করোনাকালে জীবিকা

এখনও পত্রিকা নিয়ে ছুটে যান ইউসুফ

প্রকাশ: ১৩ জুন ২০২০     আপডেট: ১৩ জুন ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

আবু বকর রায়হান, কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয়

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সংবাদপত্র বিলির কাজে ইউসুফ মিয়া- সমকাল

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় সংবাদপত্র বিলির কাজে ইউসুফ মিয়া- সমকাল

'তিন মাস কোনো আয় নেই। সবাই কত দিকের সাহায্য পায়, আমরা তাও পাই না। আর এখন কেউ পত্রিকাও কিনতে চাচ্ছে না। বলে পত্রিকায় নাকি ভাইরাস ছড়ায়। পরিবার নিয়ে খুব কষ্টে দিন পার করছি। দু'বেলা খেতেই আমাদের কষ্ট হয়।' এভাবেই নিজের কষ্টের গল্প বলছিলেন পত্রিকার হকার ইউসুফ মিয়া। অদৃশ্য শত্রু করোনাভাইরাসের কারণে বর্তমানে জনজীবন বিপর্যস্ত। প্রতিদিন যে পত্রিকা না হলে যাদের সকালটা ভালো যেত না, তারাই আজ করোনার ভয়ে পত্রিকা পড়া বন্ধ করে দিয়েছেন।

করোনাভাইরাসের প্রকোপের আগে কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকায় প্রতিদিনের তাজা খবর নিয়ে ছুটে যেতেন ইউসুফ মিয়া। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা সকাল হতেই অপেক্ষায় থাকতেন তার। কিন্তু ভয়াল করোনার থাবা পাল্টে দিয়েছে সব। ইউসুফের জন্য আজ আর কেউ অপেক্ষা করে না; বরং অনেক বাসায় তার যাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। দুই মাস পত্রিকার বিল না দিয়ে শিক্ষার্থীরা বাড়ি চলে যাওয়ায় অসহায় দিন কাটছে এই খবরের ফেরিওয়ালার।

কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় ও সালমানপুর এলাকায় প্রতিদিন এক হাজারের বেশি পত্রিকা বিক্রি করতেন এই হকার। বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিকাংশ শিক্ষার্থী হল ও আশপাশের মেসগুলোতে থাকায় প্রায় সকলেই পত্রিকার নিয়মিত পাঠক ছিলেন। বৃহস্পতিবার সমকালকে হকার ইউসুফ মিয়া বলেন, 'করোনাভাইরাসের কারণে হঠাৎ করে বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যায়। ক্যাম্পাস বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশের সালমানপুর এলাকায় শিক্ষার্থীদের মেসও বন্ধ হয়ে যায়। তারা না থাকায় পত্রিকা বিক্রি অনেক কমে গেছে। বর্তমানে ৫০টি পত্রিকা বিক্রি করতেও কষ্ট হয়।' তিনি জানান, পত্রিকা নিয়ে বাসাবাড়িতে এখন প্রবেশ করতেও না করা হচ্ছে। বলে, পত্রিকায় ভাইরাস থাকতে পারে।

করোনাভাইরাসের কারণে হঠাৎ বিশ্ববিদ্যালয় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় শিক্ষার্থীদের কাছে দুই লক্ষাধিক টাকা বাকি পড়েছে ইউসুফ মিয়ার। আবাসিক হল ও মেসে দুই মাসের পত্রিকার বিল বাকি আছে বলে জানান তিনি। পত্রিকার বিল না পাওয়ায় পত্রিকার এজেন্টদের টাকা পরিশোধ করতে পারছেন না, অন্যদিকে নতুন করে পত্রিকা আনতে গেলে বকেয়ার জন্য পত্রিকা পাচ্ছেন না।

ইউসুফ মিয়া আর্থিক সমস্যায় থাকায় কুমিল্লা বিশ্ববিদ্যালয় সাংবাদিক সমিতির সভাপতি জাহিদুল ইসলাম তাকে কিছু আর্থিক সহায়তা করেছেন। জাহিদ বলেন, 'ইউসুফ ভাই বিশ্ববিদ্যালয় পরিবারেরই একজন মানুষ। প্রতিদিন তার মাধ্যমে হাজারো শিক্ষার্থী তাজা খবরের কাগজ পড়ার সুযোগ পায়। কিন্তু আজ করোনার কারণে অনেক শিক্ষার্থীর কাছে পাওনা টাকা আটকে যাওয়ায় কষ্টে জীবনযাপন করছেন। সবাইকে অনুরোধ করব তার পাওনা যেন দিয়ে দেয়।' হকার ইউসুফ মিয়া বলেন, 'আমার জায়গায় কেউ না থাকলে বুঝতে পারবে না কতটা অসহায়ভাবে আমি দিন কাটাচ্ছি। আমি কারও কাছে দয়া বা দান চাইনি। আমার পাওনা টাকা চেয়েছি। যাদের কাছে আমি টাকা পাব দয়া করে দিয়ে দেবেন। যাতে করে সবার মতো আমিও বাঁচতে পারি।'