল ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

আহমদ উল্লাহ,পটিয়া (চট্টগ্রাম)

যাত্রী নেই বললেই চলে। ঘাটে নোঙর ফেলে অলস সময় কাটছে সাম্পানওয়ালাদের। ছবিটি কর্ণফুলীর চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের ব্রিজঘাট এলাকার - সমকাল

যাত্রী নেই বললেই চলে। ঘাটে নোঙর ফেলে অলস সময় কাটছে সাম্পানওয়ালাদের। ছবিটি কর্ণফুলীর চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের ব্রিজঘাট এলাকার - সমকাল

'সাম্পান মাঝি সাম্পান বায়,/আগের মতো পেসিঞ্জার ন পায়/নৌকার মাথিত ইঞ্জিল দেখি/মানুষ গেইয়ে হেইখ্যা ঝুখি,/সরে সরে আইবু যাইবু,/দেরি গইত্যু কনে চায়'- গানের এই কথাগুলোর সঙ্গে এখন হুবহু যেন মিলে গেছে কর্ণফুলীর সাম্পান মাঝি পেয়ার মোহাম্মদের জীবন। বয়স তার ষাট। সত্তরের দশকে সংসারের হাল ধরতে শক্ত করে ধরেছিলেন সাম্পানের দাঁড়। শত প্রতিকূলতায়ও গত চার দশকে সেই দাঁড় আর ছাড়েননি। কিন্তু এবার একেবারেই অন্যরকম এক সময় এসে আঘাত হেনেছে তাকে।

অবশ্য শুধু পেয়ার মোহাম্মদ নন, কর্ণফুলীতীরের দুই হাজারের বেশি মাঝি উদ্বিগ্ন এখন। করোনাভাইরাস প্রতিরোধের অংশ হিসেবে অঘোষিত লকডাউনে বন্ধ হয়ে গেছে কর্ণফুলীর বিভিন্ন ঘাট দিয়ে যাত্রী পরিবহন। এখন আর কারও কণ্ঠে শোনা যায় না- 'ওরে সাম্পানওয়ালা, তুই আমারে করলি দিওয়ানা।' বরং বুক ফুঁড়ে উঠে আসে সৈয়দ মহিউদ্দিনের বেদনাবিধুর গান- 'সাম্পান মাঝি সাম্পান বায়/আগের মতো পেসিঞ্জার ন পায়'।

বাপ-দাদার পুরোনো পেশাতেই থাকতে চান সাম্পান মাঝিরা। সংসার চালাতে চান সাম্পান বেয়ে। কিন্তু দুঃসময় ভয়ানক এক প্রতিদ্বন্দ্বী তাদের। গতকাল রোববার সকাল সাড়ে ১০টায় কর্ণফুলী উপজেলার চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের সুপ্রাচীন ব্রিজঘাটে কথা হয় কবির মাঝির সঙ্গে। তার বাড়ি কর্ণফুলী উপজেলার চরপাথরঘাটা এলাকায়। নদীতীরের ঘাটের কাছেই সাম্পানের পিঠে পানিনিরোধক তেল লাগাচ্ছিলেন তিনি। নিজের অসহায়ত্বের কথা তুলে ধরে কবির মাঝি বলেন, তিনি আর তার ছেলে রফিক দু'জনই সাম্পান চালিয়ে পরিবারের ৮ সদস্যের ভরণপোষণ চালান। অন্য সময় ঘাটের নিয়ম অনুযায়ী এক দিন পর পর যাত্রী পারাপার করতেন। দিনে আয় হতো কখনও ৪০০ টাকা, কখনো-বা ৫০০ টাকা। কিন্তু এক সপ্তাহ ধরে যাত্রী পারাপার বন্ধ। এ অবস্থায় সংসার চালাচ্ছেন ধারকর্জ করে। একটি ঋণদান সমিতি থেকে সাম্পান মেরামতের জন্যে পাঁচ হাজার টাকা ঋণ নিয়েছেন। কিন্তু সাম্পান সারানোর পরও যদি তা চালাতে না পারেন, তাহলে পরিবার-পরিজন নিয়ে না খেয়ে থাকতে হবে।

দুপুর ১২টার দিকে কথা হয় কর্ণফুলী উপজেলার ৯ নম্বর ঘাটের মাঝিদের সঙ্গে। তারা জানান, তরিতরকারি, দুধ ও রোগী ছাড়া কোনোরকম যাত্রী পরিবহন না করার জন্য কোস্টগার্ডের পক্ষ থেকে তাদের মৌখিক নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। পুরোপুরি বেকার হয়ে পড়েছেন তারা। শুনেছেন, সাধারণ ছুটি চলার সময় সরকারের পক্ষ থেকে অসচ্ছল লোকজনকে বিভিন্ন রকম আর্থিক সাহায্য দেওয়া হচ্ছে; কিন্তু তারা এখনও এসবের কিছু পাননি।

দুপুর ১টায় উপজেলার শিকলবাহা ইউনিয়নের খুইল্ল্যা গোষ্ঠীর ঘাটে গিয়ে দেখা যায়, ঘাটের তীর ঘেঁষে নোঙর করে রয়েছে ৫০টির বেশি সাম্পান। আশপাশে কোনো যাত্রীও নেই। আয়-রোজগার সম্পর্কে জানতে চাইতেই সাম্পান মাঝি বেলাল বললেন আক্ষেপের স্বরে, 'কী আর গইজ্জম, আল্লায় যা মিলায় তা দি চলি...।' বললেন, 'সকালে এসে ঘাটে সাম্পান নোঙর করি, যাত্রী হলে এ ঘাট থেকে পাথরঘাটা ঘাট, নতুন ব্রিজঘাট পর্যন্ত যাই। কোনোদিন ২৫০ টাকা, কখনও ২০০ টাকা, আবার কোনোদিন ১০০ টাকাও হতো। যাই হোক, সংসার চলত। কিন্তু এক সপ্তাহ ধরে একটা টাকাও উপার্জন হয়নি।'

একই অবস্থা দেখা গেল কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে গড়ে ওঠা বিভিন্ন উপজেলার আরও ১২ ঘাটে। কর্ণফুলী উপজেলার চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের ব্রিজঘাট, বাংলাবাজার ঘাট, তোতার বাপের ঘাট, শিকলবাহা ইউনিয়নের খুইলল্গ্যা গোষ্ঠীর ঘাট, নতুন ব্রিজঘাট, বড়উঠান ইউনিয়নের শাহমীরপুর ঘাট, ১১ নম্বর ঘাট, ১২ নম্বর ঘাট, ১৪ নম্বর বদলপুর ঘাট, জুলধা ইউনিয়নের মাতব্বরঘাট, জুলধা ৯ নম্বর ঘাট, ডাঙারচর ঘাট- সবখানেই একই অবস্থা। এসব ঘাটে সাম্পান চালান ২ হাজারের বেশি মাঝি। এখন তাদের দিন কাটছে ধারকর্জ করে, অর্ধাহারে-অনাহারে।

উপজেলার চরপাথরঘাটা ইউনিয়নের সাম্পান মাঝিদের সংগঠন চট্টগ্রাম ব্রিজঘাট ঘাট সাম্পান-টেম্পো মালিক সমিতির সভাপতি শাহ আলম বলেন, এ ঘাট দিয়ে প্রতিদিন অন্তত চার হাজার মানুষ যাতায়াত করে থাকেন। ৩০০ সাম্পান পালাক্রমে এসব যাত্রী বহন করে। কিন্তু নিষেধাজ্ঞার কারণে যাত্রী পারাপার বন্ধ। কর্মহীন হয়ে পড়েছেন মাঝিরা। এখন মাত্র ৮-১০টি সাম্পান দুধ, তরকারি ও অসুস্থ মানুষ পারাপারে নিয়োজিত রয়েছে। তিনি বলেন, ঘাট ইজারা বাবদ প্রতি বছর সিটি করপোরেশনকে মোটা অঙ্কের টাকা পরিশোধ করা হয়। কিন্তু এই দুরবস্থায় এখন পর্যন্ত করপোরেশন থেকেও কোনো ধরনের সহায়তা দেওয়া হয়নি। কর্ণফুলী উপজেলা প্রশাসনও এখনও কোনো উদ্যোগ নেয়নি।

কর্ণফুলী নদীর তীর ঘেঁষে উপজেলা ও চট্টগ্রাম নগরের ২৩টি ঘাটের মধ্যে ১২টি ঘাট দিয়ে দুই সহস্রাধিক সাম্পান মাঝি যাত্রী পারাপার করে থাকেন। স্বাভাবিক সময়ে এসব ঘাট দিয়ে এক হাজার থেকে ১২শ' সাম্পান চললেও এখন সব ঘাট মিলিয়ে ১শ'র বেশি সাম্পান চলছে না।

কর্ণফুলী উপজেলা পরিষদের নারী ভাইস চেয়ারম্যান বানাজা বেগম নিশি বলেন, 'কর্ণফুলীর সাম্পানের ঐতিহ্য দুই হাজার বছরেরও বেশি। সাম্পান মাঝিরা অনেক প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে এখনও সেই ঐতিহ্য টিকিয়ে রেখেছেন। এই দুর্দিনে তাদের সহায়তায় সরকারের প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।'

চট্টগ্রামের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) কামাল হোসেন সমকালকে বলেন, 'বিষয়টি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাকে জানানো হয়েছে। জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে অর্ধাহারী-অনাহারী সবার জন্য প্রতিটি উপজেলায় প্রয়োজনীয় খাবার বিতরণ করা হচ্ছে।'