’একটু আশার আলো ফোটাতে ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম, সব শেষ’

প্রকাশ: ৩০ মে ২০২০   

মাগুরা প্রতিনিধি

নিহত লালচাঁদ বিশ্বাস- ফাইল ছবি

নিহত লালচাঁদ বিশ্বাস- ফাইল ছবি

’দরিদ্র সংসারে একটু আশার আলো ফোটাবার জন্য ছেলেকে বিদেশে পাঠিয়েছিলাম।  টাকা যোগাড় করতে জমি বন্ধক, কয়েকটি এনজিও থেকে লোন নিয়ে এবং হালের গরু ও বাড়ির গাছ বিক্রি করেছিলাম। কিন্তু সব শেষ হয়ে গেল।’

কথাগুলো বলছিলেন গত বৃহস্পতিবার লিবিয়াতে অপহরণকারীদের গুলিতে নিহত ২৬ বাংলাদেশির মধ্যে একজন মাগুরার লালচাঁদ বিশ্বাসের বাবা ইউনুস আলী। শনিবার বাড়িতে বসে এসব কথা বলেন তিনি।

একটু দূরেই লাল চাঁদের মা কাঁদতে কাঁদতে একবারেই যেন বাকরুদ্ধ হয়ে গেছেন। নিহত লালচাঁদের স্ত্রী চার বছর বয়সী শিশু সস্তানকে নিয়ে বাবার বাড়ি বসবাস করেন।

নিহত লালচাঁদ-এর বাড়ি মাগুরা জেলার মোহাম্মদপুর উপজেলার বিনোদপুর ইউনিয়নের নারায়নপুর গ্রামে। পেশায় তিনি ছিলেন টাইলস মিস্ত্রি।

শনিবার নিহত লালচাঁদের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেছে, আশেপাশের এলাকা থেকে শত শত মানুষ লালচাঁদের বাড়িতে ভিড় করছেন। পরিবারের লোকজন ও আত্মীয় স্বজন ও পাড়া- প্রতিবেশিদের কান্না ও চাপা দীর্ঘশ্বাসে বাতাস যেন ভারী হয়ে উঠেছে।

চোখের পানি মুছতে মুছতে লালচাঁদের বাবা ইউনুস আলী বলেন, প্রায় ৮ মাস আগে তার ছেলে একই গ্রামের জিয়ার মাধ্যমে ও ঢাকায় বসবাসকারী কুষ্টিয়ার আদম ব্যাবসায়ী কামাল হাজির মাধ্যমে লিবিয়ার মাঝদা শহরে পৌঁছায়। জমি বন্ধক, সমিতির লোন, গরু, ছাগল, গাছ বিক্রি করে সাড়ে পাঁচ লাক্ষ দেন আদম ব্যাপারীকে। কথা ছিল লিবিয়া নিয়ে টাইলস মিস্ত্রির কাজ দেবে। খেয়ে খরচে মাসে ৫০ হাজার টাকা বেতন পাবে।

তিনি জানান, ওয়ার্ক পারমিট না থাকায় লিবিয়ার মাজদা এলাকায় অব্দুল্লাহ নামে সেখানকার বাংলাদেশি এক দালালের ক্যাম্পে অরো অনেকের সাথে আটক থাকে লালচাঁদ। সেখান থেকে পরে তাদের ত্রিপলী নামক এক শহরে নিয়ে গিয়ে কাজ দেয়ার কথা চলছিলো। কিন্তু  কয়েকদিন আগেই লিবিয়া থেকে ফোন আসে তার ছেলেসহ কয়েকজন বাংলাদেশি অপহরণকারীদের হাতে ধরা পড়েছে। ছেলেকে বাঁচাতে গেলে আড়াই লাখ টাকা পাঠাতে হবে।

ইউনুস আলী বলেন, এরই মধ্যে শুক্রবার আমরা খবর পাই সেখানে গত বৃহস্পতিবার অপহরণকারীর গুলিতে ২৬ জন বংলাদেশি নিহত হয়েছেন। আর তাদের মধ্যে আমার ছেলে লালচাঁদ রয়েছে। আহত হয়েছে একই সাথ যাওয়া  তরিকুল নামে প্রতিবেশি এক যুবক।

একই গ্রামের ফুল মিয়ার ছেলে লিবিয়ার আহত যুবক তরিকুলের ভগ্নিপাতি মিকাইল হোসেন জানান, লাল চাঁদ ও তরিকুল ৮ মাস আগে একই সাথে লিবিয়ায় যান। তাকেও জমি বন্ধক, একাধিক সমিতির লোন করে লিবিয়া পাঠানো হয়। তবে শেষ পর্যন্ত তাদের উপর নির্যাতন, মুক্তিপন দাবি, গুলি বর্ষণের ঘটনা ঘটেছে। অন্যদের সাথে একই গ্রামের লাল চাঁদ গুলিতে মারা গেলেও তারিকুল আহত হয়েছেন। তার হাতে গুলিবিদ্ধ হয়েছে। বাড়িতে মা-বাবার পাশাপাশি তারিকুলে স্ত্রী ও দুই বছর বয়সী সন্তান রয়েছে।

মাগুরার জেলা প্রশাসক ড. আশরাফুল আলম বলেন, ফ্লাইট বন্ধ থাকায় একটু সময় লাগলেও লিবিয়াতে বাংলাদেশের দূতাবাসের মাধ্যমে মৃতদেহ দেশে আনার চেষ্টা করা হবে বলে আমার ধারণা।

তিনি আরো বলেন, কেউ যেন দালালের খপ্পরে পড়ে সর্বশান্ত না হন। বিদেশে যেতে হলে সরকারি নিয়ম-নীতি মেনে যেতে হবে। তাহলে হয়তো এই ধরনের পরিণতি কারো ভাগ্যে আর ঘটবে না।