নতুন ধান ওঠার পরও দাম বাড়ল চালের

চট্টগ্রামে মিল মালিকদের বিরুদ্ধে কারসাজির অভিযোগ

প্রকাশ: ২৬ জুন ২০২০       প্রিন্ট সংস্করণ

তৌফিকুল ইসলাম বাবর, চট্টগ্রাম

বোরো মৌসুমের নতুন ধান ঘরে উঠলেই চালের দাম কমবে, আশা করেছিলেন সাধারণ মানুষ। সেই ধান ঘরে ওঠার পর চাল হয়ে এখন বাজারেও এসেছে। কিন্তু দাম কমেনি, উল্টো বেড়ে গেছে। চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারে ৫০ কেজি ওজনের প্রতি বস্তা চালে দাম বেড়েছে ১৫০ থেকে ২০০ টাকা করে। আর খুচরা বাজারে প্রতি কেজিতে দাম বেড়েছে ৫ থেকে ৬ টাকা করে!
অভিযোগ উঠেছে, এবার বোরো মৌসুমে ধানের বাম্পার ফলন হওয়ার পরও এক শ্রেণির মিল মালিক কারসাজি করে সরবরাহ কমিয়ে চালের মূল্যবৃদ্ধি ঘটিয়েছেন। কমতে থাকা চালের দাম হঠাৎ আবারও বেড়ে যাওয়ার জন্য উত্তরাঞ্চলের মিল ও মোকাম মালিকদের দায়ী করছেন চট্টগ্রামের পাইকার ব্যবসায়ীরা। মিল মালিকরা বলছেন, বোরো মৌসুমে ধান সংগ্রহে সরকারের দাম বেঁধে দেওয়ার কারণে ধানের দাম বেড়েছে। আর ধানের দাম বাড়ায় চালের দামও বেড়েছে।
চট্টগ্রামের চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এক সপ্তাহে মোটা ও চিকন এবং আতপ ও সিদ্ধ সব ধরনের চালের দামই বেড়েছে। ৫০ কেজি ওজনের প্রতি বস্তা আতপ বেতি ও আতপ মিনিকেট চালের দাম ১৫০ থেকে ২০০ টাকা করে দাম বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ১০০ থেকে ২ হাজার ১৫০ টাকা, সিদ্ধ মিনিকেট ও সিদ্ধ পাইজামও একই হারে দাম বেড়ে বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ২০০ থেকে ২ হাজার ২৫০ টাকায় এবং সিদ্ধ নাজিরশাইল বিক্রি হচ্ছে ২ হাজার ৩০০ থেকে ২ হাজার ৩৫০ টাকা করে। চট্টগ্রামে সুনামগঞ্জের ২৮ নম্বর আতপ চালের বেশ কাটতি রয়েছে। দুই সপ্তাহের ব্যবধানে এই চালের দাম প্রায় ১৫০ টাকা করে বেড়ে এক হাজার ৬৫০ টাকা করে বিক্রি হচ্ছে। একইভাবে বেড়েছে অন্যান্য চালের দামও।
করোনাভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ঘটার পর থেকে চট্টগ্রামের চালের বাজারে অস্থিরতা শুরু হয়। এপ্রিলে তা চরম আকার ধারণ করে। গরিব, অসহায় মানুষদের ত্রাণ হিসেবে অন্যান্য সামগ্রীর সঙ্গে চাল দেওয়ায় হঠাৎ করে মোটা চালসহ অন্যান্য চালের দামও বেড়ে যায়। এই চাহিদাকে পুঁজি করে রাতারাতি চালের দাম বাড়িয়ে দেন মুনাফালোভী ব্যবসায়ীরা। ৫০ কেজি ওজনের প্রতি বস্তায় ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়েছিল তখন। মাঝে কিছুদিন চালের দাম খানিকটা কমে এলেও জুনের মাঝামাঝিতে হঠাৎ চালের দাম ফের বাড়তে থাকে।
চট্টগ্রামের আড়তদার ও পাইকার ব্যবসায়ীরা বলছেন, দিনাজপুর, রাজশাহী, নওগাঁ, কুষ্টিয়া, আশুগঞ্জ, সুনামগঞ্জসহ বিভিন্ন এলাকার
মিল ও মোকাম মালিকরা জোটবদ্ধ হয়ে চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। আর দাম বাড়ানোর লক্ষ্যে সেই পুরোনো কৌশলে হঠাৎ করে চাল সরবরাহ কিছুটা কমিয়ে দেন তারা। এসব অঞ্চল থেকে দিনে অর্ধশতাধিক ট্রাকে চাল আসে চট্টগ্রামে। প্রতিটি ট্রাকে ১২ থেকে ১৩ টন করে চাল পরিবহন করা হয়। এ থেকেই বোঝা যায়, দিনে কত চাল আসে চট্টগ্রামে।
চট্টগ্রামের চাক্তাই-খাতুনগঞ্জ চাল ব্যবসায়ী কমিটির সাধারণ সম্পাদক মো. ওমর আজম সমকালকে বলেন, 'ধানের দাম বেড়ে যাওয়ায় মিল মালিকরা চালের দাম বাড়িয়ে দিয়েছেন। ফলে চট্টগ্রামের পাইকারি বাজারেও আনুপাতিক হারে দাম বেড়েছে। প্রতি বস্তায় ১৫০ থেকে ২০০ টাকা পর্যন্ত দাম বেড়েছে। মিল মালিকরা দাম না কমালে পাইকারি পর্যায়ে দাম কমবে না।'
অন্যদিকে পাইকারি বাজারে চালের দাম বাড়ায় তার প্রভাব পড়েছে খুচরা বাজারে। বিভিন্ন ধরনের চালে প্রতি কেজিতে দাম বেড়েছে ৫ থেকে ৬ টাকা করে। করোনায় বিপর্যস্ত মানুষের জীবনে তাই নতুন সমস্যা হয়ে উঠেছে চালের দাম। রাষ্ট্রায়ত্ত বিপণন সংস্থা টিসিবির তথ্য মতেও চালের দাম বেড়েছে। টিসিবির হিসাবে এক সপ্তাহের ব্যবধানে নাজিরশাইল ও মিনিকেট চালে কেজিতে বেড়েছে ৪ টাকা করে। মাঝারি মানের পাইজাম ও লতা কেজিতে তিন টাকা করে এবং মোটা চালের দাম বেড়েছে অন্তত দুই টাকা করে।
চট্টগ্রামের পাইকারি বাজার চাক্তাই-খাতুনগঞ্জে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে, নতুন ধানের চালে ভর্তি এখানকার আড়ত ও গুদামগুলো। চট্টগ্রামের প্রায় ৩০০টি আড়ত ও গুদাম রয়েছে। এসব আড়ত ও গুদাম থেকে চট্টগ্রাম নগরী ও জেলার পাশাপাশি আশপাশের জেলায়ও চাল সরবরাহ করা হয়।