মা ও নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনা জরিমানায় ধামাচাপার চেষ্টা

প্রকাশ: ০৯ মে ২০২০     আপডেট: ০৯ মে ২০২০   

কসবা (ব্রাহ্মণবাড়িয়া) সংবাদদাতা

ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবায় একটি প্রাইভেট হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় জোনাকি আক্তার (২৫) নামে এক প্রসুতি ও তার নবজাতকের মৃত্যু হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গত বুধবার উপজেলার গোপিনাথপুর গ্রীন হেলথ হাসপাতালে এই ঘটনা ঘটে। কিন্তু বিষয়টি সামান্য অর্থের বিনিময়ে ধামাচাপা দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান ও গোপিনাথপুর আলহাজ্ব শাহআলম কলেজের অধ্যক্ষসহ হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে।

স্থানীয়রা জানায়, গত ৬ মে ভোর ৪টার দিকে উপজেলার বিনাউটি গ্রামের প্রবাসী ফারুক আহাম্মদের স্ত্রী জোনাকী আক্তারের প্রসববেদনা উঠলে বাবার বাড়ি ফতেহপুর থেকে গোপিনাথপুর গ্রীণ হেলথ হাসপাতালে নিয়ে আসেন মা সায়েরা বেগম। পরে সকাল ৬টায় জোনাকির শরীরে স্যালাইন পুশ করে আকলিমার নামে হাসপাতালের একজন। কিছুক্ষণ পর জোনাকীকে অপারেশন থিয়েটারে নেওয়া হয়। পরে দীর্ঘ সময় জোনাকীকে অপারেশন থিয়েটার থেকে বের না করায় চিন্তিত হয়ে পড়েন মা। কিছুক্ষণ পরই হাসপাতালে আসেন স্থানীয় ইউপি চেয়ারম্যান এসএম মান্নান জাহাংগীর ও গোপিনাথপুর কলেজের অধ্যক্ষ আকরাম খানসহ কয়েকজন স্থানীয় নেতৃবৃন্দ। পরে তাদের পক্ষ থেকে জোনাকীর মাকে জানানো হয় থিয়েটারে নেওয়ার পর ভয়ে জোনাকী এবং তার সন্তান মারা গেছে। খবর পেয়ে ছুটে আসেন জোনাকীর শ্বশুরবাড়ির লোকজনসহ অন্য স্বজনরা। পরে চেয়ারম্যানের নেতৃত্বে ঘটনা ধামাচাপা দিতে হাসপাতাল কতৃপক্ষকে ২ লাখ ৭৫ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। একই সঙ্গে জোনাকীর দাফনের জন্য স্বজনদের হাতে নগদ ৩০ হাজার টাকা তুলে দেন হাসপাতালের মালিক পক্ষ। বাকি টাকা পরে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। 

স্বজনরা জানান, হাসপাতালে থাকাবস্থায় জোনাকীকে দেখতেও দেননি হাসপাতালের লোকজন। প্যাকেট করে জোনাকী ও তার সন্তানের মৃতদেহ গাড়িতে তুলে দেয় হাসপাতালের লোকজন। পরে বাড়িতে নিয়ে দেখা যায় জোনাকিকে সিজার করা হয়েছিলো। তার হাত-পা স্যালাইনের পাইপ দিয়ে বাধা ছিলো। নবজাতকেরও দুই হাত স্যালাইনের পাইপ দিয়ে বাধা ছিলো। সিজার করতে গিয়ে তার নাড়ি-ভুড়ি কেটে ফেলা হয়েছিলো। এতেই জোনাকি ও শিশুটির মৃত্যু হয়েছে বলে ধারণা তাদের। এই হাসপাতালে আকলিমা নামে একজন সিনিয়র নার্স আছেন। তিনিই অপারেশন করে থাকেন।

হাসপাতালের ম্যানেজার মো. সোহেল সরকার সাংবাদিকদের জানান, এ ব্যাপারে তার কিছু বলার নির্দেশ নেই। সব জানেন ইউপি চেয়ারম্যান এসএম মান্নান জাহাংগীর ও গোপিনাথপুর কলেজের অধ্যক্ষ আকরাম খান। 

জোনাকীর মা সায়েরা বেগম বলেন, গ্রীন হেল্থ হাসপাতালের কথিত মহিলা ডাক্তার ভুল চিকিৎসা করে আমার মেয়ে ও তার সন্তানকে মেরে ফেলেছেন। আমি এর বিচার চাই, যেন আমার মতো আর কোনো মায়ের বুক খালি না হয়। আমার মেয়ে সুস্থ অবস্থায় হাসপাতাল পর্যন্ত গেছে, আর ফিরেছে লাশ হয়ে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে গোপিনাথপুর ইউপি চেয়ারম্যান এসএম মান্নান জাহাংগীর ও গোপিনাথপুর শাহআলম কলেজ অধ্যক্ষ আকরাম খান সাংবাদিকদের বলেন, রোগী থিয়েটারে নেয়ার পর স্ট্রোত করে মারা গেছে বলে শুনেছি। জরিমানার মাধ্যমে ধামাচাপা দেওয়ার বিষয়ে কিছু জানি না আমরা।

কসবা থানা ওসি মোহাম্মদ লোকমান হোসেন বলেন, এই বিষয়ে কোন পক্ষ থেকেই অভিযোগ পাইনি। অভিযোগ পেলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাসুদ উল আলম বলেন; বিষয়টি হত্যার শামিল। ইউপি চেয়ারম্যান বা অন্য কারো এর সমাধান দেওয়ার অধিকার নেই। বিষয়টি পুলিশকে না জানিয়ে জরিমানার মাধ্যমে নিষ্পত্তি করা মানে ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা। বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।