অশীতিপর বৃদ্ধ রণেশ সাংমার এক চোখ নষ্ট, আরেক চোখ অন্ধ হওয়ার পথে। প্রথম সংসারের সন্তানরা ফেলে চলে গেছে তাকে। দ্বিতীয় স্ত্রী খুকি মারাক গ্রামে গ্রামে ভিক্ষা করে সংসার চালায়। সারাদিন মানুষের কাছ থেকে চেয়ে এনে যা পায়, তাই দিয়ে দু’বেলা খেয়ে না খেয়ে চলে হতদরিদ্র এই পরিবাটির। এখন করোনার সময়ে কেউ ভিক্ষাও দিচ্ছে না খুকিকে। ঘরে নেই একটা চালও, রান্না ঘরে পড়ে আছে ভাতের শূন্য হাড়ি। বৃদ্ধ রনেশ ক্ষুধার তাড়নায় কাঁদছেন শিশুর মত। 

ময়মনসিংহের ফুলবাড়িয়া এবং মধুপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী গ্রাম গজারিচালার এই গারো আদিবাসী পরিবারটি এখন পর্যন্ত সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে দেওয়া কোন ত্রাণ পায়নি। শুধু রণেশ সাংমার পরিবারই নয়, গ্রামের কোনো আদিবাসী পরিবারই কোনো ত্রাণসামগ্রী পায়নি। গ্রামটিতে আদিবাসী গারো সম্প্রদায়ের ৬০০ মানুষের বসবাস। ফরেস্ট অফিসের উচ্ছেদ আতংকের মধ্যে থাকা মানুষগুলোর ভিটে মাটি ছাড়া আর কোনো সম্বল নেই। কামলা খেটে জীবিকা নির্বাহ করা এই মানুষগুলোর কাজও এখন করোনা ভাইরাসের কারনে বন্ধ। তাই অনাহারে দিন কাটাতে হচ্ছে বেশির ভাগ আদিবাসী পরিবারকে। 

বৃদ্ধ রনেশ সাংমা বলেন, আনারস খেতে কাম করতে গিয়া ধারালো পাতার খোসা লাইগা চোখটা নষ্ট হইয়া গেছে। কামাই করতে পারি না। খুকি সারাদিন ভিক্ষা কইরা যা পায়, তাই খাইয়া থাকি দু’জন। কয়দিন ধরে ঘরে খাওন নাই, খিদার যন্ত্রণায় পাগল হইয়া যাইতাছি। আমরা ফকির বইলা আমার খোঁজ কেউ নিবো না?

রনেশের স্ত্রী খুকি মারাক বলেন, দেশে নাকি কিসের রোগ আইছে, একমাস ধইরা কেউ ভিক্ষা দেয় না , এক বেলার চাইল পাই না। সবাই কয় বাড়ি থেইক্যা বাইর হও।

গজারিচালা গ্রামের প্রণতি মারাক, ছন্দা মারাক, নিলিপ মারাক, বিনেশ রেমাসহ সবারই অভিযোগ, সরকার থেকেও আমাদের খোঁজ নেওয়া হচ্ছে না। তারা এখনও পর্যন্ত কোনো সরকারি বা বেসরকারি ত্রাণসামগ্রী পায়নি। এই আদিবাসী মানুষগুলোর জন্য কেউ সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে না।

মধুপুর উপজেলার জয়েনশাহী আদিবাসী পরিষদ গজারিচালা আঞ্চলিক শাখার সভাপতি লিও চিচাম বলেন, আমরা একূলেও যেতে পারি না, ও কূলেও যেতে পারি না। কারণ, আমরা ফুলবাড়িয়ার মানুষও না, আবার মধুপুরের মানুষও না। এই করোনার ভয়াবহ সময়ে গ্রামের ৬০০ মানুষ কর্মহীন হয়ে অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছে। সরকারের কাছে আমাদের আকুল আবেদন, জরুরি ভিত্তিতে এই গ্রামে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়া হোক, স্বাস্থ্য সেবা দেওয়া হোক। 

ফুলবাড়িয়া এবং মধুপুর উপজেলার জয়েনশাহী আদিবাসী সংগঠনের সভাপতি ইউজিন নকরেক সমকালকে বলেন, আদিবাসী মানুষরা সুবিধাবঞ্চিত জনগোষ্ঠী। করোনা ভাইরাসের এই সংকটকালে এই গারো আদিবাসীসহ ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীকে ত্রান সহায়তা দিতে শুধু সরকার নয়, বিত্তবানদেরও এগিয়ে আসা উচিত। 

গজারিচালা গ্রামের ওয়ার্ড সদস্য মোসলেম উদ্দিন বলেন, বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। যত দ্রুত সম্ভব দুস্থ আাদিবাসীদের তালিকা করে ত্রাণের ব্যবস্থা করা হবে। 

ফুলবাড়িয়া উপজেলার রাঙ্গামাটি ইউনিয়নের চেয়ারম্যান সালীনা চৌধুরী সুষমা বলেন, আমরা প্রথম ধাপে ৫৯ বর্মন পরিবারের মাঝে ত্রাণ বিতরণ করেছি, কিছু গারো পরিবারকে সেখানে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে বাকীদের মাঝে ত্রান ঘরে পৌঁছে যাবে। প্রত্যেক দুস্থ আদিবাসী গারো পরিবারের তালিকা ইউএনও স্যারকে পাঠানো হচ্ছে। 

ফুলবাাড়িয়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার আশরাফুল সিদ্দিক সমকালকে বলেন, ফুলবাড়িয়ায় বিভিন্ন এলাকায় ত্রাণ কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। শিগগিরই আদিবাসী গারোদের ত্রাণ সামগ্রী পৌঁছানোর জন্য তাদের নামের তালিকা চেয়ারম্যান-মেম্বারদের কাছে চাওয়া হবে।