'কষ্ট হলিও নিজের ঘরে থাকতি চাই'

প্রকাশ: ২৩ মে ২০২০     আপডেট: ২৩ মে ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

শেখ হারুন অর রশিদ, কয়রা (খুলনা)

ঘূর্ণিঝড় আম্পানের তাণ্ডবে ভেঙে যাওয়া বাঁধের লোনা পানির নিচে অর্ধেক ডুবে আছে নবীজানের ঘর। দিনের বেলা ভাটার সময় পানি নেমে গেলে সেখানেই ঘরে মাচার ওপর রান্না করেন তিনি। রাতে স্বামী-সন্তান নিয়ে ওই মাচার ওপরেই ঘুমান। নবীজান বলেন, 'ঝড়ের রাতে অনেক কষ্ট কইরে আশ্রয়কেন্দ্রে ছেলাম। কিন্তু সেখানে থাকতি মন সায় দেয় না। শুনিছি এক সাথে অনেক মানুষ থাকলি করোনা হতি পারে। তাছাড়া অসুস্থ স্বামীকে নিয়ে বার বার টানাহেঁচড়া করতিও মন সায় দেয় না। শত কষ্ট হলিও বাড়িতি থাকতি চাই।'

নবীজানের মতো খুলনার কয়রা উপজেলায় বাঁধ ভেঙে প্লাবিত হওয়া ৩০টি গ্রামের লক্ষাধিক মানুষ চরম দুর্ভোগের মধ্যে পড়েছে। অনেকরই ঘর ঝড়ে উড়ে গেছে। অনেকের বসতঘর লোনাপানির নিচে অর্ধেক তলিয়ে আছে। তারা জানান, বুধবার রাতে ঝড় শুরু হলে আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছিলেন সবাই। পরের দিন সকালে যে যার বাড়িতে চলে এসেছেন। কারণ করোনার ভয়। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে ঠাসাঠাসি করে ঝড়ের রাতে থাকতে হয়েছে। তবে সবার মনে একটাই শঙ্কা ছিল করোনায় আক্রান্ত হওয়া নিয়ে। তাই সবকিছু উপেক্ষা করে বাড়িতে চলে এসেছেন।

পানিবন্দি কয়েকটি গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, লোনাপানির সঙ্গে একপ্রকার যুদ্ধ করেই টিকে আছে পরিবারগুলো। চারিদিকে থৈথৈ করছে জোয়ারের পানি। নারীরা সারাদিন পানি ঠেলে ঘরগৃহস্থালি সামলাচ্ছেন। আর পুরুষরা খাবারের সন্ধানে ছুটছেন। যেসব গ্রাম প্লাবিত হয়নি সেখান থেকে সংগ্রহ করা হচ্ছে খাবার পানি। দশহালিয়া গ্রামের বাসিন্দারা জানান, গত দু'দিনে কোনো ত্রাণ সহযোগিতা পাননি তারা। ঝড়ের রাতে অনেকেরই চাল-ডাল ভেসে গেছে। এসব পরিবারকে আধপেটা খেয়ে দিন পার করতে হচ্ছে।

দক্ষিণ বেদকাশি ইউনিয়নের ভেঙে যাওয়া বাঁধগুলো নিজেদের প্রচেষ্টায় জোড়াতালি দিয়ে মেরামত করা হয়েছে। তবে অনেকের বাড়ির আঙিনায় এখনও পানি। ইউনিয়নের মাটিয়াভাঙ্গা, গোলখালি, আংটিহারা, জোড়শিং ও চরামুখা গ্রামের প্রায় দুই হাজার পরিবারের ঘরবাড়ি ভেঙে যাওয়ায় শূন্যভিটায় মানবেতর জীবনযাপন করছেন। তাদের আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়ার চেষ্টা করা হলেও কেউ সেখানে যেতে রাজি হচ্ছেন না। ওই ইউনিয়নের চেয়ারম্যান গাজী শামসুর রহমান বলেন, ঝড়ের ভয় কেটে গেলেও করোনার ভয় যাচ্ছে না। তাদের অনেক বুঝিয়েও আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়া সম্ভব হয়নি।

চরামুখা গ্রামের বাসিন্দা আলমগীর হোসেন বলেন, 'জন্মের পর থেকে ঝড় ও লোনাপানির সঙ্গে যুদ্ধ করেই আমরা টিকে আছি। কিন্তু অজানা রোগে পড়লি তখন তো বিনা চিকিৎসায় মরতি হবে। তাই ভেবে দেখলাম একটু কষ্ট হলিও নিজের বাড়িতেই থাকি।'

উপজেলা প্রশাসন সূত্র জানিয়েছে, দুর্যোগে অসহায় পরিবারগুলোকে সরকারিভাবে খাদ্য সহায়তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়া বিভিন্ন বেসরকারি সংস্থাও সহযোগিতা অব্যাহত রেখেছে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখায়সহ চিকিৎসা ব্যবস্থাও নিশ্চিত করা হয়েছে।

ইউএনও শিমুল কুমার সাহা বলেন, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। এ মুহূর্তে যাদের ঘরবাড়ি পানিতে ডুবে আছে, তাদের বুঝিয়ে-শুনিয়ে আশ্রয়কেন্দ্রে নেওয়ার চেষ্টা চলছে।