পার্বত্য চট্টগ্রামের বর্ষীয়ান রাজনৈতিক নেতা সুধাসিন্ধু খীসা মারা গেছেন। তিনি ষাটের দশকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বামপন্থী মেধাবী ছাত্রনেতা ও পার্বত্য চট্টগ্রাম আঞ্চলিক পরিষদের সদস্য ছিলেন। তিনি দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত নানা শারীরিক অসুস্থতা নিয়ে শয্যাশায়ী ছিলেন। 

মঙ্গলবার রাত ১২টার দিকে খাগড়াছড়িস্থ নিজ বাড়িতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।

সুধাসিন্ধু খীসা পার্বত্য জেলার পাহাড়ি জনগণের কাছে একজন সুবক্তা ও শিক্ষা-দীক্ষায় উঁচু মানের নেতা হিসেবে জনপ্রিয় ছিলেন। তার মৃত্যুতে তিন পার্বত্য জেলার বাসিন্দাদের মাঝে শোকের ছায়া নেমে এসেছে।

সত্তরোর্ধ্ব বয়সী এই নেতা স্ত্রী, দুই মেয়ে ও এক ছেলে রেখে গেছেন। 

আজ (বুধবার) দুপুরে তাকে খাগড়াছড়ি জেলার মহালছড়ি উপজেলার মুবাছড়িস্থ গ্রামের বাড়ির পারিবারিক শ্মশানে সৎকার করা হবে।

বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে সমাজবিজ্ঞানের ছাত্র থাকাকালে তিনি বিপ্লবী ছাত্র ইউনিয়নের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। দেশ স্বাধীনের পর তিনি পার্বত্য চট্টগ্রামের স্বায়ত্তশাসনের রাজনীতির একজন নেতা হয়ে উঠেন। প্রয়াত সংসদ সদস্য মানবেন্দ্র নারায়ণ লারমা (এম. এন. লারমা)-র সঙ্গে মিলে গঠন করেন ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতি (পিসিজেএসএস)’। ১৯৯৭ সালের ২ ডিসেম্বর ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি (শান্তিচুক্তি)’ স্বাক্ষরের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের গঠিত জাতীয় কমিটির সাথে অনুষ্ঠিত প্রতিটি সংলাপেই সুধাসিন্ধু খীসা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়ন আন্দোলনে সক্রিয় ছিলেন। তিনি নবম ও দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রাঙামাটি আসন থেকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়ে নির্বাচনেও লড়েছিলেন।

তার রাজনৈতিক অনুসারী বাঘাইছড়ি উপজেলা পরিষদ চেয়ারম্যান সুদর্শন চাকমা জানান, সুধাসিন্ধু খীসা ব্যক্তি জীবনে অত্যন্ত সাদামাটা ছিলেন। তার জাগতিক লোভ-লালসা ছিল না বললেই চলে। নিজের জীবন-জীবিকার নিরাপত্তার চেয়ে তিনি জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার দিকেই মনোযোগী ছিলেন। তার মৃত্যু আমাদের কাছে ভীষণ এক শূন্যতা সৃষ্টি করেছে।

সুধাসিন্ধু খীসার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে ‘বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন (বিএফইউজে)’-এর যুগ্ম-মহাসচিব সাংবাদিক কাজী মহসীন বলেন, বিএনপি-জামায়াত শাসনামলে (২০০১-২০০৬) সারাদেশের মতো খাগড়াছড়ির অবস্থাও ভীষণ খারাপ ছিল। সে সময়ে দৈনিক আজকের কাগজের জন্য একটি সিরিজ প্রতিবেদন করতে বেশ কয়েকবার সরেজমিনে খাগড়াছড়ি যাওয়া হয়েছে। যতোবারই গিয়েছি শ্রদ্ধেয় সুধাসিন্ধু খীসার বাসায় গিয়ে তার সঙ্গে আড্ডা জমিয়েছি। তার অসীম-সর্বজ্ঞ জ্ঞানের পরিধি দেখে মনে হয়েছে এই সময়ের অনেক জাতীয় রাজনৈতিক নেতার চেয়ে গরিমায় তিনি অনেক ঊর্ধ্বে।

এদিকে সুধাসিন্ধু খীসার মৃত্যুতে পার্বত্য চট্টগ্রাম শরণার্থী টাস্কফোর্স চেয়ারম্যান ও খাগড়াছড়ির সংসদ সদস্য কুজেন্দ্র লাল ত্রিপুরা, সাবেক এমপি যতীন্দ্র লাল ত্রিপুরা, নারী সংসদ সদস্য বাসন্তী চাকমা, পার্বত্য চট্টগ্রাম উন্নয়ন বোর্ড চেয়ারম্যান নব বিক্রম কিশোর ত্রিপুরা, খাগড়াছড়ি পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান কংজরী চৌধুরী, খাগড়াছড়ি জেলা আওয়ামীলীগ সাধারণ সম্পাদক নির্মলেন্দু চৌধুরী, বাংলাদেশ মারমা উন্নয়ন সংসদের সভাপতি মংপ্রু চৌধুরী ও সাধারণ সম্পাদক মংসুইপ্রু চৌধুরী, খাগড়াছড়ি জেলা ক্রীড়া সংস্থা’র সাধারণ সম্পাদক জুয়েল চাকমাসহ বিভিন্ন ব্যক্তি এবং সংগঠন পৃথক পৃথক বিবৃতিতে শোক জ্ঞাপন করেছেন।