জেলেদের মাঝে বিশেষ ভিজিএফ (ক্ষতিগ্রস্থদের খাদ্য সহায়তা) বিতরণে বরগুনার পাথরঘাটা উপজেলার কালমেঘা ইউপি চেয়ারম্যান আকন মো. সহিদের বিরুদ্ধে চাল আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। একই জেলের নাম একাধিকবার, ওজনে কম দেওয়াসহ বিভিন্ন কৌশলে জেলেদের জন্য বরাদ্দকৃত এ চাল চেয়ারম্যান আত্মসাত করেছেন বলে জানা গেছে। তা ছাড়া চেয়ারম্যানের বিরুেদ্ধে অভিযোগ রয়েছে, স্বজনপ্রীতি, আত্মীয়করণ এবং অন্য পেশাজীবিদের নাম তালিকাভুক্তকরণেরও।

বছরের বিভিন্ন সময় মা ইলিশ না ধরা, কখনও আবার ইলিশের জাটকা শিকার না করা থেকে জেলেদের বিরত রাখতে, ২০০৯ সাল থেকে শুরু হয় ভিজিএফ খাদ্যশস্য বিতরণ কর্মসূচি। বছরের নভেম্বর থেকে জুন পর্যন্ত (৮ মাস) নদ-নদীতে জাটকা (ছোট ইলিশ) শিকারে নিষেধাজ্ঞা রয়েছে। আর এর ক্ষতিপূরণ হিসেবে ৮ মাসের মধ্যে ৪ মাস (ফেব্রুয়ারি থেকে মে) প্রতি জেলেকে ৪০ কেজি করে ভিজিএফ চাল বরাদ্দ দিয়েছে সরকার। এ কর্মসূচির আওতায় বরগুনা জেলায় ১৩ হাজার ৭৫০ জন জেলের মাঝে খাদ্য সহায়তা বিতরণ করা হচ্ছে।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, জেলার পাথরঘাটা উপজেলার ৫নং কালমেঘা ইউনিয়নে ৬৯৫ জেলের মাঝে একত্রে দুই মাসের (ফেব্রুয়ারি-মার্চ) চাল বিতরণ করা হয়েছে। যেখানে প্রতি জেলেকে ৮০ কেজি চাল দেওয়ার কথা থাকলেও দেওয়া হয়েছে ৬৫ থেকে ৭০ কেজি। এখানে ৬৯৫ জন জেলেকে ১০ কেজি করে কম দিয়ে ৬ হাজার ৯৫০ কেজি চাল আত্মসাত করা হয়েছে। তাছাড়া ১৩ জন জেলের নাম তালিকা/ মাস্টাররোলে দুইবার দেখিয়ে ১৬০ কেজি করে ২ হাজার ৮০ কেজি চালের হিসাব দেখানো হয়েছে। অথচ জেলেদের মাঝে চাল বিতরণ করা হয়েছে এক হাজার ৪০ কেজি। সব মিলিয়ে ৭ হাজার ৯৯০ কেজি চাল (প্রায় ৮ মেট্রিক টন) আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এছাড়া তালিকায় রয়েছে মৃত ব্যক্তি, প্রবাসীসহ বিভিন্ন পেশাজীবিদের নাম।

চাল বিতরণের মাষ্টাররোল ঘেঁটে দেখা গেছে, ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের মো. আলম, ছালাম মোল্লা, আলমাস, মো. রাসেল, মো. সবুজ, মো. খলিল, ৮নং ওয়ার্ডের মো. ফারুক, মো. বশির, রানা সরকার এবং ৬নং ওয়ার্ডের জসিম, নজরুল ইসলাম, আকব্বার আলী, তরিকুল ইসলামের নাম দুইবার করে দেখিয়ে চাল উত্তোলন করা হয়েছে। এদের মধ্যে মো. নজরুল, আকব্বার আলী ও তরিকুল ইসলাম বলেন, আমরা দুই মাসে ৮০ কেজি চাল পাওয়ার কথা থাকলেও ৭০ কেজি করে পেয়েছি। আর বাকি চাল কোথায় গেছে এ বিষয়ে আমরা কিছুই জানি না। তবে তাদের নাম ব্যবহার করে চাল আত্মসাতের বিষয়টি শুনে তদন্ত পূর্বক বিচারের দাবি জানান এসব জেলেরা।

এ বিষয়ে তদারকি কর্মকর্তা রবীন্দ্রনাথ হাওলাদার বলেন, আমার উপস্থিতিতে চেয়ারম্যান সবার মাঝে চাল বিতরণ করেছেন। তবে একই ব্যক্তির নামে দুইবার চাল দেওয়ার সুযোগ নেই। চেয়ারম্যান এমনটা করে থাকলে অন্যায় করেছেন।

এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট চেয়ারম্যান আকন মো. সহিদ একই ব্যক্তির নাম একাধিকবার তালিকায় রয়েছে স্বীকার করে বলেন, যাদের নাম তালিকায় দুইবার হয়েছে, তাদের এক নামের চাল দিয়ে বাকি চাল সংশ্লিষ্ট মেম্বারের স্বাক্ষর নিয়ে অন্য জেলেকে দেওয়া হয়েছে। এ সময় চেয়ারম্যানকে একই ব্যক্তির নামে মাষ্টাররোলে দুই জায়গায় টিপসই-এর মাধ্যমে চাল উত্তোলনে প্রমাণ দেখালে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারেননি। এ ছাড়া চাল ওজনে কম দেওয়ার বিষয়েও তিনি অস্বীকার করেন।

জেলা মৎস্যজীবি সমিতির সভাপতির সভাপতি আব্দুল খালেক দফাদার বলেন, কিছু জনপ্রতিনিধি গরিব জেলেদের নাম ব্যবহার করে ত্রাণের চাল আত্মসাত করেন। তিনি তদন্ত পূর্বক দোষীদের বিরুদ্ধে আইনী ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানান।

বরগুনা জেলা মৎস্য অফিসার মো. আবুল কালাম আজাদ বলেন, জেলেদের তালিকা দীর্ঘদিন আগে করায় এখানে মৃত ব্যক্তি, প্রবাসীসহ অন্য পেশার লোক রয়েছে। আর এ সুযোগ নিয়ে কিছু কিছু জনপ্রতিনিধি অনিয়ম করছেন।

এ ব্যাপারে বরগুনা জেলা প্রশাসক মো. মোস্তাইন বিল্লাহ্ বলেন, এ বিষয়ে তদন্ত পূর্বক আইনী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।